
|
বিশ্বমানের একটি জামিয়ার গল্প
প্রকাশ:
১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
খালেদ হোসাইন অনেকেই মনে করে 'জামিয়া দারুল উলুম করাচি' মনে হয় শুধু একটা মাদরাসা। ভুল ধারণা । ( বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কয়েকটি জামিয়া যেগুলো আসলে প্রকৃত অর্থে কোনো জামিয়াই নয়। ) কারণ, দরসে নেজামি (অর্থাৎ আমাদের দেশের তাইসির বা বিশেষ জামাত থেকে নিয়ে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত আলেম কোর্স) হচ্ছে দারুল উলুমের একটা বিভাগ মাত্র। অথচ এই মাত্র বিভাগ নিয়েই এদেশের সবচেয়ে বড় মাদরাসাগুলো জামিয়া নামে টিকে টিকে আছে শত বছর ধরে। এটা মাত্র একটা শাখা। অথচ 'জামিয়া দারুল উলুম করাচি' শুধু এতটুকুর নাম নয়। দারুল উলুম করাচি : ১. ছেলে মেয়েদের প্রাইমারি ও হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল এখানে ছেলে-মেয়েদের প্রাইমারি স্কুল ও হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল আছে। 'হেরা ফাউন্ডেশন' স্কুল আছে। হাই স্কুলে আলাদা বয়েজ ক্যাম্পাস,আলাদা গার্লস ক্যাম্পাস। মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা দারুল উলুমেই। ভবিষ্যতে কলেজের জন্য জায়গা নির্ধারিত করা আছে। এগুলো সব দারুল উলুমের ভিতরেই। আমাদের চোখের সামনে। ২. হেরা ফাউন্ডেশান দারুল উলুমেরই স্কুল। দারুল উলুম কতৃপক্ষই চালায়। শিক্ষকও দারুল উলুম–ই নিয়োগ দেয়। বেতনও দারুল উলুম দেয়। স্কুলগুলোর পড়াশোনার মান অনেক ভালো। অনেক মানে অনেক। 'হেরা ফাউন্ডেশন' স্কুলের মতো এতো সুন্দর ও আধুনিক হাই স্কুল করাচিতে হাতেগোনা হয়তো আর কয়েকটাই আছে। আশেপাশের অধিকাংশ বড়লোকেরাও নিজেদের ছেলে-মেয়েদের এখানেই পড়ায়। স্কুলের সিলেবাসটাও ঐভাবেই তৈরি। ধর্মীয় শিক্ষার আবেশে পরিপূর্ণ। ৩. হেরা মিডিয়া হেরা ফাইন্ডেশন স্কুল এর মিডিয়া আছে। হাই স্কুলের ছেলেদেরকে ক্যারাটে তথা মার্শাল আর্টের প্রাথমিক পর্যায় শেখানো হয়। প্রতিবছর ১৪ আগস্টের স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে সেটার প্রদর্শনিও হয়। এবছরও হয়েছে। ৪. দারুল উলুম পরিচালিত মহিলা মাদরাসা: মাদরাসাতুল বানাত দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত 'মাদরাসাতুল বানাত' (মহিলা মাদরাসা) আছে। তবে মহিলা মাদরাসা সম্পূর্ণ অনাবাসিক। সম্পূর্ণ আলাদা ভবন ও আলাদা ক্যাম্পাসে অনাবাসিক নাজেরা ও হিফজ বিভাগ আছে। ৫. তাখাসসুসাত ফিল ইফতা - দা'ওয়াহ - তাজভিদ দাওরায়ে হাদিসের পর তাখাসসুস ফিল ইফতা(৩ বছরব্যাপী), তাখাসসুস ফিদ্-দাওয়াহ(২বছর), তাখাসসুস ফিত্ তাজবীদ লিল-উলামা(২বছর) আছে। পাকিস্তানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও কোয়ালিটিফুল 'ইফতা বিভাগ' আছে। ৬. বিশ্বমানের হাদিস গবেষণা বিভাগ শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী (হাফিযাহুল্লাহু)'র তত্ত্বাবধানে আলাদা গবেষণা বিভাগ আছে। যেখানে অনেক যোগ্যরা শুধু তাহকীক,গবেষণা ও লেখালেখির কাজেই ব্যাস্ত। তাদের কাজ এটাই। যেখান থেকে মুফতি তাকী উসমানী দা. বা.–এর ৪০ খন্ডেরও অধিক কলেবর নিয়ে المُدوّنة الجامعة এর মতো হাদিসকেন্দ্রিক এক ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। আর আগে যা হয়েছে সেগুলো তো জানা-ই। ৭. পৃথক প্রকাশনা বিভাগ এক বিশাল পরিমণ্ডল নিয়ে প্রকাশনা বিভাগ আছে। দারুল উলুমের নজরকাড়া এক সুবিশাল মাকতাবা আছে। মাসিক আল-বালাগ উর্দু ও ত্রৈমাসিক আরবি আল-বালাগ পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ছাত্রদের জন্য সবসময় সেগুলোতে লেখালেখির ব্যবস্থা আছে। মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো সংখ্যা বাহিরে দেয়ালিকার মতো করে প্রদর্শনিও হয়। ৮. পৃথক খাবার ব্যবস্থাপনার কেন্টিন - রেস্টুরেন্ট কিছুটা বুফে সিস্টেমের মতো করে শুধুমাত্র বোর্ডিং এর খাবারের জন্য ৩ তলাবিশিষ্ট লম্বা দুই-দুইটা খাবারের বিল্ডিং (মাত'আম) আছে। শুধু খাবারের বিল্ডিংগুলো দিয়ে বাংলাদেশের একটা মিডিয়াম মাদরাসা হয়ে যাবে। ছাত্রদের জন্য ৪টা ক্যান্টিন, প্রতিটা বিল্ডিং এর প্রতি তলায় দুই-দুইটা করে ডিজাইনকৃত ইস্ত্রি রুম থাকার পরেও আলাদা 'ধুবিঘাট' (লন্ড্রিঘর) আছে। প্রতি তলায় দুই-দুইটা করে (প্রতিটাতে ৫টা বেসিন ও ৮টা করে লাইন গ্যাসের চুলা ও এগজস্ট ফ্যান দিয়ে) কিচেন রুম তৈরি করে দেওয়া আছে শুধু যেন ছাত্রদের কখনো কিছু রান্না করে খেতে মন চাইলে খেতে পারে। পাঁচটা 'দারুত ত্বলাবা'–য় ৪০ টা এমন কিচেন রুম ও ৪০ টা ইস্ত্রি রুম দেওয়া আছে। ৯. জিরো চিকিৎসা, ভর্তি, পরীক্ষা, খাবার ফি সার্বক্ষণিক ফ্রি হসপিটাল-ডাক্তার-ঔষধ। এমনকি দাঁত ও চোখের ডাক্তারও। ভর্তি ফি নেই, পরীক্ষা ফি নেই, খাবারের ফি নেই, বিদ্যুতের ফি নেই। কিচ্ছু নেই। উল্টো সব ছাত্রদেরকে প্রতি মাসে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। [সুযোগ সুবিধার কথা বলা উদ্দেশ্য নয়। বলতে গেলে আরো কিছু বলা যাবে] ১০. দারুল উলুমের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক স্টাফ সংখ্যা ২২ হাজার প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, হেরা ফাইন্ডেশন স্কুল, নাজেরা ও হিফজ বিভাগ, মহিলা মাদরাসা, দরসে নেজামির ছাত্র সবমিলিয়ে দারুল উলুমের ছাত্র সংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি। দরসে নেজামীর ছাত্র ৩ হাজার। আর ছাত্রী....? জানি না। সবমিলিয়ে শুধু শিক্ষক ও স্টাফ সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ জনের মতো। ১১. দরসে নেজামির তাইসিরে ভর্তি হওয়ার জন্য মেট্রিক আবশ্যক এখানে দরসে নেজামিতে (আই মিন তাইসিরে । যেটাকে এখানে 'দরজায়ে উলা' বলা হয়) ভর্তি হওয়ার জন্য মেট্রিক পড়া আবশ্যক। মেট্রিকের সার্টিফিকেট ছাড়া দরসে নেজামিতে ভর্তি হওয়া যায় না। অবশ্য আমরা যারা বিদেশি তাদের জন্য ছাড় আছে। ১২. বেফাকের সনদের সরকারি ইকুভ্যালেন্সি আছে পাকিস্তানের বেফাকের সনদের সরকারি ভ্যালু আছে। এটা দিয়ে যেকোনো ইউনিভার্সিটিতে এম ফিল করা যায়। ইকোনমি বা ইসলামিক স্টাডিজে ভর্তি হওয়া যায়। মদীনা ইউনিভার্সিটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইউনিভার্সিটিগুলোতে ঐ সার্টিফিকেট দিয়ে আবেদন করা যায়।তাছাড়া দারুল উলুমের সার্টিফিকেটের আরেকটা বিশেষ ভ্যালু আছে। সেটা দিয়ে করাচি ইউনিভার্সিটিতে সহজেই এডমিশন নেওয়া যায়। মেট্রিকের সার্টিফিকেট না থাকলে 'দাওরায়ে হাদিস' শেষ হওয়ার পর সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। তবে আমাদের বিদেশিদের যাদের মেট্রিকের সার্টিফিকেট নেই তাদের জন্য 'তাসদীক্ব নামাহ' জারি করে দেওয়া হয়। যেকোনো সময় মেট্রিক দিয়ে সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দিলে ইনারাও এখান থেকে এখানের বেফাক ও দারুল উলুম উভয়টার সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দিবেন। (তবে শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী দা. বা.–এর হাতে-পায়ে ধরে মাঝেমধ্যে মেট্রিক ছাড়াই দেশে যাওয়ার সময় সার্টিফিকেট নিয়ে নেওয়া যায় ?, তবে এই সুযোগ সবসময় মিলে না ?)। ১৩. সরকারি পরীক্ষা দেয়ার জন্য জামিয়ার পক্ষ থেকে সুযোগ দেয়া হয় এখানের মেশকাতের আগ পর্যন্ত ছাত্রদেরকে জেনারেল লাইনের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য জামিয়ার পক্ষ থেকে সুযোগ দেওয়া হয়। ১৪. এমনকি জেনারেলের পরীক্ষার টাইম জামিয়ার প্রথম সাময়িক বা দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার সাথে একসাথে পড়ে গেলে জামিয়ার পরীক্ষা তার জন্য আপাতত মাওকুফ করে বাহিরে পরীক্ষা দিতে বলা হয়। বাংলাদেশে যেটা অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয়। ১৫. ইফতার ছাত্ররা বাহিরে অনার্স - মাস্টার্স করছে এখানের ইফতার ছাত্রদের অনেকে বাহিরে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমি ইত্যাদিও পড়তেছে। আমাদের দাওরা, মিশকাত ও নিচের জামাতের সাথীদের অনেকে দারুল উলুমে বসেই বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির পড়াও পড়ছে, গিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। অনেকে বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়ে ইন্টারের পড়াশোনা করছে দারুল উলুমে বসেই। দারুল উলুম থেকে পূর্ণ অনুমতি দেওয়া আছে। বাংলাদেশ, বার্মা, ফিলিপাইন, আমেরিকা, কানাডা, ইরান, আফগানিস্তানসহ আরো কিছু রাষ্ট্রের ছাত্ররা এখানে পড়ছে। পাকিস্তানের অন্যান্য মাদরাসাগুলোও এমনই। দাওরায়ে হাদিসে আমার সাথে সর্বমোট ৯ রাষ্ট্রের সাথিরা আছে। ১৬. মাত্র ৮ বছরে দাওরায়ে হাদিস তবে আমাদের দেশে দরসে নেজামি (তাইসির থেকে দাওরায়ে হাদিস) ১০ বছরের হলেও এখানে ৮ বছরের। দরসে নেজামির অনেকগুলো কিতাবে ইনারা পরিবর্তনও করেছেন। সমসাময়িক ও যুগোপযোগী কিছু কিতাব বিনা দ্বিধায় যুক্তও করেছেন। একটা উদাহরণ দেই। ১৭. পরিমার্জিত ও সংযোজিত সিলেবাস তাহাফুতুল মালাহিদা সিলোবাসে সংযুক্ত করা হয়েছে। মুফতি শামায়েল নদভীর গুরু, সময়ের পরিচিত ব্যাক্তি ইয়াসির নাদিম আল-ওয়াজিদির 'তাহাফুতুল মালাহিদা' সংক্ষেপ করে আগামী বছর থেকে দারুল উলুমে পড়ানো শুরু করবেন বলে মুফতি তাকী উসমানী (হাফিযাহুল্লাহু) আমাদেরকে দরসে জানিয়েছেন। হয়তো বেফাকের নেসাবেও যুক্ত করে দিতে পারেন। অথচ বাংলাদেশে..। ১৮. বিশ্বমানের শিক্ষক কিছুদিন আগেও জর্ডান থেকে দুই শায়েখকে এনে দারুল উলুমের আরবী বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাখাসসুস ফিদ্ দাওয়াহ–তে ইয়াসির নাদিম আল-ওয়াজিদি অনলাইন ক্লাস করাচ্ছেন। ইফতায় করাচির বড় বড় ইউনিভার্সিটির ইংরেজি প্রফেসর এসে নিয়মিত ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন। উপরের এই সবগুলোর নামই 'জামিয়া দারুল উলুম করাচি'। দারুল উলুম করাচি প্রকৃত অর্থেই 'জামিয়া'। উপযুক্ত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি। প্রকৃত দেওবন্দি মাদরাসার উদাহরণ। মেছালী এক কওমি মাদরাসা। এটাই জামিয়া দারুল উলুম করাচি। মুফতিয়ে আ'জম পাকিস্তান মুফতি শফী রহ.–এর জামিয়া। শাইখুল ইসলাম জাস্টিস মুফতি তাকী উসমানী দা. বা.–এর জামিয়া। আমার জামিয়া। একটা ইমোশন। রব আমার! এই জামিয়ায় অবস্থানকে আরো দীর্ঘ করুন। আমিন। লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া দারুল উলুম করাচি, পাকিস্তান আরএইচ/ |