শিশুর অতিরিক্ত জেদ ও রাগ নিয়ন্ত্রণে কী আমল করবেন?
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৪ রাত
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

শিশুরা বেড়ে ওঠার একটি পর্যায়ে নিজের চাওয়া পূরণ না হলে রাগ করে। কান্নাকাটি করে।  অন্যকে আঘাত করে। বিশেষ করে দুই থেকে তিন বছর বয়সে নিজের ইচ্ছা প্রকাশের প্রবণতা বাড়লেও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। ফলে অনেক শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত জেদ ও রাগ দেখা যায়। তবে শিশুর আচরণ যদি বারবার অন্যকে আঘাত করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

রাগ ও জেদ কমাতে কী আমল করা যায়?

সন্তানের উত্তম চরিত্র, শান্ত স্বভাব ও কল্যাণের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা যায়। পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, মাসনুন দোয়া ও শরিয়তসম্মত রুকইয়ার মাধ্যমে শিশুর জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করা যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা রাগ সংবরণকারীদের প্রশংসা করে বলেন,

وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ

‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)

এই আয়াত তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে সন্তানের স্বভাব সুন্দর হওয়া ও রাগ নিয়ন্ত্রণের তাওফিক চেয়ে দোয়া করা যেতে পারে। তবে এ আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়ে শিশুর বুকে ফুঁ দিলে রাগ কমবেই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া বা এটিকে প্রমাণিত বিশেষ আমল হিসেবে প্রচার করার জন্য নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন।

আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য এভাবেও দোয়া করা যায়—তিনি যেন শিশুকে উত্তম চরিত্র, কোমল স্বভাব ও আত্মসংযম দান করেন এবং মা-বাবার জন্য তাকে প্রশান্তির কারণ বানান।

বদনজর থেকে সুরক্ষার আমল

শিশুর সুরক্ষার জন্য সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিলাওয়াত করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী এসব সূরা পড়ে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া বৈধ।

তবে শিশুর রাগ বা অন্যকে আঘাত করার আচরণ দেখলেই সেটিকে বদনজরের ফল মনে করা ঠিক নয়। এর পেছনে শিশুর বয়স, আবেগ প্রকাশের সীমাবদ্ধতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মতো নানা কারণ থাকতে পারে।

শিশুর রাগ সামলাতে মা-বাবা যা করবেন

দুই বছর চার মাস বয়সী শিশু নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে চাইলেও সব সময় তা ভাষায় বোঝাতে পারে না। কোনো চাওয়া পূরণ না হলে সে কান্না, চিৎকার কিংবা আঘাত করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ বয়সে কিছুটা জেদ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে শিশুকে অন্যকে আঘাত করা থেকে বিরত রাখতে ধৈর্যসহকারে শেখাতে হবে।

১. শান্ত থাকুন: শিশু রেগে গেলে মা-বাবা চিৎকার করবেন না। শান্ত কণ্ঠে কথা বলুন এবং তাকে নিরাপদ পরিবেশে রাখুন।

২. আঘাত করতে দেবেন না: শিশু মারতে এলে তার হাত আলতোভাবে আটকে দিন এবং স্পষ্টভাবে বলুন, ‘মারা যাবে না, ব্যথা লাগে।’ প্রয়োজন হলে অন্য শিশুকে তার কাছ থেকে সরিয়ে নিন।

৩. অনুভূতির নাম শেখান: শিশুকে বলুন, ‘তুমি রাগ করেছ’, ‘তুমি খেলনাটা চাও।’ এতে সে ধীরে ধীরে আঘাত না করে নিজের চাওয়া প্রকাশ করতে শিখবে।

৪. ভালো আচরণের প্রশংসা করুন: রাগের সময় নিজেকে সামলাতে পারলে কিংবা কাউকে না মেরে কথা দিয়ে চাওয়া প্রকাশ করলে তার প্রশংসা করুন।

৫. মোবাইল ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ করুন: অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, উত্তেজক ভিডিও ও বয়স অনুপযোগী কনটেন্ট কমিয়ে দিন। এ বয়সে শিশুর ঘুম, খেলাধুলা, গল্প শোনা এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৬. ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখুন: শিশুর সামনে চিৎকার, মারামারি কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলুন। মা-বাবার আচরণ থেকেই শিশু অনেক কিছু শেখে।

৭. নিয়মিত ঘুম ও রুটিন বজায় রাখুন: ঘুমের অভাব, ক্ষুধা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তি শিশুর রাগ বাড়াতে পারে। তাই তার ঘুম, খাবার ও খেলার সময় নিয়মিত রাখার চেষ্টা করুন।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?

শিশু যদি প্রায়ই খুব জোরে অন্যকে আঘাত করে, নিজের বা অন্যের ক্ষতি করে, আচরণ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে কিংবা ভাষা ও সামাজিক বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক শিশুর আচরণ ও বিকাশ মূল্যায়ন করে উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারবেন।

সন্তানের উত্তম চরিত্র ও শান্ত স্বভাবের জন্য দোয়া এবং কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি মা-বাবার ধৈর্য, স্নেহপূর্ণ আচরণ ও ধারাবাহিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর রাগকে শুধু বদনজর বা আধ্যাত্মিক সমস্যার ফল মনে না করে তার বয়স, চাহিদা ও আচরণের কারণও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াও দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের অংশ।

এসএইচ/