|| এইচ. এম. শাহেদুল ইসলাম তানভীর ||
পাকিস্তানে আসার পর থেকেই পরিচিত-অপরিচিত অনেকে জানতে চেয়েছেন—পাকিস্তানের কওমি মাদরাসাসমূহে পড়তে কীভাবে আসা যায়, এর প্রক্রিয়া কী, থাকা-খাওয়া ও আবাসনের ব্যবস্থা কেমন, পরিবেশ কেমন ইত্যাদি। এখানে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো একত্র করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
১. মাদরাসা কীভাবে নির্বাচন করবেন এবং পছন্দের মাদরাসা সম্পর্কে কীভাবে জানবেন?
সাধারণত পাকিস্তানের নিম্নোক্ত মাদরাসাগুলোতেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা বেশি পড়াশোনা করে থাকেন
- দারুল উলূম করাচি
- জামি'আ বিনুরিয়া আলমিয়া
- জামি'আতুল উলূমিল ইসলামিয়া (বানুরী টাউন)
- জামি'আতুর রশীদ
- দারুল উলূম হাক্কানিয়া
- জামি'আ ফারুকিয়া
- জামি'আ বায়তুস সালাম
- জামি'আ ইবনে আব্বাস
- জামি'আ আশরাফিয়া
এ ছাড়াও কম পরিচিত আরও কিছু মাদরাসায় বিদেশি শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করে থাকেন।
আপনি যে মাদরাসায় পড়তে চান, সে সম্পর্কে আগে থেকেই বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। যেমন: তাদের নেসাবে তালিম (সিলেবাস) কী, ভর্তি পরীক্ষা কেমন হয়, কোন কোন কিতাব থেকে পরীক্ষা নেওয়া হয়, আবাসন ব্যবস্থা কেমন, থাকা-খাওয়া ও শিক্ষার পরিবেশ কেমন ইত্যাদি। এসব বিষয়ে জানতে মাদরাসার নাম লিখে ইউটিউবে সার্চ করতে পারেন। অধিকাংশ বড় মাদরাসার নিজস্ব ওয়েবসাইটও রয়েছে। গুগলে সার্চ করলেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাবেন, ইনশাআল্লাহ।
২. ভিসা—
ভিসার বিভিন্ন ক্যাটাগরি থাকলেও বর্তমানে প্রায় সব মাদরাসায় স্টুডেন্ট ভিসা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘দ্বীনি মাদারিস’ ক্যাটাগরিতে ভিসা দেওয়া হয়, যা মূলত স্টুডেন্ট ভিসার অন্তর্ভুক্ত। চেষ্টা করবেন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়েই আসতে। এতে আপনি এক বছর নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারবেন।
বর্তমানে স্টুডেন্ট ভিসার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে এবং সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই ভিসা পাওয়া যায়। দয়া করে কেউ ট্যুরিস্ট ভিসায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসবেন না। এতে নিজেও সমস্যায় পড়বেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবেন।
তবে কারও যদি পূর্ণ আস্থা থাকে যে তিনি ট্যুরিস্ট ভিসায় বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে সক্ষম, তাহলে প্রথমে এসে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভর্তি-পত্র সংগ্রহ করে দেশে ফিরে গিয়ে স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে পুনরায় আসতে পারেন।
কারণ ট্যুরিস্ট ভিসায় অধ্যয়ন করা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি নয়। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে প্রতিদিনের হিসেবে জরিমানা গুনতে হতে পারে এবং দেশে ফেরার জন্য এক্সিট পারমিটের প্রয়োজন হতে পারে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ থাকে, তবে তা নিশ্চিত নয়। তাই শুরু থেকেই বৈধ ও নিয়মিত স্টুডেন্ট ভিসা গ্রহণ করাই সর্বোত্তম।
৩. ভিসার জন্য অ্যাডমিশন বা অফার লেটার কীভাবে সংগ্রহ করবেন?
আপনি যে মাদরাসায় ভর্তি হতে চান, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন—ফোন, ইমেইল বা অন্যান্য অফিসিয়াল মাধ্যমে। বড় মাদরাসাগুলোর ওয়েবসাইটে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে আপনার—শিক্ষাগত সনদপত্রের পিডিএফ কপি, পাসপোর্টের স্ক্যান কপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন এবং কোন জামাতে ভর্তি হতে চান তা উল্লেখ করুন।
আপনি যদি নির্ধারিত জামাতে ভর্তির উপযুক্ত হন, তাহলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আপনাকে একটি Acceptance Letter বা Admission Letter প্রদান করবে। এই লেটারের ভিত্তিতেই স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে হবে। সাধারণত এই লেটার ছাড়া স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। অথবা রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত যেকোনো একটি মাদ্রাসা থেকে অফার লেটার নিয়েও আবেদন করতে পারেন।
৪. স্টুডেন্ট ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস—
‘দ্বীনি মাদারিস’ ক্যাটাগরির ভিসার জন্য সাধারণত নিম্নোক্ত ডকুমেন্টস প্রয়োজন হয়—
- সাদা (White Background) ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি
- পাসপোর্টের স্ক্যান কপি ( মেয়াদ সম্পন্ন )
- সংশ্লিষ্ট মাদরাসা থেকে প্রাপ্ত Admission Letter
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট অথবা Sponsor Letter
- বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি
- পূর্ববর্তী মাদরাসা থেকে NOC (আবশ্যক নয়, তবে থাকলে ভালো)
এসব ডকুমেন্টস প্রস্তুত থাকলে আপনি ভিসার আবেদন করতে পারবেন। ভিসার আবেদন নিজেই নির্ধারিত ফি প্রদান করে পাকিস্তানের অনলাইন ভিসা পোর্টালে করতে পারেন। চাইলে কোনো বিশ্বস্ত এজেন্সির মাধ্যমেও আবেদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে খরচ কিছুটা বেশি হলেও বিভিন্ন জটিলতা মোকাবিলায় তারা সহযোগিতা করে থাকে। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আর হ্যাঁ! আবেদনের পূর্ব ইউটিউবে ভিডিও দেখে ভালো করে বুঝেশুনে, এবং কোন স্টেপের পর কোন স্টেপ আসবে তা জেনে নেবেন। বা আগে কেউ করেছে এমন কারো থেকে পরামর্শ নেবেন।
৫. ভর্তি পরীক্ষা ও প্রস্তুতি—
কাঙ্ক্ষিত জামাতে ভর্তির জন্য অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, যাতে এসে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়। পর্যাপ্ত যোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে আসুন। অনেকেই আবেগের বশে বা অতিরিক্ত প্রত্যাশা নিয়ে চলে আসেন, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েন।
ভিসা থাকলে সাধারণত বিভিন্ন জামাতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকে, তবে ইন্টারভিউ ও ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এ বছর অনেককেই ভর্তি নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তাই অন্তত জায়্যিদ জিদ্দান মানের ফলাফল নিয়ে আসার চেষ্টা করুন এবং আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভর্তি নীতিমালা সম্পর্কে খোঁজখবর নিন। অনেকেই মনে করেন, "কোনোমতে চলে আসতে পারলেই হয়"—কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই ভর্তি নিশ্চিত হয়। সুতরাং আগে থেকেই প্রস্তুতি নিন, যাতে পরে আফসোস করতে না হয়।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো—দাওরা সম্পন্ন করে আসা অধিকতর উপযোগী। বিশেষত ইফতা ও হাদিস বিভাগে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুতির গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশ থেকে এই দুই বিভাগেই তুলনামূলক বৈচিত্র্যময়তা দেখা যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের মাদরাসাগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাও অত্যন্ত মানসম্মত এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। আলহামদুলিল্লাহ।
তবে পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বাংলাদেশে নেই। তাই আগ্রহী হলে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে, সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম। আল্লাহ পাক সবার সহায় হোন। বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়। তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাবোধও থাকা প্রয়োজন।
৬. বিষয়: থাকা-খাওয়া ও আবাসন ব্যবস্থা—
সাধারণত পাকিস্তানের অধিকাংশ মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আবাসন, তিন বেলার খাবার এবং মৌলিক প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া খেলাধুলা, শরীরচর্চা, চিকিৎসাসেবা ইত্যাদির প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সুবিধা বা উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা নিজ খরচে গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো মাদরাসায় নির্দিষ্ট স্তরের শিক্ষার্থীদের ভাতাও প্রদান করা হয়।
পাকিস্তানে রুটি প্রধান খাদ্য হওয়ায় অধিকাংশ মাদরাসায় রুটি পরিবেশন করা হয়। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় অনেক জায়গায় বিকল্প ব্যবস্থাও থাকে। কিছু মাদরাসায় গ্যাসের চুলার ব্যবস্থা রয়েছে, ফলে শিক্ষার্থীরা চাইলে নিজেরাও রান্না করে খেতে পারেন।
পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইউটিউব, ওয়েবসাইট বা বর্তমানে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিডিও কলের মাধ্যমেও ধারণা নিতে পারেন।
বিশেষ নোট:
- কোনো ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় টাকা-পয়সার লেনদেন করবেন না।
- ভিসা সাধারণত স্বাভাবিক নিয়মে এবং নির্ধারিত সময়েই পাওয়া যায়। তাই তাড়াহুড়ো বা শর্টকাট অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। ধৈর্য ধরুন এবং সব কাজ অফিসিয়াল ও বৈধ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করুন।
আল্লাহ তা'আলা সকলের জন্য কল্যাণ ও সফলতার ফয়সালা করুন। আমীন।
লেখক: শিক্ষার্থী, জামি'আ বিনুরিয়া আলমিয়া, করাচী, পাকিস্তান।
এমএম/