প্রতিবেশীর হক আদায়ে আমরা কতটা সচেতন?
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৪২ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন জীবন। বিপদে-আপদে সবার আগে যাঁদের সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব, তাঁরা অনেক সময় পাশের বাড়ির মানুষটিই। অথচ  জীবনের ব্যস্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও পারস্পরিক দূরত্বের কারণে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

ইসলাম প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেশীর ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, তার সঙ্গে ন্যায়সংগত ও সুন্দর আচরণ করা একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিবেশীর হক আদায় শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ঈমানি দায়িত্বেরও অংশ।

প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিকট ও দূরের প্রতিবেশীর প্রতিও সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মা-বাবার সঙ্গে, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী...।’ (সূরা নিসা, আয়াত: ৩৬)

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। শুধু নিজের পরিবার ভালো থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; আশপাশের মানুষের কল্যাণের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হয়।

প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ ঈমানের পরিচয়

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে বারবার গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এ হাদিস থেকে এ শিক্ষা পাওয়া যায়, ঈমানের দাবি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে আচরণ, বিশেষত প্রতিবেশীর সঙ্গে ব্যবহারেও ঈমানের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা। তার সুখে আনন্দিত হওয়া। শোক-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো। প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা ইসলামের সামাজিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। 

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা

প্রতিবেশীর হক আদায়ের প্রথম শর্ত হলো তাকে নিজের আচরণ, কথা কিংবা কাজের মাধ্যমে কষ্ট না দেওয়া। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, গভীর রাতে অযথা শব্দ করা, অন্যের চলাচলের পথ আটকে রাখা, ময়লা-আবর্জনা প্রতিবেশীর জায়গায় ফেলা কিংবা পার্কিং নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা—এসব আচরণ প্রতিবেশীর জীবনে দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়!’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কে, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (সহিহ বুখারি)

প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো

প্রতিবেশীর অধিকার শুধু তাকে কষ্ট না দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, অভাবের সময় সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা এবং জরুরি প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিবেশীর ঘরে খাবারের সংকট থাকলে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা। কেউ অসুস্থ হলে তার প্রয়োজনের খোঁজ নেওয়া। বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ সমাজে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বাড়ায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমার মনে হলো, তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

উপহার ও খাবার ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা

প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সহজ উপায় হলো উপহার দেওয়া এবং খাবার ভাগ করে নেওয়া। সামান্য কিছু হলেও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিবেশীকে দেওয়া পারস্পরিক সম্পর্ককে সুন্দর করে তুলতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু যর (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি যখন ঝোল রান্না করো, তখন তাতে পানি বাড়িয়ে দাও এবং তোমার প্রতিবেশীদের খোঁজ নাও।’ (সহিহ মুসলিম)

প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান

প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখা। অন্যের পারিবারিক বিষয় নিয়ে অযথা অনুসন্ধান, ব্যক্তিগত কথা ছড়িয়ে দেওয়া, অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা অনুচিত।

একইভাবে প্রতিবেশীর কোনো দুর্বলতা বা সমস্যাকে উপহাসের বিষয় বানানোও অন্যায়। বরং তার সম্মান রক্ষা করা, ভুল হলে সুন্দরভাবে পরামর্শ দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় বিরোধ এড়িয়ে চলাই ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর অধিকার

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণের শিক্ষা শুধু মুসলিম প্রতিবেশীর জন্য নয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীর সঙ্গেও ন্যায়সংগত আচরণ, সৌজন্য, মানবিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে কারও প্রতি অন্যায় করা, তার অধিকার ক্ষুণ্ন করা কিংবা অকারণে কষ্ট দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পরিচয় দেওয়াই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

নিজের ঘর থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন

প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি অভ্যাসই সম্পর্ককে সুন্দর করতে পারে—প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হলে সালাম ও সৌজন্য বিনিময়, শব্দদূষণ এড়িয়ে চলা, চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখা, বিপদে খোঁজ নেওয়া, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা এবং ভুল বোঝাবুঝি হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।

আমরা অনেক সময় দূরের মানুষের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করি, কিন্তু পাশের বাড়ির মানুষের কষ্টের খবর রাখি না। অথচ সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে কাছের মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা থেকেই।

সারকথা 

প্রতিবেশীর হক আদায় ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা। একজন ভালো প্রতিবেশী অন্যকে কষ্ট দেন না। বরং অন্যের কল্যাণে ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, সম্মান ও স্বস্তির প্রতি সচেতন থাকেন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

আমাদের সমাজে পারস্পরিক দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধ কমাতে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আসুন, আমরা নিজেদের আচরণ পর্যালোচনা করি এবং প্রতিবেশীর জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের কারণ হওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিবেশীর হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

এসএইচ/