|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ ||
অনেক দিন ধরেই যাই যাই করে পরিকল্পনা চলছিল, অবশেষে সুযোগ মিলল। দেখে প্রাণ জুড়ালাম। একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সুন্দর ও মনোরম হতে পারে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আলো ছড়াচ্ছে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বলছি ফেনীর জেলা সদরে কালিদাস পাহালিয়া নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত ‘জামেয়া রশীদিয়া’র কথা।
সাত একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত প্রতিষ্ঠানের শাহী গেট দিয়ে ঢুকে অবাক হই। ‘আহসানুল ফতোয়া’র সংকলক মুফতি রশিদ আহমাদ লুধিয়ানভী (রহ.)-এর স্নেহধন্য ছাত্র ও খলিফা মুফতি শহিদুল্লাহর কীর্তি দেখে যে কেউ অবাক হবেন। সাড়ে সাত হাজার শিক্ষার্থী এ মাদরাসায় পড়ালেখা করছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০০ শিক্ষক এবং ৩০ জন খাদেম ও কর্মচারী রয়েছে।
মাদরাসার শিক্ষকদের আন্তরিক মেহমানদারী, নানা পদের খাবার এবং ছাত্রদের আদব-আখলাক আমাদের মুগ্ধ করেছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে, পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম, তারা চোখ তুলে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেনি। তাদের এভাবে শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে।
মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ৬৩ বছর বয়সী মুফতি শহীদুল্লাহ আমাদের অনেক সময় দিলেন, খোলোমেলা নানা বিষয়ে কথা হলো, দিলেন অনেক প্রশ্নের উত্তর। তার আন্তরিক আলোচনায় আমিসহ সফরসঙ্গীরা বেশ উপকৃত হয়েছি।
মুফতি শহীদুল্লাহ ১৯৬৩ সালের ১২ জুলাই (৩ শাওয়াল, ১৩৮৩ হিজরি) ফেনীর কালিদহ ইউনিয়নের মৌলভী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী আলী আকবর (রহ.) বিশিষ্ট বুজুর্গ সুফি সদরুদ্দিন (রহ.)-এর খলিফা ছিলেন এবং আমৃত্যু ‘লস্করহাট ইসলামিয়া মাদরাসা’র ‘আউয়াল সাহেব হুজুর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আম্মাজান মরহুমা আমেনা খাতুনও ছিলেন একজন নেককার ও খোদাভীরু নারী। বড়ভাই মাওলানা ইসহাক (রহ.) ছিলেন ফেনীর পূর্বাঞ্চলের অন্যতম দ্বীনি সংস্কারক ও মুবাল্লিগ, আলেম গড়ার খ্যাতনামা কারিগর। এভাবে জন্ম থেকেই তিনি ইলম, আমল ও আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ এক সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠেন।
তার দ্বীনি শিক্ষার সূচনা হয় পিতার তত্ত্বাবধানে নিজ এলাকার ‘লস্করহাট ইসলামিয়া মাদরাসা’য়। পরবর্তীতে ‘ভালুকিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসা’য় কয়েক বছর অধ্যয়ন করে ভর্তি হন মেখল হামিউসসুন্নাহ মাদরাসায়। এখানে অধ্যয়নের সুবাদে মুফতিয়ে আজমখ্যত মুফতি ফয়জুল্লাহ (রহ.)-এর সোহবত লাভে ধন্য হন। এছাড়াও তার উস্তাদ ছিলেন মাওলানা আজিজুল্লাহ (রহ.), মুফতি সাইফুল ইসলাম (রহ.), মাওলানা মুযাফফর আহমদ (রহ.), মাওলানা ইব্রাহীম খান (রহ.) প্রমুখ।
এরপর ভর্তি হন দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায়। হাটহাজারী থেকে ১৪০৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৪ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এখানে তার উস্তাদ ছিলেন- আল্লামা হামেদ (রহ.), শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল আজিজ (রহ.), মুফতি আহমাদুল হক (রহ.), আল্লামা হাফেজুর রহমান (রহ.), আল্লামা আবুল হাসান (রহ.), আল্লামা আবদুল হক (রহ.), শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) ও আল্লামা শেখ আহমদ প্রমুখ।
দাওরায়ে হাদিসের পর তিন মাস তাফসির বিভাগে অধ্যয়ন করেন, পরে উস্তাদদের পরামর্শে কক্সবাজারের ‘উখিয়া ডিগুলিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসা’য় শিক্ষকতা শুরু করেন।
কিছুদিন পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৪০৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৫ সালের রমজান মাসে পাকিস্তানের করাচিতে পাড়ি জমান। ভর্তি হন যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন, ফকিহুল আসর, মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠান ‘দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদ’-এ। সেখানে মুফতিয়ে আজম (রহ.) ছাড়াও তার শিক্ষক ছিলেন মুফতি আবদুর রহীম।
ভর্তি হওয়ার অল্প কদিন পরেই তিনি লুধিয়ানভী (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং তিন বছর পর খেলাফতপ্রাপ্ত হন। ইফতা সমাপ্তির পর হজরতের নির্দেশে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন।
দীর্ঘ আট বছর করাচিতে অবস্থান করে ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও শায়খের নির্দেশে নিজ এলাকার মসজিদে তালিম-তারবিয়াতের কার্যক্রম শুরু করে দেন। ১৪১৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তালিম-তরবিয়াতের মারকাজ ‘জামেয়া রশীদিয়া’।
মুফতি শহীদুল্লাহ প্রায় চার দশক ধরে শিক্ষা-দীক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তিনি আপাদমস্তক একজন শিক্ষক এবং সংস্কারক। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বহু বরেণ্য আলেম তার শাগরিদ হিসেবে সমুজ্জ্বল। তার প্রতিষ্ঠিত ‘জামেয়া রশীদিয়া’ আজ দেশখ্যাত একটি দ্বীনি মারকাজ। যার প্রতিটি বালুকণায় অবলোকিত হয় তার ইখলাস, ত্যাগ, নিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনার সূক্ষ্ম ছাপ। শিক্ষার মান, নীতি-আদর্শ, মনোরম পরিবেশ এবং শিক্ষকদের প্রতি তার পিতৃসুলভ দিক-নির্দেশনাই প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি।
শুধু জামেয়া রশীদিয়া নয়, তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় আরও প্রায় পঞ্চাশটি মাদরাসা। পাশাপাশি তিনি ‘তানযীমুল মাদারিসিল কওমিয়া, ফেনী’র সেক্রেটারি এবং ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশে’র আমেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এছাড়া তিনি ‘দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’সহ দেশব্যাপী প্রায় অর্ধশতাধিক দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূরা সদস্য।
তাসাওউফ ও তাজকিয়ার ময়দানেও মুফতি শহীদুল্লাহ একজন সুপরিচিত রাহবার। তার নিয়মিত ইসলাহি মজলিসে শত শত সালেক আত্মশুদ্ধি ও কলবি সুকূনের পিপাসা নিয়ে হাজির হন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে তার বয়ান নিয়মিতভাবে শোনেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য মুসলিম নারী-পুরুষ।
মুফতি শহীদুল্লাহর বয়ানে ঈমান-আকিদা, তালিম-তরবিয়াত, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ অত্যন্ত দরদমাখা ভাষায় উপস্থাপিত হয়। যা শ্রোতার অন্তরে গভীর রেখাপাত করে ও জীবনে আনে ইতিবাচক পরিবর্তন।
কাজ মানুষকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে। মুফতি শহীদুল্লাহ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। আমরা তার সান্নিধ্যে উপকৃত হয়েছি। আর বছরজুড়ে উপকৃত হচ্ছেন সাড়ে সাত হাজার মায়ের সন্তান।
তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। মাদরাসার মাঠজুড়ে নানা জাতের ফলদ গাছ রয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, কোনো শিক্ষার্থী তা খায় না। এমনকি গাছের নিচে পাকা আম কুড়িয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দিয়ে দিচ্ছে ছোট ছোট বাচ্চার। পরিবেশ সংরক্ষণে জামেয়া রশীদিয়া দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আদর্শ। মাদরাসাটি ফলদ ও বৃক্ষরোপণে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৯ সালের জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে এবং পুরস্কৃত হয়।
মাদরাসার বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজ চলমান মসজিদ-মাদরাসার। মাদরাসার ২৫ হাজারের মতো স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সদস্য রয়েছে, যারা মাদরাসার উন্নতি-অগ্রগতির জন্য নিয়মিত দান-অনুদান করেন।
দেশে মুফতি শহীদুল্লাহর মতো দরদি, বিচক্ষণ, আলেম-অভিভাবকরা আছেন বলেই আমাদের দেশে এখনও ইসলাম টিকে আছে। মাদরাসা শিক্ষা সগর্বে আলো ছড়াচ্ছে। দোয়া করি, মুফতি শহীদুল্লাহর জবানের রূহানিয়াত ও প্রভাব জারি থাকুক। তার চিন্তা এবং পরিকল্পনাগুলো আলোর মুখ দেখুক। আর আমরা ধন্য হই তাদের সান্নিধ্য, দোয়া ও ভালোবাসায়।
লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, বার্তা২৪ ডটকম
জেডএম/আইও
