
|
জাতীয় প্রেক্ষাপটে কওমি ধারা: বিভেদ পেরিয়ে ঐক্যের পথে
প্রকাশ:
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার || ইতিহাসের প্রতিটি মোড় আমাদের একটি মৌলিক ও শাশ্বত সত্যের শিক্ষা দেয়—বিচ্ছিন্ন ও ছন্নছাড়া শক্তি সাময়িক আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারলেও টেকসই ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন ও সুসংগঠিত ঐক্য। পাহাড়ি ঝরনার অজস্র ক্ষুদ্র স্রোতধারা যখন এক মোহনায় এসে মিলিত হয়, তখনই কেবল জন্ম নেয় এক মহানদী; আর সেই নদীর পলিমাটিতেই গড়ে ওঠে মানব সভ্যতার সমৃদ্ধ ভিত্তি। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র—যেখানেই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের আকুতি থাকে, সেখানেই সংকীর্ণ মতপার্থক্য ও আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন লক্ষ্যে একসূত্রে বাঁধার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজচিন্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই সত্যের বহু ঐতিহাসিক ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শ ও মেরুর রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাস রুখতে গড়ে তুলেছিল 'অ্যালাইড ফোর্সেস' বা সর্বাত্মক প্রতিরোধ জোট। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য ও নিপীড়নের শেকল ভাঙতে রাজপথে এক হয়েছিল নানা মত ও পথের সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি, যার নাম ছিল 'ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট'। আমাদের প্রিয় জন্মভূমির স্বাধিকার ও সার্বভৌমত্বের ইতিহাসেও এই ঐক্যের সুর সর্বদা গুঞ্জরিত হয়েছে। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক 'যুক্তফ্রন্ট' গঠন কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভূতপূর্ব গণআন্দোলন—প্রতিটি বাঁকই প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় জীবন ও সামাজিক অর্জনে সংলাপ, সমঝোতা এবং দূরদর্শী সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। সেই ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী বাস্তবতার আলোকেই সম্প্রতি কওমি ধারার সাতটি প্রধান ধর্মীয়-রাজনৈতিক দলের শীর্ষ প্রতিনিধিদের এক টেবিলে বসা এবং একটি সমন্বিত 'লিয়াজোঁ কমিটি' গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জাতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় মাইলফলক। এটিকে কেবল একটি গতানুগতিক সাংগঠনিক বা নির্বাচনী জোট গঠনের চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে পারস্পরিক আস্থা, সৌহার্দ্য ও কার্যকর সংলাপের এক নতুন অধ্যায় রচনার বার্তা দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও পরিণত দিকটি হলো—এখানে কোনো সিদ্ধান্ত একতরফা বা তাড়াহুড়ো করে চাপিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, প্রস্তাবনা ও পর্যবেক্ষণকে টেবিলে রেখে খোলামেলা আলোচনার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। মতপার্থক্যের বিষয়গুলোকে কৌশলে এড়িয়ে না গিয়ে কিংবা ক্ষোভের জন্ম না দিয়ে, সেগুলোকে যৌক্তিক উপায়ে নিরসনের জন্য পৃথক 'লিয়াজোঁ কমিটি' গঠন করা এক পরিপক্ক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। কারণ ক্ষণিক আবেগের তোড়ে গড়ে ওঠা ঐক্য বালির বাঁধের মতো ভঙ্গুর; অন্যদিকে ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুদৃঢ় পর্যালোচনার শক্ত ভিত্তির ওপর নির্মিত ঐক্যই কেবল কালজয়ী হতে পারে। একটি সুস্থ, সাবলীল ও জবাবদিহিমূলক সমাজব্যবস্থার মূল সৌন্দর্যই হলো—ভিন্নমতকে সংঘাতের হাতিয়ার না বানিয়ে তা সমৃদ্ধ আলোচনার অনুঘটকে পরিণত করা। কৌশলগত ছোটখাটো ভিন্নমত যদি কোনো বৃহৎ আন্দোলন বা মহৎ লক্ষ্যকে নস্যাৎ করে দেয়, তবে তা কোনো সুস্থ দূরদর্শিতার পরিচয় হতে পারে না। যখন রাজনৈতিক ও আদর্শিক নেতৃত্ব নিজ নিজ অবস্থান থেকে এক ধাপ পিছিয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন মতপার্থক্য আর অগ্রগতির বাধা থাকে না; বরং তা আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐকমত্যে পৌঁছানোর সিড়ি হয়ে ওঠে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ঐক্য মানেই কারও নিজস্ব মত বা আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং প্রতিটি সত্তার মৌলিক স্বকীয়তা বজায় রেখে অভিন্ন সামাজিক দাবি ও জাতীয় ইস্যুতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করাই হলো গঠনমূলক ঐক্য। কওমি শিক্ষাধারা ও সমাজব্যবস্থা এ দেশের ইতিহাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে শেকড়ছড়ানো। ফলে এই ধারার মূলধারার সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ইতিবাচক সম্পর্ক ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কেবল তাদের নিজস্ব শক্তিকেই সুসংহত করবে না; বরং তা দেশে নৈরাজ্য প্রতিরোধ, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গঠন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের পরিসরকে বহুগুণ প্রসারিত করবে। তবে মনে রাখতে হবে, এই সম্ভাবনার বীজ বাস্তবে ফলে-ফুলে সুশোভিত বৃক্ষে রূপ নেবে তখনই—যখন ঐক্যের অন্তরালে থাকবে পারস্পরিক প্রকৃত শ্রদ্ধা, স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা এবং গণমানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন। আজকের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার অংক মেলাতে কোনো সাময়িক জোট দেখা নয়; বরং তারা চায় এক দায়িত্বশীল, সততা-ভিত্তিক ও সমাজমুখী নেতৃত্ব। যদি কওমি ধারার এই ঐক্যপ্রক্রিয়া সাময়িক সুবিধার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ইনসাফ, মানবাধিকার, সুশাসন ও মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, তবেই তা ইতিহাসে সোনাঝরা অক্ষরে লেখা থাকবে। ইতিহাস আমাদের বারে বারে এই অমূল্য সতর্কবারতাই দেয়—বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল একটি জাতির অপার সম্ভাবনাকেও ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে দেয়; আর সদ্বিবেচনা ও সুসংগঠিত ঐক্য সাধারণ সম্ভাবনাকেও অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করে। তাই সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় দায়িত্ববোধের এই যে শুভ সূচনা ঘটেছে, তা যদি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু কওমি ধারার জন্যই নয়—বরং সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন, কল্যাণময় ও ইতিবাচক সুবাতাস বয়ে আনবে। লেখক: আলেম ও সংগঠক আইও/ |