|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার ||
একটি শিশুর হাসি মানেই একটি জাতির ভবিষ্যতের হাসি। যে হাতে থাকার কথা ছিল বই, রঙিন পেন্সিল কিংবা খেলনার পুতুল; যে চোখে থাকার কথা ছিল পৃথিবীকে জানার বিস্ময় আর স্বপ্নের আলো—সেই কোমল হাত ও স্বপ্নময় চোখ যখন সহিংসতার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজের বিবেক আহত হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিশু মাহিদা, জামালপুরের মরিয়ম বুশরা কিংবা বাগেরহাটের মুসলিমার মতো নিষ্পাপ মুখগুলো আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাদের শৈশব থেমে গেছে নির্মমতার কাছে। স্বজনদের কান্না, মায়ের বুকভাঙা আর্তনাদ আর পরিবারের অসহায়ত্ব আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়—আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও আইনব্যবস্থা কি সত্যিই কন্যাশিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করতে পেরেছে?
৩০ সেপ্টেম্বর, জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়। কিন্তু দিবসের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের আড়ালে বাস্তবতার চিত্র অনেক বেশি বেদনাদায়ক। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার খবর। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এখনো আমাদের সমাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় কন্যাশিশুরা বড় অংশজুড়ে রয়েছে। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা হত্যার মতো অপরাধে তাদের অসহায়ত্ব বারবার সামনে আসছে। যে বয়সে একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সুরক্ষা পাওয়ার কথা, সেই বয়সেই তারা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে।
এটি শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হলো—কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে?
এর অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় আইন রয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা ভয় হারিয়ে ফেলছে। দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং নানা ধরনের সামাজিক ও প্রভাবশালী চাপ অনেক সময় ন্যায়বিচারের পথকে কঠিন করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও বিকৃত মানসিকতার বিস্তারও উদ্বেগজনক। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জ্ঞান ও যোগাযোগের বড় মাধ্যম হলেও এর অপব্যবহার সমাজে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি করছে। শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে ডিজিটাল সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীকে দায়ী করার প্রবণতা এবং সামাজিক নীরবতা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা ভবিষ্যৎ চিন্তায় নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করতে দ্বিধা করে। এই নীরবতা অপরাধীর জন্য সুযোগ তৈরি করে, আর ভুক্তভোগী শিশুকে আরও একবার কষ্টের মধ্যে ফেলে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার উন্নত ভবন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ—তার ওপর নির্ভর করে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তাদের মৌলিক অধিকার।
আজকের কন্যাশিশুরাই আগামী দিনের মা, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তাদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। আর যদি আমাদের শিশুরাই নিরাপদ না থাকে, তবে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার জগতে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, আত্মরক্ষার সচেতনতা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আর কোনো মাহিদা, বুশরা বা মুসলিমার শৈশব যেন নির্মমতার কাছে হারিয়ে না যায়। কোনো মা-বাবার কোল যেন সন্তানের লাশে ভারী না হয়।
একটি নিরাপদ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। কারণ কন্যাশিশুর নিরাপত্তাই আসলে আমাদের আগামী দিনের নিরাপত্তা।
লেখক: আলেম, সংগঠক
আইও/