আওয়ার ইসলাম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে।
আজ (২১ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইডি লাউঞ্চে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।
ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার দুর্নীতি দূরসহ ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে।
যা আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহারে।
১. অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি
১. কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা হবে।
২. শুধু দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমন নয়; নির্মূলকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।
৩. শুধু আইনের শাসন নয়; ন্যায়ের শাসনও প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৪. জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংসদ নির্বাচন পদ্ধতির আমূল সংস্কার করা হবে। First Past The Post (FPTP) এর পরিবর্তে Proportional Represenation (PR) পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে।
৫. মানুষের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয় করা হবে।
৬. দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি ও অনৈতিক পেশার সাথে জড়িতদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হবে।
৭. নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও চরিত্রবান প্রার্থীদের বিবেচিত করা হবে।
৮. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকার ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তোলা হবে।
৯. খুন, গুম, মিথ্যা ও গায়েবী মামলা, জুলুম, নির্যাতন ও দুঃশাসনের কবল থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করা হবে।
১০. জনগণের বাক-স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের সকল স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
১১. সকল শ্রেণী, পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে তাদের সঠিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনেও উদ্বুদ্ধ করা হবে।
১২. নারীদের শুধু সমঅধিকার নয়; অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।
১৩. শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় ঋণ, গ্যাস, বিদ্যুত, পানি, স্যুয়ারেজ, আমদানী-রফতানী কার্যক্রমে ওয়ানস্টেপ সার্ভিস কর্মসূচি গ্রহণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু সম্পন্ন করা হবে।
১৪. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হবে।
১৫. সড়ককে নিরাপদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৬. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা হবে।
২. পটভূমি
আমরা মহান আল্লাহ’র শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করছেন। যিনি আমাদেরকে তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধির মর্যাদা দান করেছেন। যিনি আমাদের জীবনকে সুন্দর, সফল ও সার্থক করে গড়ে তোলার জন্য কালজয়ী আদর্শ ইসলামকে মনোনীত করেছেন।
দরূদ ও সালাম সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যিনি মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথের দিশা দিয়েছেন। যিনি মানবজীবনের সকল স্তরে একটি সর্বোত্তম আদর্শ রেখে গেছেন। যার অনুসরণে মানবজীবন ধন্য ও উন্নত হয়। অনাবিল শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা হয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে।
আমরা আরও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। বিজয় অর্জন করেছি ১৯৭১ সালের এ ডিসেম্বর মাসেই।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গঠনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে প্রথমে দুটি কথা বলতে চাই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমধর্মী নাম। এটি গতানুগতিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকাই এর উদ্দেশ্য নয়। এর উদ্দেশ্য হলো দেশের স্থায়ী শান্তি ও মানবতার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে গণমানুষের সমর্থন নিয়ে দেশের প্রচলিত রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে আমাদের এ প্রিয় দেশকে গড়ে তোলা।
এ লক্ষ্যে আশির দশকের শেষদিকে দেশ, জাতি ও মানবতার এক যুগসন্ধিক্ষণে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যখন মারাত্মক ধ্বস নেমেছিল। পচন ধরেছিল সমাজের সর্বস্তরে। জাতির মধ্যে দেখা দিয়েছিল চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান প্রায় লোপ পেতে বসেছিল।
রাজনীতিবিদদের ওপর থেকে মানুষ আস্থা ও ভক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নের পরিবর্তে রাজনীতিবিদদের কল্যাণ ও উন্নয়নই মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছিল। দেশ শাসনের নামে দুঃশাসনের তা-বে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল।
জালেমের জুলুমে এবং মজলুমের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কম্পমান হয়ে উঠেছিল। মানুষের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ভুলূণ্ঠিত হয়ে পড়েছিল। দেশ জাতি মানবতা ও রাজনীতির এ দুরবস্থা দেখে তৎকালীন সময়ে যে মানুষটি পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন, তিনি হলেন হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম (রহ.)।
তিনি ছিলেন একাধারে একজন হক্কানী আলেম এবং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা। অপরদিকে তিনি ছিলেন অন্যায়-অবিচার, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি মিথ্যার সাথে কখনও আপস করেননি, অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি, জালিমের সাথে কখনো আঁতাত করেননি।
তিনি চিন্তা করলেন রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে দেশের মানুষকে কিভাবে মুক্ত করা যায়। এ লক্ষ্যে তিনি দেশের বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম, পীর মাশায়েখ এবং দীনদার বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে দীর্ঘ পরামর্শক্রমে ১৯৮৭ সালের ১৩ই মার্চ গঠন করলেন ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’। পরবর্তীতে সংগঠনের পরিচিতিকে আরও ব্যাপক, সর্বজনীন ও অর্থবহ করে তোলার জন্য নামকরণ করা হয় ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’।
রাজনীতিতে নেমেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু উক্তি করলেন, যা চিরাচরিত রাজনৈতিক ধারাকেই পাল্টিয়ে দিল। তার বক্তব্যে সাংবাদিকদের রিপোর্টও পাল্টে গেল। তিনি সকল মহলে অল্পদিনের মধ্যে একটি অভূতপূর্র্ব সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার মোহ-ই হল সকল সন্ত্রাসের মূল।’ ‘ধর্মহীন রাজনীতি শোষণের হাতিয়ার।’ ‘শুধু নেতা নয়, নীতিরও পরিবর্তন চাই।’
শুধু ক্ষমতাপ্রেমিক হলে দেশ ও মানুষের সেবা করা যায় না। দেশ ও মানুষের সেবা করতে হলে অবশ্যই দেশপ্রেমিক হতে হবে। এজন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমধর্মী দল। যেখানে দেশ, জাতি ও মানুষের কোন স্বার্থ নেই, কোন কল্যাণ নেই, সেখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও নেই। তিনি আরও ঘোষণা করলেন আত্মশুদ্ধি ছাড়া কেউ মানুষের কল্যাণে ও দেশের উন্নয়নে রাজনীতি করতে পারে না।
হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম (রহ.)-এর দেখানো পথ ধরে, হযরত ওলামায়ে কেরাম ও সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমর্থন ও অংশগ্রহণে এবং নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীদের ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে সংগঠনটি গোটা বাংলাদেশে একটি মজবুত গণভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অশেষ শুকরিয়া, আমাদের মরহুম আমীরের ইন্তেকালের পর তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও কর্মসূচিকে আঁকড়ে ধরে সারাদেশের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ঐক্য, সংহতি, সক্রিয়তা, ত্যাগ ও কুরবানী আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমানুষের মাঝে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
দেশপ্রেমিক এবং শান্তি ও মুক্তিকামী জনতার মাঝে আন্দোলনের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের একটি বিপুল অংশ আমাদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। এবং সমাজ পরিবর্তনের একটি স্বপ্ন দেখছেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আজ হাতপাখা প্রতীক নিয়ে দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত, উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আমি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পূর্বে আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি।
২.১ কল্যাণরাষ্ট্র ও অকল্যাণরাষ্ট্র
মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানবসমাজে যতগুলো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তন্মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থাই হল সর্বোত্তম কার্যকর পদ্ধতি। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে সত্যিকারের কল্যাণ এবং কাম্যমানের উন্নয়ন রাষ্ট্রশাসক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বা সংবিধানের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মান যত উন্নত হয়, দেশও তত উন্নত হয় এবং জনগণও এর সুফল পেয়ে ধন্য হয়। শাসনক্ষমতা একটি শক্তি, যা সকল অপশক্তিকে পরাভূত করে মানবজীবনকে সুন্দর, সফল ও সার্থক করে গড়ে তুলতে পারে।
রাষ্ট্রের শক্তিকে যদি একটি অস্ত্রশক্তির সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে এভাবে বলা যায়- একটি অস্ত্রের অপব্যবহারের কারণে মানুষের অকল্যাণ এবং যথাযথ ব্যবহারে মানুষের কল্যাণ নিহীত। অস্ত্রটি যদি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে উক্ত অস্ত্রটি মানষের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়ক হয়। আর অস্ত্রটি যদি ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের হাতে ব্যবহৃত হয় তাহলে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
তদ্রুপ রাষ্ট্র শাসনের বেলায়ও এ কথাটি প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের শাসকবর্গ যদি সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও আল্লাহভীরু হন, তাহলে তাদের শাসনে দেশের উন্নয়ন ঘটে, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা, মানবাধিকার, ভোটাধিকার, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ দেশ একটি কল্যাণময় রাষ্ট্রে পরিণত হয়। মানুষের জীবনে ফিরে আসে অনাবিল শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ। এ ধরণের শাসকবর্গের সাথে জনগণের একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জনগণ ও সরকার হয়ে ওঠে একে অপরের পরিপূরক।
অপরপক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা যদি অসৎ, অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, কালো টাকার মালিক ও দুর্বৃত্তদের হাতে থাকে, তাহলে এ ধরণের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে জনগণের অকল্যাণ, অশান্তি, দুঃখ-দুর্দশা দিন দিন বাড়তেই থাকে। অসৎ-অযোগ্য শাসকের কারণে দেশ-বিদেশে দেশের ভাবমর্যাদা চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়। সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক নীতি দরকার। সঠিক নীতি ছাড়া সৎ এবং যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। একটি প্রবাদ আছে; ‘শাসক জনগণকে শাসন করে আর নীতি শাসন করে শাসককে।’
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি যদি সঠিক এবং বাস্তবসম্মত না হয় এবং শাসকবর্গ যদি সৎ, যোগ্য এবং আল্লাহভীরু না হন, তাহলে দেশের যে কত দূরবস্থা হয়, রাজনৈতিক অঙ্গন যে কত ভয়াবহ হয়, মানুষের জীবন যে কত দূর্বিষহ হয়, এর বাস্তব নিদর্শন হল আমাদের দেশের চলমান রাজনৈতিক দূরবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-, যা স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন পেক্ষাপটে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়ে আসছে।
রাজনৈতিক অঙ্গন হয়ে পড়েছে দুষিত, বিষাক্ত, কুলষিত এবং নোংরা। যার নগ্ন ছোবলে মানবজীবন আজ ক্ষত-বিক্ষত। এ কারণে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দেশ শাসনের সঠিক কোন পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। পদ্ধতি যা গড়ে উঠেছে তা অত্যন্ত বিভীষিকাময়, হৃদয়বিদারক, ভয়ঙ্কর, জংলী ও বর্বর প্রকৃতির।
২.২ স্বাধীনতার ৪৭ বছর
স্বাধীনতার ৪৭ বছরে মানুষের ভাগ্যবদলের দোহাই দিয়ে, দূর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশের কথা বলে, শান্তিময় জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ দেশে অনেক নেতার পরিবর্তন, দফার পরিবর্তন ও সরকার কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। কখনও রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার, কখনো সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, কখনও সামরিক সরকার, কখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কখনওবা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছে।
এছাড়া বাংলার অনেক রূপের পরিবর্তনের কথাও এদেশের মানুষ শুনেছে- কখনও সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে জাতিকে মোহিত করা হয়েছে। কখনও সবুজ বাংলা গড়ার আশ্বাস দিয়ে জাতিকে বিভোর করা হয়েছে। কখনওবা নতুন বাংলা গড়ার কথা বলে জাতিকে চমক দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলার সকল রূপের কথা দেশের প্রেক্ষাপট থেকে হারিয়ে গেছে।
এখন শুরু হয়েছে ডিজিটাল বাংলার উল্লাস। অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম, হরতাল, ঘেরাও-অবরোধ হয়েছে। এতকিছুর পরও কি মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়েছে? এতকিছুর পরও কি উন্নয়ন-উৎপাদনের সুস্থ কোন রাজনৈতিক ধারা এবং সঠিক ও কল্যাণময় দেশশাসনের কোনো পদ্ধতি গড়ে উঠেছে? মানুষের মৌলিক অধিকারসহ ভোটাধিকার কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হয়েছে? দুর্নীতি-সন্ত্রাস কি কমেছে?
আদৌ নয়; বরং দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষতাসীনরা দু’হাতে দেশের টাকা লুটপাট করে আঙ্গুল ফুলে শুধু কলাগাছই হয়নি; বটগাছ হয়েছে। লুটপাটের টাকা দেশে রাখা নিরাপদ নয় মনে করে দুর্নীতিবাজ এবং লুটেরারা বিদেশে অঢেল টাকার পাহাড় গড়ে অর্থনীতির মেরুদ- ভেঙ্গে দিয়েছে। এছাড়াও তারা গ.গ ২হফ ঐড়সব (গধষধুংরধ গু ঝবপড়হফ ঐড়সব), কানাডায় বেগম বাজার এবং সুইচ ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশে অঢেল টাকা জমা করেছে।
এর ফলে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়েছে ব্যাপক হারে। ধনী পরিবারের আয় এর ফলে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়েছে ব্যাপক হারে। ধনী পরিবারের আয়
বৃদ্ধির কারণে শীর্ষ ১০ ভাগ মানুষ দেশের ৩০% সম্পদের মালিক। অপরদিকে নিম্ন আয়ের ১০% অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী দেশের মাত্র ১% সম্পদের মালিক। ধনী-গরীবের এই বৈষম্য দেশের সকল গরীব মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা পূরণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে তুলেছে।
২.৩ ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অবক্ষয়
যারা জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে এবং বিদেশে পাচার করে তারা দেশ, জাতি ও মানবতার শত্রু। মূলত তারা মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং রাষ্ট্রদ্রোহী। তাদের রাজনীতি করার কোন অধিকারই থাকতে পারে না। যারা জনগণের সম্পদ লুট করে, তারাই আবার ক্ষমতা পেলে জনগণের ভোটাধিকারও হরণ করে। জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে সম্পদের পাহাড় বানানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা হলো অনুপার্জিত অর্থ উপার্জনের একটি মহাসুযোগ। এজন্য একদল যেকোনভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং আরেক দল যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এ কাজে তারা সর্বশক্তি ব্যয় করে।
ক্ষমতার মাধ্যমে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। একই ধরনের মামলা ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক মামলা বলে তুলে নেয় এবং বিরোধী দলকে ঐ মামলায় ফাঁসানো হয়। এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। আমূল পরিবর্তন না হলে আমরা কোনোদিন সভ্য জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবো না, পারবো না বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। রেখে যেতে পারবো না নতুন প্রজন্মের জন্য কোন আদর্শ। পারবো না প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটাতে। পারবো না একটি কার্যকর সংসদ বানাতে। দেশপ্রেমিক, শান্তিকামী ও মুক্তিকামী মানুষের সামনে সুযোগ এসেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা রাজনীতিকে কলুষিত করেছে, ভোটের মাধ্যমে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখান করার।
২.৪ আশ্চর্যজনক ১২টি অনৈতিক বিষয়ের চরম উন্নয়ন
রাজনীতি ও দেশশাসনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা একটি সভ্যজাতির জন্য আদৌ প্রহণযোগ্য নয়। এটি হল বর্বরযুগের গোত্রীয় সংঘাতের আদলে দলীয় সংঘাত। হানাহানি ও মারামারির সংস্কৃতি। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সংস্কৃতি। রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো সুস্থ এবং সঠিক ধারা সৃষ্টি না হওয়ায় স্বাধীনতা-পরবর্তী যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ১২টি অনৈতিক বিষয়ের চরম উন্নয়ন ঘটিয়েছে! অনৈতিক বিষয়গুলো হলো;
১. দুর্নীতি।
২. সন্ত্রাস।
৩. মানবাধিকারসহ ভোটাধিকার হরণ।
৪. অনুৎপাদন।
৫. বেকারত্ব।
৬. জাতীয় চরিত্র ধ্বংস।
৭. সর্বত্র দলীয়করণ।
৮. ক্ষমতাসীনদের সম্পদের চরম উন্নয়ন।
৯. গণতন্ত্রের নামে দলীয়তন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
১০. জাতীয় অনৈক্য ও সংঘাত।
১১. রাজনীতির নামে ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয়স্বার্থ, তথা কায়েমীস্বার্থ প্রতিষ্ঠা।
১২. স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী বিদেশী রাষ্ট্রের তাবেদারির প্রতিযোগিতা।
ক্ষমতার দাপটে এবং রাজনীতিতে কোনো নীতি-নৈতিকতা এবং সুস্থধারা না থাকায় দেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এর ফলে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ স্বাধীনতার সুফল আজও ভোগ করতে পারেনি। দেশীয় এবং বিদেশী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চরম দুর্নীতি করেছে। তারা দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। দুর্নীতিকে পাকাপোক্ত ও স্থায়ী করার জন্য সন্ত্রাসবাদ কায়েম করেছে। ক্ষমতাই তাদের সকল দুর্নীতি, লুটপাট ও সন্ত্রাসের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
এমন কোনো স্তর নেই, এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে দুর্নীতির থাবা বিস্তার করেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দুর্নীতি এবং টেন্ডারবাজীকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের তা-ব ঘটেনি। শুধু দলীয় ক্যাডাররাই নয়, প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ক্ষমতাসীনরা নির্লজ্জভাবে বিভিন্ন অপকর্মে ব্যবহার করেছে। শাসকশ্রেণীর এহেন অপকর্মের এখনই অবসান ঘটাতে হবে, অন্যথায় দেশের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়বে।
দুর্নীতি একটি জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক সমস্যা। দুর্নীতি একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রকে ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পর্যবসিত করে। বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের মধ্যে কোনো সময়েই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় সংহতি, সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশে আইন, বিচার এবং শাসন বিভাগ স্বাধীনভাবে দায়িত্বশীলতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে না। দুর্নীতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সুখ-শান্তি, দেশপ্রেম, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার চেতনা এবং গণতন্ত্রের চেতনাকেও ম্লান করে দিচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের নাগরিকগণ শাসকগোষ্ঠীর কাছে হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন। তাই শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কোনো তোয়াক্কা করে না। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের
সরকারগুলো মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও কাজ করে স্বৈরশাসকের মত। দুর্নীতিগ্রস্থ দেশে জণগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে পেশিশক্তি, কালো টাকা ও ভোট ডাকাতিই হয় ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। এহেন রাজনৈতিক দূরবস্থা থেকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ তথা দেশের ১৬ কোটি নাগরিককে মুক্ত করার সুমহান লক্ষ্যেই আমাদের আজ এই আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার।
২.৫ দুর্নীতির ব্যাপকতা ও বাংলাদেশের অবস্থান
দুর্র্নীতি আমাদের সব অর্জনকে কিভাবে গ্রাস করেছে, তার কিছু ভয়াবহ চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো-
ক. দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান (১৯৫টি দেশের মধ্যে) :
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ১ম ছিলো।
২০০৬ সালে দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩য়, ২০০৭ সালে ৭ম,
২০০৮ সালে ১০ম,
২০০৯ সালে ১৩তম,
২০১০ সালে ১২তম,
২০১১ সালে ১৩তম,
২০১২ সালে ১৩তম,
২০১৩ সালে ১৬তম,
২০১৪ সালে ১৪তম,
২০১৫ সালে ১৩তম,
২০১৬ সালে ১৫তম,
২০১৭ সালে ১৭তম।
খ. দুর্নীতির খতিয়ান :
২০১৭ সালের রিপোট অনুযায়ী ৬৬.৫% পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। গড়ে প্রতি পরিবারকে ঘুষ দিতে হয়েছে ৫৯৩০ টাকা। ২০১৭ সালে মোট ঘুষের টাকার পরিমাণ ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্থ খাত;
পাসপোর্ট – ৬৭.৩%
বিআরটিএ – ৬৫.৪%
বিচারিক সেবা – ৬০.৫%
ভূমি সেবা – ৪৪.৯%
শিক্ষা – ৪২.৯%
স্বাস্থ্য – ৪২.৫%
[তথ্যসূত্র : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)]
গ. আর্থিকখাতের কেলেংকারী :
ব্যাংক খাতের অদক্ষতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। (দৈনিক সমকাল ৫ এপ্রিল ২০১৮)
খেলাফী ঋণ- ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
(দৈনিক যুগান্তর ৫ জুন ২০১৮)
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি গেছে ৮০০ কোটি টাকা।
(উইকিপিডিয়া)
সোনালী ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে একা হলমার্কই নিয়েছে দুই হাজার ৬৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। (প্রথম আলো ০৫-০৯-২০১২)
জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারী প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
(দৈনিক প্রথম আলো ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারী সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।
(দৈনিক প্রথম আলো ২৭-০৬-২০১৩)
ঘ. ফ্লাইওভার নির্মানে দুর্নীতি :
মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।
রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক সমন্বিত ফ্লাইওভারের কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা।
কুড়িল ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০৬ কোটি টাকা।
মিরপুর-বিমানবন্দর সড়কে জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে ১০৫ কোটি টাকা।
অপরদিকে কলকাতায় গত বছরের ৯ অক্টোবর মহানগরীর দীর্ঘতম পরমা ফ্লাইওভার উদ্ধোধন করা হয়। ৮ দশমিক ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারে ব্যয় হয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
সম্প্রতি চীনে ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। মালয়েশিয়ায় ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি ফ্লাইওভার নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। (দৈনিক কালের কণ্ঠ ৩১ মে ২০১৬)
ঙ. রাস্তা নির্মাণে দুর্নীতি :
বাংলাদেশে ১ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে ব্যয় হয় ৯৪ কোটি টাকা, অথচ একই সময়ে ভারতে ব্যয় হয় ১০ কোটি, চীনে ১০ কোটি আর ইউরোপে মাত্র ২৫ কোটি টাকা।
তথ্যমতে ইউরোপে চার লেনের নতুন সহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৯ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা।
তবে বাংলাদেশের ছয়টি চারলেন প্রকল্পের কিলোমিটারপ্রতি গড় নির্মাণব্যয় ৫৪ কোটি টাকা। তার মধ্যে সর্বশেষ নেওয়া ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কের নির্মাণব্যয় কিলোমিটারে ঠেকেছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।
(কালের কণ্ঠ ২১ জুন ২০১৬)
চ. বিদেশে সম্পদ পাচারের খতিয়ান :
২০০৫-২০১৪ সাল পর্যন্ত পাচার হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের দুই অর্থবছরের বাজেটের সমান। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তা প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা। (দৈনিক ইনকিলাব ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭)
সুইচ ব্যাংকে বাংলাদেশের টাকার পরিমাণ ২০% বেড়েছে। অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা। মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোম নির্মাণে বাংলাদেশ ৩য় অবস্থানে রয়েছে। (বিবিসি বাংলা ২২ জুলাই ২০১৭)
কানাডায় গড়ে উঠেছে বেগমপাড়া। এখানেও অনেকের বিনিয়োগ আছে।
এছাড়াও বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
২.৬ দেশ পিছিয়ে থাকার কারণ
যে জাতি মাত্র ৯ মাসে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই অদম্য জাতিকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে ৪৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। নীতিহীন ভোগবাদী রাজনীতির কারণেই অদম্য বাঙালি জাতির উন্নয়ন এভাবে ব্যহত হয়েছে।
স্বাধীনতার রজতজয়ন্তির প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুহূর্তে আমরা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আপনাদের সামনে কিছু বৈশ্বিক প্রতিবেদন পেশ করতে চাই। দেখুন! বিভিন্ন মানদ-ে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে! অন্য দেশগুলো কতটা এগিয়ে গিয়েছে আর আমরা কতটা পিছিয়ে রয়েছি!
গত ১৭ অক্টোবর ২০১৮ বিশ্বব্যাংক poverty and shared prosperity 2018: piecing together the poverty puzzle শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী সংখ্যায় চরম দারিদ্র্যে শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে
বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ। মোট ২ কোটি ৪৪ লক্ষ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার। যারা দৈনিক ১৬০-১৮০ টাকাও উপার্জন করতে পারে না।
১০ অক্টোবর ২০১৮ পিি যৌথভাবে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক প্রকাশ করে। ১১৯টি দেশ নিয়ে তৈরি করা এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬।
১০ অক্টোবর ২০১৮ বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো মানবসম্পদ সূচক প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬।
এভাবে বৈষম্য হ্রাস প্রতিশ্রুতি সূচকে ১৮৪ তম। শ্রমিক অধিকার ও বেতন ভাতা ১৪৮তম, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন ১০৩ তম।
অন্যদিকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ এর প্রতিবেদন অনুসারে ২০১২ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাংলাদেশে অতিধনী বাড়ছে; যাদের সম্পদ ২৫ কোটি টাকারও বেশি।
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৭.৭% ঘটছে পরিবেশ দূষণের কারণে।
২৪ মে ২০১৮ বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব সড়ক সুবিধাবঞ্চিতদের তালিকায় বাংলাদেশ ৪র্থ।
এভাবে বিশ্বের সকল নেতিবাচক জরিপে বাংলাদেশ শীর্ষ কাতারে। অন্যদিকে সকল ইতিবাচক জরিপে বাংলাদেশ নিম্ন সারিতে। অথচ শক্তি-সাহস, অদম্যতা, শৌর্য-বীর্যে আমরা বিশ্বের সেরা জাতিগুলোর একটি। যা আমরা ৫২ ও ৭১ সালে প্রমাণ করেছি। কিন্তু ভুলনীতি, দুর্নীতিবাজ ও অদক্ষ নেতৃত্বের কারণে আজ আমাদের এই অধঃপতিত অবস্থা।
৩. নাগরিক সুবিধা প্রদান
দুর্নীতির প্রকাশিত এ চিত্র এবং পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করে, জনগণকে যেসব নাগরিক সুবিধা দেওয়া হবে, তা নিম্নরূপ;
ক. সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ২০% কমানো হবে।
খ. জীবনকে স্বাচ্ছন্দময় করে তোলা এবং শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জ্বালানী তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ৩০% কমানো হবে।
গ. মানবিক কারণে রিক্সা, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ীর লাইসেন্স ফি মওকুফ করা হবে।
ঘ. বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ সকল গণপরিবহনের লাইসেন্স ফি অর্ধেক করা হবে।
ঙ. জমির খাজনা, সকল ধরনের টোল এবং হোল্ডিং ট্যাক্স ৩০% কমানো হবে।
চ. কৃষকের উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নেওয়ার স্বার্থে সার, সেচ ও বীজ অর্ধেক মূল্যে বিতরণ করা হবে।
ছ. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য শ্রমিকের বেতন দ্বিগুণ করা হবে।
জ. চিকিৎসা সহজলভ্য করার জন্য চিকিৎসার খরচ ৫০% কমানো হবে।
ঝ. সকল সেক্টরের পরিবহন ভাড়া ৩০% কমানো হবে।
ঞ. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হবে।
ট. সকল মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খাদেমকে সম্মানজনক ভাতা দেওয়া হবে।
ঠ. মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডাসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবককে সম্মানজনক ভাতা প্রদান করা হবে।
ড. আয়কর ও ভ্যাট ৩০% কমানো হবে।
ঢ. আমদানী ও রফতানী শুল্ক ৩০% কমানো হবে।
ণ. ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে এবং লোডশেডিং বন্ধ করা হবে।
ত. সর্বত্র আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হবে।
থ. টেকসই ও গ্যারান্টিসহ রাস্তাঘাট এবং সকল অবকাঠামো নির্মান করা হবে।
দ. রাস্তা-ঘাট এবং ফেরীতে সকল ধরনের অবৈধ চাঁদা ও টোকেন মানি বাতিল করা হবে।
ধ. দেশীয় এবং বৈদেশিক ঋণ ১৫ বছরের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।
ন. শিক্ষার্থীরা অধ্যয়নকালীন যাতে পুজি সঞ্চয় করে সাবলম্বী হতে পারে, এ লক্ষ্যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্ট্যুডেন্ট সেভিংস ব্যাংক (ঝঝই) গঠন করা হবে।
প. সকল কর্মকর্তা-কর্মচারির ২৫% বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে।
ফ. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা হবে।
৪. দুর্নীতি ও সন্ত্রাস শুধু দমন নয়; নির্মূলকরণ কর্মসূচি গ্রহণ
দুর্নীতি সন্ত্রাস একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতিকে পাকাপোক্ত করার জন্যই সন্ত্রাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি একটি ব্যর্থরাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে। সর্বত্র সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়া একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যই বহন করে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের তা-ব থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য দুর্নীতি ও সন্ত্রাস শুধু দমনই নয়; বরং নির্র্মূলকরণে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ লক্ষ্যে আমাদের কর্মসূচি নিম্নরূপ-
শুধু দুর্নীতি দমন নামে কোন সংস্থা গঠন করলে বা কর্মসূচি গ্রহণ করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। কারণ প্রতিকুল পরিবেশে হয়ত দুর্নীতি কিছুটা সাময়িক কমতে পারে কিন্তু দুর্নীতিবাজরা যখন সুযোগ পাবে, তখন আগের চেয়ে অনেক গুণ বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়বে। এজন্য দুর্নীতি ও সন্ত্রাস শুধু দমন নয়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
ক. দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মূল উৎসগুলো চিহ্নিত করে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খ. দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, কালোটাকার মালিক, ঋণ খেলাপী, বিদেশে টাকা পাচারকারীদের রাজনীতিতে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে এবং যে দল দুর্নীতি, সন্ত্রাস, কালো টাকা ও পেশীশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেই দলের নিবন্ধন বাতিল করার আইন পাশ করা হবে।
গ. দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সচেতন করা হবে। এ কাজে সমস্ত প্রচারযন্ত্র, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মসজিদের ইমাম, আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখসহ অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত ভূমিকা পালনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
ঘ. মানুষের অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধকে উন্নত করার জন্য ব্যবহারিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য জনগণের প্রতি নির্দেশনা জারী করা হবে। একজন সত্যিকারের ধার্মিক মানুষ কখনও অন্যের ক্ষতি করে না, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত হয় না, দেশ ও মানুষের অকল্যাণ চিন্তা করে না।
ঙ. আদর্শ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। মানুষের নৈতিকতা রক্ষাকল্পে চরিত্রবিধ্বংসী অপসংস্কৃতি বন্ধ করে সুস্থ কল্যাণধর্মী সংস্কৃতি চালু করা হবে। অনেক বাস্তবসম্মত কারণে দমনমূলক সাজার প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে ব্যহত হয়। এসব কারণেই সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনমূলক ব্যবস্থাকে যত অল্প সময়ের জন্য সম্ভব একটি অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সীমিত রেখে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি নির্মূল কৌশলের দিকে বেশি জোর দেওয়া হবে।
চ. জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/ কর্মচারিদের কারও দুর্নীতি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাতে অন্য কেউ দুর্নীতি করতে সাহস না পায়। জনপ্রতিনিধি এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের দুর্নীতি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এরপরেও দুর্নীতি থেকে বিরত না হলে, তাদের তিন গুণ শাস্তির বিধান করা হবে। ১ম শাস্তি অপরাধ করার জন্য, ২য় শাস্তি রাষ্ট্রের সাথে ওয়াদাভঙ্গ করার জন্য, ৩য় শাস্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করার জন্য।
ছ. বঙ্গভবন থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সকল অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দেশ ও মানবতাবিরোধী কর্মকা- বন্ধের লক্ষ্যে ধর্মীয় বাণীসহ বিভিন্ন মনীষীদের বাণীসমূহ টাঙ্গিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
জ. ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে না বল’ এবং ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে ঘৃণা কর’Ñ এ বিষয়ে জনমত সৃষ্টির লক্ষে বিভিন্ন মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে।
ঝ. সকল স্তরের জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিগণকে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে এবং অবসরকালীন সময়েও দুর্নীতি না করার অঙ্গীকার নেওয়া হবে।
৫. রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন
এ লক্ষ্যে আমাদের কর্মসূচি-
ক. দেশের সর্বস্তরে অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্ব পরিবর্তন করে, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে।
খ. রাজনৈতিক শক্তিই জাতীয় জীবনের সকল দিক নিয়ন্ত্রণ করে বলে এ অঙ্গনকে চরিত্রহীন, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও অসৎ নেতৃত্বমুক্ত রাখতে জনমত গড়ে তোলা হবে এবং সকল রাজনৈতিক দলকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করে জাতীয় ঐক্যমত্য গড়ে তোলা হবে।
গ. দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চিহ্নিত অসৎ চরিত্রসম্পন্ন লোকদেরকে দলে স্থান না দেয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলসমূহকে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
ঘ. নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসন বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আত্মিক পরিশুদ্ধিসহ চিন্তা-বিশ্বাস ও কর্মের পরিশুদ্ধি ঘটানো হবে। এর মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ উন্নয়নের একটি আবহ সৃষ্টি করা হবে।
ঙ. জনগণের দুঃখ-দুদর্শার জন্য সবচেয়ে বড় কারণ অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্ব। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ইসলামের অনুশাসন পালনে উদ্বুদ্ধ করা, আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত করা, আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ দান করা, সর্বোপরি অসৎ কাজের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, নিজের বিবেক এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত করা হবে।
৬. কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনপদ্ধতির আমূল সংস্কার
সার্বজনীন ভোটাধিকার ও অবাধ-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বহুদিন ধরে এদেশের মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। পাকিস্তানের আইয়ুবী শাসনামলের প্রায় একযুগ ধরে ‘এক লোক এক ভোট’, ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন’ ইত্যাদি দাবিতে দেশবাসীকে রক্ত দিতে হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের মোট দেড় দশকের শাসনকাল জুড়ে ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে
দেব’ দাবিতে জনগণকে রক্তঝরা সংগ্রাম করতে হয়েছে। এভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকার ও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিটি ছিল আন্দোলন সংগ্রামের অন্যতম প্রধান দাবি।
নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণজাগরণের ফলে এরশাদের ক্ষমতার অবসানের পর দেশবাসীর মনে তাই যুক্তিসংগত কারণে আশা জেগেছিল যে, এরপর আর এই দাবিতে সংগ্রাম করার প্রয়োজন হবে না।
কিন্তু জনগণের সেই আশা ধূলিসাৎ হয়েছে। গত আড়াই দশক ধরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দুটি দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি), সার্বজনীন ভোটাধিকার ও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয় তাদের হাতে নির্বাচনপ্রক্রিয়া একটি প্রহসন ও তামাশায় পরিণত হয়েছে।
জনগণের অবাধ-ভোটাধিকার প্রয়োগ ও ভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা ও মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করাই হলো একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রাথমিক ও মৌলিক পূর্বশর্ত। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনের পরিবর্তে অর্থ, পেশীশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি ইত্যাদির প্রহসনমূলক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রহসনের খেলা থেকে নির্বাচনব্যবস্থাকে মুক্ত করা এখন জরুরি কর্তব্য। প্রশ্ন হলো, এ কর্তব্য পালনে সুনির্দিষ্ট করণীয় কী?
অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য কেবল কিছু লোকদেখানো উপরভাসা সংস্কারে আর কাজ হবে না। এজন্য প্রয়োজন গোটা নির্বাচনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার ভিত্তিতে ‘অনেক প্রার্থীর মধ্যে যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে সে জয়ী হবে’ (First Past The Post – FPTP) ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক’ (Proportional Represenation – PR) ব্যবস্থা চালু করা হবে। পদ্ধতি নিম্নরূপ;
ক. ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ তথা চজ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত কাজ-কর্ম সম্পর্কে নীতি-কর্মসূচি-প্রস্তাবনা-পরিকল্পনা ইত্যাদি বর্ণনা করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থাপন করবে। এসবের মধ্যে ভোটার যেখানে তার ইচ্ছার সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাবে সেই দলের মার্কায় সে ভোট দেবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই দল তার ৩ গুণ সংখ্যক প্রতিনিধি জাতীয় সংসদে পাঠাতে পারবে। অর্থাৎ ৩০০ আসনের সংসদে কোনো দল ৫০% ভোট পেলে ১৫০ আসন পাবে, কোনো দল ১০% ভোট পেলে ৩০টি আসন পাবে ইত্যাদি।
খ. চজ ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল ইশতেহার ঘোষণার পাশাপাশি সংসদে আসন নেওয়ার জন্য তাদের দলের প্রতিনিধিদের তালিকা অগ্রাধিকারক্রম অনুসারে নির্বাচনের আগেই দেশবাসীকে জানিয়ে দেবে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুসারে যে কয়টি আসন সেই দলের প্রাপ্য হবে, তালিকার ক্রমানুসারে সেই কয়জন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।
গ. চজ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন, প্রশাসনিক অথবা অন্য কোনো কাজের সাথে জড়িত থাকবেন না। তারা শুধু জাতীয় নীতি-নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয়-প্রশাসনের কাজ-কর্ম তদারক করা ইত্যাদিতে জড়িত থাকবেন। স্থানীয় সব উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম সেই এলাকার নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
ঘ. বর্তমানে নির্বাচন যেভাবে কালো টাকার খেলা হয়ে উঠেছে, চজ ব্যবস্থায় তা অনেক কমে যাবে। এর প্রধান কারণ হলো, তখন জাতীয় নির্বাচন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও এলাকাভিত্তিক হবে না বিধায় এমপি জিতিয়ে আনার জন্য এখন যেভাবে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায় নির্বাচনে একধরনের ‘পুঁজি বিনিয়োগ’ ঘটে থাকে, সেই অবস্থা খর্ব করা সহজতর হবে।
ঙ. ইউরোপের প্রায় সব দেশে, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশে, জাপানে, অস্ট্রেলিয়ায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব তথা চজ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কা ও নেপালে এই ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে।
এ ধরনের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কালো টাকা, পেশীশক্তির প্রভাব বন্ধ হবে। এ ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে হলেও একটি জাতীয় সরকারে রূপ দিবে। জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠিত হবে। যার ফলে সংসদ হবে কার্যকর ও প্রাণবন্ত। সংসদ বয়কট বন্ধ হবে, রাজপথের সহিংস আন্দোলন বন্ধ হবে। সংসদের ভেতর এবং বাহিরে একটি শান্তির আবহ সৃষ্টি হবে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হবে। সংসদে যোগ্যতা ও মেধার প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে।
৭. সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয়
ধর্মের আসল উদ্দেশ্য মানুষকে সৎপথে পরিচালনা করা। সৎকর্মে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, অসৎ কর্ম থেকে মানুষকে বিরত রাখা। ‘মানুষের কল্যাণে মানুষ’ এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করাসহ দেশ, ধর্ম ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখাই ধর্মের উদ্দেশ্য। অপরপক্ষে রাজনীতির উদ্দেশ্যই হল মানুষের কল্যাণ করা। সমাজের অনাচার-অবিচার, জুলুম, নির্যাতন ও অনৈতিক কর্মকা- বন্ধ করা।
রাজনীতির সাথে ধর্মের সমন্বয় না হলে রাজনীতি হয় শোষণের হাতিয়ার। দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, বিদেশে টাকা পাচারকারী, ব্যাংকডাকাত ও ঋণখেলাপীরা কখনই ধার্মিক হতে পারে না। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তাসহ সার্বিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা ধর্ম ও রাজনীতির উদ্দেশ্য।
দুটি বিষয়ের উদ্দেশ্য একই, সেহেতু এ দু’টি বিষয়ের সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমেই প্রকৃত কল্যাণ অর্জন সম্ভব। সত্যিকার একজন ধার্মিক কখনোই মানুষের এবং দেশের অকল্যাণ করতে পারে না। কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘ধর্ম যার যার-রাষ্ট্র সবার’ এ মতে সকল ধর্মের মানুষের মাঝে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ ব্যাপারে আমাদের অঙ্গীকার নিম্নরূপ-
ক. ধর্মের ব্যাপক প্রচার করা হবে এবং ধর্ম-কর্মে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। মানবতা বিরোধী সকল কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখার জন্য ধর্মীয় অনুশাসন বাস্তবায়ন করা হবে।
খ. ধর্মের বিরুদ্ধে যাতে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অথবা রাজনৈতিকভাবে কটুক্তি করতে না পারে সে ব্যাপারে আইন পাশ করা হবে এবং কটুক্তিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হবে।
৮. রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কমিশন গঠন
কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য :
ক. রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ।
খ. ক্ষমতাসীন দলের ইশতেহার পর্যালোচনা।
গ. নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিম নির্বাচনী কার্যক্রম প্রক্রিয়া নিরীক্ষণ।
কমিশন যেভাবে গঠিত হবে :
সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট রা