দেশের বিয়ে ও তালাক আইন সংশোধন প্রয়োজন
প্রকাশ: ০৮ জুলাই, ২০২৬, ০২:৫২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

যুবায়ের আহমাদ-

বাংলাদেশের বিবাহ ও তালাক আইনে একচেটিয়াভাবে নারীর সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা এবং পুরুষ কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কের সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় পুরুষরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং পরিবার ভাঙন ক্রমেই বাড়ছে।

বিয়ের সময় অনেক পুরুষ জানেই না যে ১৮নং কলামে কী  আছে, কিসের ভিত্তিতে সে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিচ্ছে, কতটুকু দিচ্ছে, নারীরাও জানে না যে কী কী শর্তের ভিত্তিতে সে সেই অধিকার প্রা্পত হবে তা নারীরাও জানে না। নারী শুধুই জানে সে স্বামীকে তালাক দিতে পারবে।

অথচ ইসলামী শরিয়াহয় স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। নারী বিয়েবিচ্ছেদ করতে পারবে, কিন্তু তালাক দিতে পারবে না। তালাক বলা হয় স্বামী কর্তৃক বিয়েবিচ্ছেদকে আর স্ত্রী কর্তৃক বিয়েবিচ্ছেদকে বলা হয় খুলআ। খুল'আ হলো স্বামীর কাছ থেকে গৃহীত মোহর বা এর অংশবিশেষ ফেরত দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া। মোহর ফেরত দিতে হয় এজন্য যে, স্বামী তো মোহর দিয়েছে সারাজীবন এ বিবাহবন্ধনে থাকার চুক্তি করে। এ চুক্তি তো স্বামী ভাঙছে না, ভাঙছে কে? স্ত্রী। সে সারাজীবন থাকার চুক্তি করে অল্প কিচুদিন পরেই নিজেকে আলাদা করে স্বামীকে বঞ্চিত করছে, এজন্য গৃহীত মোহর ফেরত দিয়ে আসবে।

বাংলাদেশের নারীরা খুল’আ না করে কেন তালাকে তাফয়ীজ অর্পন করে? তালাকে তাফয়ীজ মূলত স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক। অর্থাৎ বিয়ের সময় স্বামী কাবিননামার ১৮নং কলামের ‘হ্যাঁ’ দিয়ে এ মর্মে অধিকার দিল যে, ‘আমি যদি পাগল হই, নিরুদ্দেশ হই, নপুংশক হই তাহলে তুমি আমার পক্ষ থেকে তোমাকে তালাক দিয়ে দিও! হাস্যকর, স্ত্রী স্বামীর পক্ষ থেকে নিজেকে তালাক দিচ্ছে, অথচ স্বামী স্বামী সুস্থ, তার কোনো মতামতের দরকার হচ্ছে না।

স্ত্রী এটা কেন করছে? কারণ, তালাকটাকে কোনোভাবে স্বামীর পক্ষ থেকে প্রমাণ করতে পারলে সে মোহরের টাকাটা ধরে রাখতে পারবে। তালাক দিচ্ছে নিজের ইচ্ছায়, তাতে স্বামী রাজি কি-না তা জানা না জানার কোনো প্রয়োজন বোধ করছে না অথচ এ তালাককে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক বলে চালিয়ে দিয়ে মোহরের ৮ লাখ, ১০ লাখ টাকা করছে।

যে মোহরকে ইসলাম নারীর সম্মান হিসেবে দিয়েছিল, সে মোহরের লোভে খুল’আ না করে তালাকের তাফয়ীজের অপব্যবহার কর সেই মোহরানাকেই সংসার ভাঙ্গার কারণ বানাচ্ছে। হিন্দু সমাজে মোহরানা নেই, সংসারও এত ভাঙে না।

তালাকে তাফয়ীজ ও মোহরানাকে এভাবে সংসার ভাঙ্গার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে রাষ্ট্রের করণীয়:

১. বিয়ের নময় ১৮নং কলাম সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া অথবা স্বামী সত্যি এতে রাজি আছে কি-না তা কাজি বুঝিয়ে তারপর সাক্ষর নেওয়া। স্বামী রাজি না থাকলে 'না' দেওয়া।

২. ১৮নং কলাম অনুযায়ী স্ত্রী নিজের ওপর তালাক পতিত করার শর্ত হচ্ছে, স্বামী ২ বছর পাগল থাকলে, ৪ বছর নিরুদ্দেশ থাকলে, ৭ বছরের কারাদন্ডপ্রাপ্ত হলে, ৩ বছর পর্যন্ত দাম্পত্য (সেক্সুয়াল) দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে স্ত্রী নিজেকে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দিতে পারবে। এখন স্বামীর এসব শর্ত পূরণ হচ্ছে কি-না তা কি একবারও যাচাই হচ্ছে? তা নিশ্চিত করার জন্য এই মর্মে আইন করা প্রয়োজন, স্বামী বিয়ের সময় ১৮নং কলামে হ্যাঁ দিয়ে থাকলেও এসব শর্ত পূরণ হচ্ছে কি-না তা যাচাই করার জন্য ২ জন আলেমের সমন্বয়ে গঠিত শালিসি পরিষদের অনুমতি লাগবে। শলিসি পরিষদে স্ত্রী যদি অভিযোগ করে, স্বামী পাগল, তাহলে শালিসি পরিষদ প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা করে দেখবে, যদি সত্যি স্বামী পাগল হয় তাহলে স্ত্রীকে নিজের ওপর তালাক অর্পন করার অনুমতি দেবে। যদি অভিযোগ করে যে, স্বামী সেক্সুয়াল সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থ তাহলে ডাক্তারি পরীক্ষা করে দেখবে যে আসলে তা বাস্তব কি-না। যদি বাস্তব হয় তাহলে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের অনুমতি দেবে।

আর যদি দেখে যে, কোনো অভিযোগই সত্য নয় তখন স্ত্রীকে মোহর (পুরো অথবা অংশ, স্বামীর দাবি অনুযায়ী) ফিরত দিয়ে খুল’আ করে করতে বলবে। এটুকু করলেই তালাকে তাফয়ীযের অপব্যবহার, মোহরের লোভে তালাক এবং সংসার ভাঙা রোধ হবে ইনশাআল্লাহ!

লেখক: কলামিস্ট, খতিব ও আলোচক

আওয়ার ইসলাম/জেডএম