হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.: বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও সাধনা (পর্ব: ৭)
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| আব্দুল্লাহ আফফান ||

৭.
মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড
মানবসেবা ও জনকল্যাণ ছিল তাঁর চরিত্রের একটি মজ্জাগত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর্তমানবতার কল্যাণে তাঁর গৃহীত মহৎ উদ্যোগগুলোর কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
ক. দরিদ্র, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিতরণ করা।
খ. শীত মৌসুমে শীতার্ত ও অভাবী মানুষের মাঝে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও প্রয়োজনীয় কাপড় বিতরণ করা।
গ. সুপেয় খাবার পানির তীব্র সংকট দূর করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ (টিউবওয়েল) স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
ঘ. এতিম, অসহায় শিশু ও স্বামীহারা বিধবা নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে নানা ধরনের পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
ঙ. সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং সংকটে নানামুখী মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
এ ছাড়া তিনি সবসময় নিজ মাদরাসার এতিম ও দুস্থ ছাত্রদের অভিভাবক হয়ে তাদের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতেন এবং এলাকার যেকোনো অভাবী মানুষকে সাধ্যমতো অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। তাঁর দরবার থেকে কখনো কোনো অসহায় মানুষ খালি হাতে ফিরে গেছে-এমন নজির সাধারণত নেই। বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করা ছিল তাঁর স্বভাবজাত ও অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য।

একবার ঢাকার চকবাজারে সিরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহফিলে বাদ মাগরিব মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.-এর বয়ান পেশ করার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র যানজটের কারণে মাহফিলস্থলে পৌঁছাতে তাঁর কিছুটা দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে মাগরিবের জামাত শেষ হয়ে গেছে। এজন্য তিনি সফরসঙ্গীদের নিয়ে মসজিদের বারান্দাতেই জামাতে নামাজ আদায় করে নেন।

নামাজ শেষে দেখা যায়, বেশির ভাগ মুসল্লি মসজিদ থেকে বের হয়ে গেছেন এবং মূল গেটের পাশে বসে আছেন এক অন্ধ ভিক্ষুক, যিনি কিছুক্ষণ আগেই মানুষের কাছ থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করে তা নিজের পকেটে রাখছিলেন।

আনছারী সাহেব অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে সেই অন্ধ ভিক্ষুকের কাছে গিয়ে তাঁর হাত ধরে বসালেন। এরপর নিজের পকেট থেকে একটি ৫০০ টাকার নোট বের করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে পরম আদরে বললেন- ‘বলেন তো, এইটা কয় টাকার নোট?’

এই কথা শুনে অন্ধ লোকটি মুচকি হাসলেন। তখন আনছারী সাহেব নিজেই বললেন- ‘চাচা, এইটা ৫০০ টাকার একটা নোট।’ এটা শুনে সেই ভিক্ষুক ভীষণ খুশি হন এবং মন খুলে তাঁর জন্য দোয়া করেন। এরপর আনছারী সাহেব ওই অন্ধ লোকের হাত থেকে খুচরা টাকাগুলো নিয়ে মূল্যমান অনুযায়ী সাজিয়ে আবার লোকটির নিজের পকেটে রেখে দিলেন।

উন্মুক্ত মেহমানখানা
জীবদ্দশায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আনছারী রহ.-এর বাসভবনটি উন্মুক্ত একটি মেহমানখানায় পরিণত হয়। আলেম-উলামা থেকে শুরু করে ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য সেটি ছিল অবারিত। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁর কাছে আসা কেউ কখনো না খেয়ে যেতে পারেননি। এলাকার সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক-সবাইকে তিনি পরম স্নেহে নাম ধরে ডাকতেন। অতি আপনজনের মতো তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন, তাদের সুখ-দুঃখের কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং যেকোনো বিপদে তাদের সান্ত¡না দিতেন। মানুষের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা ও মায়া-মমতার মধ্যে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা বা ভান ছিল না; তাঁর এই ভালোবাসা ছিল সম্পূর্ণ নির্ভেজাল ও নিঃস্বার্থ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য- এমন দিন কমই ছিল যেদিন তাঁর বাসভবনে ১৫ থেকে ২০ জনের মেহমানদারি হয়নি।

চলবে....

 এমএম/