শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ ।। ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২৫ মহর্‌রম ১৪৪৮


আমাদের পীর শায়েখ জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রহ.-এর স্মৃতি


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী ||

কিছু দিন আগে নিজ শহর পাকিস্তানের লাহোর প্রদেশের ঝাং জেলার জামিয়া মা’হাদে ফকির মাদরাসা মসজিদ ও খানাকাহ কমপ্লেক্সে যুগের অন্যতম সেরা মুসলেহ, পীর ও মুর্শিদ হাফিজ মাওলানা পীর জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী এর ওফাত হয়। ইনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত ও প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক পথ পদর্শক ছিলেন। উত্তর আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রোলিয়াসহ সব জায়গায় তাঁর ইসলাহী কার্যক্রম ছড়িয়ে ছিল। তিনি নকশবন্দী মুজাদ্দেদী তরীকার সুন্নতের পাবন্দ হক জামাতের পুনরুজ্জীবনকারীদের একজন। উলামায়ে দেওবন্দের নিকট তাঁর গ্রহনযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে সারা দুনিয়ার হকপন্থী উলামায়ে কেরামের স্নেহ ভালোবাসা সমর্থন ও সম্মান তিনি লাভ করেছিলেন। যে জন্য তাঁকে "মাহবুবুল উলামা" খেতাব দেওয়া হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের ১৫-১৬ জন উস্তাদ তাঁর সাথে নিসবত রাখতেন। তাঁর প্রধান খলিফাদের মধ্যে দেওবন্দের উস্তাদ মাওলানা সালমান বিজনৌরীও মাওলানা মুনীর আহমাদ নকশবন্দী সাহেব সহ আরো কয়েকজন খলিফা আছেন।হযরত মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানী সাহেব হযরতের খলিফা।

ভারতের স্বনামধন্য দায়ী ও বুযুর্গ আলেম মাওলানা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী নদভী (মাওলানা মনজুর নোমানী রহ. এর সাহেবজাদা) হযরতের খলিফা। পাকিস্তানের শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুফতি তকী উসমানী ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবও হযরতের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতেন। মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব হযরতের সম্মানিত খলিফা ও মুজাযও বটে। পবিত্র মক্কা শরীফে হযরত জুলফিকার আমহাদ নকশবন্দী রহ. এর দাওয়াতি ও ইসলাহী কাজ চলতো। তিনি তাঁর চাহিদা মতো সরকারের প্রোগ্রামের সাথে সমন্বয় করে খানায়ে কাবার ভেতর প্রবেশের সুযোগ পেতেন। সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে মুক্তির পর মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশসমূহে অতীত বুযুর্গদের মাকাম, বাড়ী, মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ ও কবরস্থানসমূহ নাস্তিক্যবাদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করা এবং স্থাপত্যসমূহ সংস্কার করার মূল প্রতিকৃত ছিলেন শায়েখ জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রহ.। তাঁর অনুপ্রেরণায় স্বাধীন উজবেক সরকার হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দসহ তরীকার অন্য অনেক বুযুর্গদের জায়গা সম্পত্তি ও ধর্মীয় কেন্দ্র পুনরুদ্ধার করে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। যেমন যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ দায়ী ও আলেম আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর সফর ও নির্দেশনায় তাশকন্দে ইলমে হাদীসের মারকায খোলা এবং সমরকন্দে ইমাম বুখারী রহ. এর কমপ্লেক্স এর হাদীস বিভাগ নতুন করে শুরু হয়েছিল। যেখানে বর্তমানেও শাইখুল ইসলাম আল্লামা তকী উসমানী বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে মর্যাদাপ্রাপ্ত আছেন।

হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রহ. এর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়।

১. তিনি নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে আকাবীরদের শিক্ষা ও আদর্শকে যুগের ভাষায় জীবন্ত করেছিলেন। তার আলোচনার ভেতর গত কয়েক শতাব্দীর বিশেষ করে গত শতাব্দীর আকাবীরে দেওবন্দের তাযকিয়া, ইহসান ও তরীকতের সব জ্ঞানসম্ভার ও সাহিত্যসম্পদ যুগের ভাষায় নিজের আলোচনায় তুলে এনেছেন। এটি একটি তাজদীদি কাজ।

২. তিনি নিজে হাফেজ এবং আলেম। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায় উচ্চ ডিগ্রিধারী একজন পরম মেধাবী ব্যক্তি। পেশাজীবনে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং পাকিস্তান সরকারের বিজ্ঞান ও ইন্ড্রাস্ট্রি অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলি ছিলেন। নিজ শায়েখ ও পাকিস্তানের সেরা উলামায়ে কেরামের নির্দেশনায় ক্যারিয়ারের তুঙ্গ থেকে নেমে এসে ফকিরী জিন্দেগী বেছে নেন। তাঁর মেহনতে সারা বিশ্বের উচ্চশিক্ষিত, বিত্তশালী ও আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত লাখো সাধারণ মুসলমান রুহানী জগতের স্বাধলাভে ধন্য হয়। পাকিস্তানসহ বহু দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা রয়েছে। তাঁর ইসলাহী সাহিত্য সারা দুনিয়ায় নানা ভাষায় ছড়িয়ে রয়েছে।

৩. তাঁর সুন্নতের প্রতি মহব্বতপূর্ণ আনুগত্য এবং সকল সালেকিনের মধ্যে সুন্নতের বাধ্যবাধকতা ছিল অনুভব করার মতো। সময়ের গুরুত্ব, প্রতিদিনের কার্যতালিকার কঠোর বাস্তবায়ন এবং যোগাযোগ, মাহফিল ইন্তেজাম, বিশ্ব ভ্রমন ও মাদরাসা খানকাহ’র ব্যবস্থাপনা সবই ছিল বিজ্ঞানসম্মত সুশৃঙ্খল ও উচ্চমান সম্পন্ন। সাধারণত দীনি দাওয়াতি ও ইসলাহী কাজে বাহ্যত কিছু এলোমেলো ভাব, অপরিচ্ছন্নতা ও বিশৃঙ্খলা দেখে সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত। কিন্তু এই শায়েখের সব কর্মকাণ্ড ছিল খুবই পরিপাটি সুশৃঙ্খল ও উন্নত ব্যবস্থাপনার নমুনা। এ বিষয়ে তাঁর পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও উন্নত রুচিবোধ আমাদের তাজকিয়া, ইহসান ও সুন্নাহসম্মত আধ্যাত্মিকতাকে বিশ্বের সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁর ইখলাস লিল্লাহিয়ত, জিকির মুরাকাবা, তওবা, দোয়া মুনাজাত, রূহানী শের, তারানার সদ্ব্যবহার, হৃদয়ভাঙ্গা আহ ও জারি, অশ্রু বিগলিত বয়ান ও দোয়া, অনুপম বাহ্যিক রূপ সৌন্দর্য, লেবাস ও চেহারার নূরানী আভা তাঁকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছিল।

বাংলাদেশের জন্য তিনি হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ সাহেবকে সমন্বয়কারী খলিফা নিযুক্ত করেন। এরপর অল্প কিছু মানুষকে খেলাফত ও ইজাজত দান করেন। তাদের মধ্যে হযরত মাওলানা শায়খ নুর মুহাম্মদ সাহেব,  নোয়াখালীর হযরত মাওলানা শিব্বির আহমাদ সাহেব,হযরত মাওলানা মমতাজুল করীম (বাবা হুজুর) ও হযরত মাওলানা হানীফ রাগেব সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন জিয়া, মাওলানা মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, অধম লেখক উবায়দুর রহমান খান নদভী, ড. মাওলানা মাহমুদুল হাসান (লন্ডন), মুফতি ইমাদুদ্দীন ও মাওলানা সৈয়দ নুরুল করীম বর্তমানে হায়াতে ও খেদমতে কর্মরত আছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শায়েখ ও মুর্শিদকে জান্নাতে আ’লা মাকাম দান করুন। তাঁর আওলাদ, খোলাফা, তরীকা, প্রতিষ্ঠানসহ সব খেদমতকে জারী রাখুন। দীন ও দুনিয়ার সকল ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি কাজ, ভুলত্রুটি মার্জনাপূর্বক কবুল ও মঞ্জুর করুন।

লেখক: প্রধান পরিচালক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ; জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

আওয়ার ইসলাম/জেডএম


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ