নিজস্ব প্রতিবেদক
কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ রয়েছে। তবে সরকার যদি দাওরায়ে হাদিস বা মাস্টার্স সমমানের সনদধারীদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়, তবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই নিচের স্তরের (এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক সমমান) সব সার্টিফিকেটের কাঠামো প্রস্তুত করে দেবে দেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)। সম্প্রতি আওয়ার ইসলাম-এর বিশেষ সাক্ষাৎকারে বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী এসব কথা জানান। সাক্ষাৎকারে কওমি সনদের বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, বহির্বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে কওমি সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি।
দীর্ঘ ষোলো বছর পড়াশোনা করে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পাশ করার পরও সনদের কার্যকর ব্যবহার না থাকায় কওমি শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। এ বিষয়ে বেফাক মহাপরিচালক জানান, কওমি সনদ এককভাবে বেফাকের বিষয় নয়; বরং ছয়টি কওমি বোর্ডের সম্মিলিত সংস্থা ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়। সনদকে কাজে লাগানোর জন্য নিচের স্তরের সনদগুলোকে স্তরে স্তরে সাজাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হাইআতুল উলয়ার বৈঠক চলমান রয়েছে। তবে কেন এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাওলানা নদভী বলেন, সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব কাঠামো চাপিয়ে দিতে চায়, আর আমরা দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা ও দ্বীনি বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে স্বীকৃতি বাস্তবায়ন করতে চাই। যখনই দেখা যায় দ্বীনি এলেমের প্রাধান্য কমে যাওয়ার বা মূলধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তখনই আমরা সতর্ক অবস্থান নিই।
কওমি অঙ্গনের সবাই সনদের সরকারি ব্যবহার চায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা নদভী জানান, বেফাকের আওতাধীন প্রায় ৩৫ হাজার মাদ্রাসার পরিচালক ও আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একটি বড় অংশ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনি খেদমতের জন্যই পড়েন এবং পড়ান; তারা সনদ বা দুনিয়াবি সরকারি চাকরি চান না। এমনকি অনেকে মনে করেন সনদ নেওয়াই ভুল হয়েছে। আবার আরেকটি অংশ দেশের নাগরিক হিসেবে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় অধিকার এবং বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণের সুযোগ চান। সব পক্ষের মতামতের ভারসাম্য রক্ষা করেই বোর্ডকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সরকারি চাকরিতে সুযোগ সীমিত থাকলেও কওমি আলেমরা বসে নেই বলে জানান বেফাক মহাপরিচালক। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বাইরে শত শত বেসরকারি খাতে কওমি সনদ ও শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কওমি শিক্ষার্থীরা ইমামতি, কমিউনিটি লিডারশিপ ও সোশ্যাল ক্লাব ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেক কওমি তরুণ সাধারণ শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার পর যখন স্থানীয় আরব মালিকরা দেখেন যে তারা বিশুদ্ধ আরবি, ফিকহ, তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী, তখন তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক বা হোটেল ম্যানেজমেন্টের উচ্চপদে নিয়োগ দেন। বেফাক থেকে সনদ সত্যায়ন করে পাঠানোর পর প্রবাসে তারা লাখ থেকে দুই লাখ টাকা সমমানের বেতনে সম্মানজনক চাকরি করছেন। এ ছাড়া দেশের ভেতরেও অসংখ্য আলেম সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
নিচের স্তরের সনদ না থাকায় মাস্টার্স সমমানের সনদ কাজে লাগছে না—এমন সমালোচনার জবাবে মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী প্রশ্ন রাখেন, দাওরায়ে হাদিসের যে সনদকে মাস্টার্সের মান দেওয়া হয়েছে, সেই মাস্টার্সের সমমানের কোনো পদে কি সরকার এখন পর্যন্ত কাউকে চাকরি দিয়েছে? আজকে সরকার ঘোষণা দিক যে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আরবি প্রভাষক পদে, সরকারি মসজিদের ইমাম পদে কিংবা বাহিনীর ধর্মীয় প্রশিক্ষক পদে দাওরায়ে হাদিস পাশদের নিয়োগ দেওয়া হবে—কালকেই আমরা নিচের সব সনদ (এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি সমমান) তৈরি করে দেব। নিচের স্তরের সনদের সেট তৈরি করা আমাদের জন্য কোনো ব্যাপারই নয়।
দেশের সরকারি দপ্তরে নানা জটিলতা থাকলেও বহির্বিশ্বের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কওমি সনদ দারুণভাবে কার্যকর। বেফাক মহাপরিচালক জানান, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিশ্বের অন্তত ১০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেফাকের সনদ নিয়ে শিক্ষার্থীরা বর্তমানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। কওমি সনদের ইংরেজি অনুবাদ এবং সিলেবাসে থাকা বাংলা, ইংরেজি, দশম শ্রেণি সমমানের গণিত এবং উসুল, ফিকহ ও হাদিসের মতো সমৃদ্ধ বিষয়বস্তু দেখে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহজেই শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাংশের আচরণ নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন মাওলানা নদভী। তিনি জানান, কওমি সনদের বিষয়ে আলোচনার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে কখনো কখনো কারিগরি বোর্ডের উপসচিব বা নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে চিঠি দেওয়া হয়, যাদের কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। এ ছাড়া বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সনদ সত্যায়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদার মানসিকতা রয়েছে; তারা বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে কওমি শিক্ষার্থীদের সনদে সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে দেন। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার কর্মকর্তা অতীতে সিল দিতে অনীহা প্রকাশ করতেন। অথচ একটি সিল দিলে তো সরকারকে বেতন বা এমপিও দিতে হচ্ছে না, বরং একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশের মাটিতে কর্মসংস্থান বা শিক্ষার পথ সুগম হচ্ছে। তবে বর্তমানে বেফাক মহাপরিচালকের প্রত্যয়ন থাকলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন—তিন জায়গা থেকেই সনদ সত্যায়ন সহজে সম্পন্ন হচ্ছে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রায় ৫০ বছর আগে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসার একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করা বেফাক বর্তমানে এক বিশাল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে বেফাকের অধীনে সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার মাদ্রাসা রয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় ২০ হাজার মাদ্রাসা। প্রতিবছর ৭ থেকে ৮টি স্তরে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং প্রায় ৫৬ লাখ উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষার মাত্র আধা ঘণ্টা আগে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক প্রিন্ট করে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ফলে গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে শতভাগ প্রশ্নফাঁস ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং মাত্র ২২ থেকে ২৩ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া দূর-দূরান্তের মাদ্রাসাগুলোর ভোগান্তি কমাতে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও ফলাফল সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে একটি ৯ তলা ভবন কেনা হয়েছে, যেখানে শীঘ্রই ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’ চালু হতে যাচ্ছে।
এসএইচ/