নড়াইল প্রতিনিধি:
নড়াইল জেলায় রয়েছে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে অন্তত ১৫টি এলাকায় গা ঘেঁষে মসজিদ-মন্দিরের অবস্থান সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে জেলা শহরের মহিষখোলা এলাকায় মসজিদ-মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান। এখানে সম্প্রীতির বন্ধনে প্রায় ৪৫ বছর ধরে চলছে দুই ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ। বরং যুগ যুগ ধরে ধর্ম পালনে একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছেন সবাই।
জেলা শহরের মহিষখোলা মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. এনামুল হক জানান, মহিষখোলার পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ এবং পূজামণ্ডপটি একই জায়গায়। আমাদের নামাজের সময় ওরা পূজা অনুষ্ঠান বন্ধ রাখে। নামাজ শেষ হলে আবার তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করে। এখনো পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আশা করছি ভবিষ্যতেও সমস্যা হবে না।
পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মফিজুর রহমান বলেন, আল কোরআনে সুরা কাফিরুনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন।’ অর্থাৎ ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের এবং আমার ধর্ম আমার (কাছে প্রিয়)’। মুয়াজ্জিন মফিজুর রহমান আরও বলেন, যে দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে দেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা মুসলিমদের কাছে আমানত। ডিমের ভেতরে কুসুম যেমন নিরাপদ, তেমনি তারা (অমুসলিম) নিরাপদে থাকবে। আমরা সেইভাবে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করি।
সেখানকার পূজামণ্ডপের সহসভাপতি প্রলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘মহিষখোলায় একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। এটি সারা দেশের মধ্যে অনন্য নজির। এই নিয়ে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে কখনো মতবিরোধ হয়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে যার যার ধর্ম পালন করছেন। নামাজ ছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন একই মাঠ ব্যবহার করে ওয়াজ মাহফিল দিচ্ছেন। আবার আমরা পূজার কাজে মাঠ ব্যবহার করছি। একেবারে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান।’
সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর বলেন, ‘দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আমাদের পূজামণ্ডপ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদটি পাশাপাশি অবস্থান করছে। যে যার ধর্ম পালন করছেন। আজানের সময় আজান হচ্ছে। আবার পূজার অনুষ্ঠান হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছি। মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে পালন করে আসছেন।’

এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিষখোলা এলাকা ছাড়াও অন্তত ১৫টি স্থানে মসজিদ ও পূজামণ্ডপের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান রয়েছে। নামাজের সময় হলে পূজামণ্ডপের ঢাক-ঢোল, গান-বাজনাসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান যেমন বন্ধ থাকছে; তেমনি পূজা-অর্চনার সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের সুযোগ করে দিচ্ছেন। সংগত কারণে নড়াইলে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘আমি শহরের যে (মহিষখোলা) ওয়ার্ডের বাসিন্দা, সেখানে আমার বাড়ির পাশেই মসজিদ ও মন্দির মুখোমুখি। এখানে একই মাঠ ব্যবহার করে দুই ধর্মের লোকজন যার যার ধর্ম পালন করছেন। আশা করছি এবারও সবকিছু স্বাভাবিক থাকবে। বিগত সময়ে আমাদের এখানে কোনো সমস্যা হয়নি। দুর্গাপূজা সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নড়াইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। যাতে ঘোলাপানিতে কেউ মাছ শিকার করতে না পারেন।’
আইও/