
|
হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.: বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও সাধনা (পর্ব: ৮)
প্রকাশ:
২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:১৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| আবদুল্লাহ আফফান || ৮. স্থান, কাল ও পাত্র বিবেচনা করার এক অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা তাঁর মধ্যে ছিল। কোথায়, কখন, কার সামনে এবং ঠিক কী বিষয়ে কথা বলতে হবে-সে সম্পর্কে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ওয়াকিবহাল। দীর্ঘ ভ্রমণ ও ক্লান্তি কিংবা মানবীয় বিরক্তি ও মেজাজ হারিয়ে ফেলা তাঁর স্বভাবের মধ্যে কখনো ছিল না। জীবনের হাজারো ব্যস্ততা এবং দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সফরের চরম ক্লান্তির মধ্যেও তিনি তাঁর সফরসঙ্গী, সহকর্মী ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগকারী প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সর্বদা হাসিমুখে কথা বলতেন। তাঁর ব্যক্তিগত ড্রাইভার, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, প্রতিবেশী এবং মাদরাসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মচারীরাই তাঁর চরিত্রের মাধুর্যে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ ও অনুরক্ত ছিলেন। ওয়াজের ময়দানে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করার পরও তিনি জাগতিক নানা প্রলোভন, আত্ম অহংকার এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে নিজেকে সর্বদা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাধারণত সমাজে যারা অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, তারা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকতে পছন্দ করেন এবং সবার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। কিন্তু মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. ছিলেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল, সহজ ও প্রাণবন্ত স্বভাবের অধিকারী। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মার্জিত ধরন এবং ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার প্রতি অমায়িক আচরণের বিষয়টি সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন। তিনি কখনোই সাধারণ মানুষকে দূরে ঠেলে দেননি; বরং পরম ভালোবাসায় ও আতিথেয়তায় তাদের কাছে টেনে নিয়েছেন। মানুষের সামাজিক পরিচয়, আর্থিক অবস্থান কিংবা দুনিয়াবি সামর্থ্যরে চেয়ে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে তার প্রকৃত মর্যাদাকেই তিনি সবসময় বেশি গুরুত্ব দিতেন। অন্যকে সম্মান করার অসাধারণ গুণ কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতেন, অন্য প্রান্তের মানুষের প্রয়োজন ও আকুতির কথা পরম মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং যেকোনো মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে সবসময় যথাযথ মূল্য দিতেন। এগুলো ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য ও সুন্দর একটি অংশ। মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষমতা তিনি মানুষের জন্মগত বা ক্ষণস্থায়ী দোষত্রুটি না খুঁজে সবসময় তাদের লুক্কায়িত ভালো দিক ও গুণগুলো খুঁজে বের করার মানসিকতা পোষণ করতেন। আর ঠিক এ কারণেই তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তারা কেবল তাঁর মুখে মিষ্টি ওয়াজ বা বয়ানই শোনেননি-বরং তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন এক অপার ভালোবাসা, সম্মান এবং পরম মূল্যায়নের এক অনাবিল অনুভূতি। ওয়াদা ছিল আমানত ২০১৯ সালের ঘটনা। আনছারী রহ.-এর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দীর্ঘদিনের জটিল রোগে তিনি ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। এমনকি তাঁর পক্ষে স্বাভাবিকভাবে কথা বলাও কষ্টকর ছিল এবং দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে বসেও থাকতে পারতেন না। এ কারণে তিনি প্রায় সব মাহফিলের দাওয়াতই বিনীতভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। সেই সময় নিজ এলাকার একটি মাহফিলের দাওয়াত নিয়ে গ্রামের কয়েকজন যুবক আনছারী রহ.-এর মাদরাসার উস্তাদ মুফতি জুবাইর আহমদের কাছে উপস্থিত হন। তখনও তাঁর জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা মাদরাসায় যুক্ত হওয়ার খুব বেশি দিন হয়নি। তারপরও সাহস করে তিনি যুবকদের নিয়ে আনছারী রহ.-এর কাছে যান। বিস্তারিত জেনে অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনি আমার মাদরাসার শিক্ষক। আপনার সম্মানের খাতিরে এই দাওয়াত গ্রহণ করতে আমার ভীষণ ইচ্ছা হয়। কিন্তু আমার শারীরিক অবস্থা তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। কথা বলতে আমার সত্যিই খুব কষ্ট হয়।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাদের অনুরোধ ফেলতে পারেননি এবং দাওয়াত কবুল করেন। মাহফিলের তারিখ নির্ধারিত হয় ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, শনিবার। কাকতালীয়ভাবে, ঠিক ওই দিনই ঢাকায় ‘ইত্তেফাকুল ওয়াজেীন বাংলাদেশ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালার দিন ধার্য ছিল। আর সেই কর্মশালার মাধ্যমেই পরবর্তী সময়ে ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশ’ সংগঠনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। নির্ধারিত দিনে তিনি সকাল থেকে প্রায় সারাদিন সেই কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি আয়োজকদের সেই অনুরোধে কর্ণপাত না করে ধীর পায়ে মঞ্চে গিয়ে বসলেন এবং সামনে সমবেত হওয়া হাজারও তৃষ্ণার্ত তৌহিদি জনতার দিকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর সেই দৃষ্টির মধ্যে ছিল সীমাহীন মমতা এবং উম্মতের প্রতি এক অকৃত্রিম দরদ। সে সময় উপস্থিত হাজারও মানুষ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যাদের সবার চোখেই ছিল প্রিয় আনছারী সাহেবকে একনজর দেখার ও শোনার গভীর ব্যাকুলতা। এরপর তিনি মাইক্রোফোনের সামনে এগিয়ে এসে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন- ‘আপনারা এতো কষ্ট করে আমার কথা শোনার জন্য এখানে বসে আছেন। আমি আজ আপনাদের সামনে কিছু না বললে মনে হবে আপনাদের প্রতি আমার হক বা দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করতে পারলাম না। তাই যতই কষ্ট হোক না কেন, আমি আপনাদের উদ্দেশে কিছু জরুরি কথা বলব, ইনশাআল্লাহ।’ দীর্ঘ বয়ান চলাকালে শারীরিক কষ্টের কারণে তাঁর গালের ক্ষতস্থান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। তিনি বারবার তাঁর কাঁপা হাতে টিস্যু দিয়ে গাল ও থুতনি চেপে ধরে সেই রক্তের স্রোত এবং নিজের প্রচ- শারীরিক যন্ত্রণা আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। তা সত্ত্বেও আলোচনা থামাননি। নিজের শরীরের এই অসহ্য কষ্ট যেন তুচ্ছ ছিল। তাঁর কাছে তখন সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল-উপস্থিত শ্রোতাদের হক আদায় করা, দীনের সঠিক আমানত পৌঁছে দেওয়া এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.-এর বয়ান বা ওয়াজ যেমন শ্রোতাদের আলোড়িত করত, তেমনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান বা ক্লাসগুলোও ছিল অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষণীয়। তাঁর অনন্য পাঠদানের কারণে শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর ক্লাস উপভোগ করত। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’য় শুরুতে ‘তাইসির’ জামাত পর্যন্ত চালু করেন। ধীরে ধীরে মাদরাসার জামাত বাড়তে থাকে। মাদরাসার শুরুর দিনগুলোতে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে মূল কিতাবগুলো পাঠদান করতেন। পরবর্তী সময়ে যখন মেশকাত ও দাওরায়ে হাদিস জামাত পর্যন্ত খোলা হয়, তখন তিনি নিজে গুরুত্বের সঙ্গে তাফসির ও হাদিসের কিতাবের দরস দিতেন। বিশেষ করে তিনি জালালাইন শরিফ, মেশকাত শরিফের ‘কিতাবুল ফিতান’ অধ্যায় এবং দাওরায়ে হাদিসের সর্বোচ্চ কিতাব বুখারি শরিফের দরস দিতেন। আজ তাঁর হাতেগড়া অগণিত ছাত্র দেশ-বিদেশে বহুমুখী দীনি খেদমতে নিয়োজিত। তারা শিক্ষা বিস্তার এবং মানবকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রেখে আনছারী রহ.-এর রেখে যাওয়া আদর্শের সুবাস ছড়িয়ে দিচ্ছেন। চলবে........ এমএম/ |