বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই সারাদেশে ম্যালেরিয়ার হানা


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণহানির মধ্যেই দেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যালেরিয়া। সম্প্রতি প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে এসেছে আলোচনায়। বনাঞ্চলভিত্তিক জীবনযাপন, সীমান্তবর্তী চলাচল, পর্যটন বৃদ্ধি এবং গত দেড় বছর ধরে মশার জরিপ না-হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা এখন চ্যালেঞ্জের বিষয়।

গত ২১ মার্চ ২০২৬ ঢাকা থেকে দুটি ট্যুর গ্রুপের ১৯ সদস্যের একটি দল বান্দরবান ভ্রমণে যায়। সেখান থেকে ফিরে এসেই গ্রুপের কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত শারীরিক অবস্থার অনবনতি হলে—ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয় তাদের। এ-সময় শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হলে ভর্তি করা হয় রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।

চলতি মাসে রাজধানীর সূত্রাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে জ্বর নিয়ে কয়েজন রোগী ভর্তি হলে, ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়। পরে তাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ, ম্যালেরিয়ার ওষুধ শুধু সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ থাকায় ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যদিও গ্লোবাল ফান্ডের সহযোগিতায় কার্যক্রম চলমান। তবে পুরোদমে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ম্যালেরিয়া রোগের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকার অনেকটাই অন্ধকারে। কারণ, গত দুই বছর কোনো জরিপ (সার্ভে) করা হয়নি। অথচ প্রতি চার মাস অন্তর জরিপ হওয়ার কথা। ম্যালেরিয়ার মৃত্যুগুলোর ডেথ রিভিউ করা হয়নি, অটোপসি করা হয়নি। এর জন্য দায়ী কে—পরজীবী প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স, নাকি প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম; সেটিও জানা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা শহরে ম্যালেরিয়ার ভেক্টর অ্যানাফিলিস মশা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলো জীবানুবাহী কি না, কেউ জানে না। যদি জীবানুবাহী হয়, তাহলে এই মশা কি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এসেছে, নাকি এখানেই সংক্রমিত হয়েছে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ইমপোর্টেড হলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে, কিন্তু লোকাল ট্রাসমিশন হলে সেটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যে দেখা যায়, গত বছর দেশের ১৩টি জেলায় মোট ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং মৃত্যু হয় ১৬ জনের, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশ উদ্বেগজনক। সংক্রমণের এ ধারা চলতি বছরেও অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে একজনের। ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে বান্দরবান জেলায়। এখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ জন, যা দেশের মোট রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজার ৮৪৫ জন এবং খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন।

আক্রান্তের এ পরিসংখ্যান ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলে সরকারের পরিকল্পনাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যদিও দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে বিষয়টি প্রশাসনিক মহলসহ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১৭ হাজার ২২৫ জন আক্রান্ত হলেও ২০২০ ও ২০২১ সালে কভিড মহামারির প্রভাবে এ সংখ্যা হ্রাস পেয়ে যথাক্রমে ৬ হাজার ১০৪ এবং ৭ হাজার ২৯৪ জনে নেমে আসে। তবে ২০২২ সাল থেকে সংক্রমণ ফের বাড়তে শুরু করে। গত বছর ১৩ হাজার ১০০ জন আক্রান্ত এবং ৯ জনের মৃত্যু হলেও চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে; অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৫৯১ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলই শীর্ষে রয়েছে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এখনো ম্যালেরিয়ার স্থানীয় সংক্রমণ বিদ্যমান। এর মধ্যে বান্দরবানের ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। অনেক পর্যটক ও ভ্রমণকারী পার্বত্য অঞ্চল থেকে জ্বর ও অসুস্থতা নিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ফিরে আসছেন, যা শহরাঞ্চলেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ