রেজা হাসান ।।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকার সাহিত্য আসরগুলোতে যেসব তরুণ কবি ও ছড়াকার স্বনামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল তাদের একজন রকীবুল ইসলাম। তার জন্ম ১৯৭৮ সালের ২ অক্টোবর বরিশালের বানারীপাড়ার লবণসারা গ্রামে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
পারিবারিকভাবে তারা হাজী শরীয়তউল্লাহর বংশধর। তার পিতা আবুল হোসেন সিদ্বেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি একজন সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি। ছেলেবেলা থেকেই ছড়া ও কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল তার।
শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকে রকীবুল ইসলাম ঢাকার জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ায় তাহফিজুল কুরআন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু রিউমেটিক ফেভার বা বাতজ্বর তাকে বেশিদূর এগুতে দেয়নি। হিফজ শেষ না করেই তাকে চলে যেতে হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে মুসলিম বাজার মাদরাসা, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ও দারুর রাশাদ মাদরাসা হয়ে শিক্ষাজীবনের শেষ ধাপে আবারো ফিরে এসেছিলেন জামিয়া রাহমানিয়ার পবিত্র অঙ্গনে। কিন্তু মৃত্যু নামক অমোঘ নিয়তি তাকে বুখারি শরিফের শেষ হাদিসটি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করতে দেয়নি।
পৈতৃক সূত্রে ছড়া ও কবিতার হাতেখড়ি পাওয়া রকীবুল ইসলাম হিফজ অধ্যয়নকালেই ছড়া লিখতে শুরু করেন। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় কবি রকীবুল ইসলামের প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়।
শূন্য দশকের শুরুতে ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনে কবি রকীবুল একজন সুনামের অধিকারী তরুণ ছড়াকার হিসেবে খ্যতি লাভ করেন। তার সম্পর্কে সময়ের অন্যতম ছড়াকার ও কবি হাসান আলিম বলেন, “....ক্লাসে যেভাবে শিখিয়ে দিতাম ,পরবর্তী ক্লাসে সে সেভাবে চমৎকার ছড়া লিখে নিয়ে চলে আসতো।
এসব ছড়া কোনোটি হজ্জ, রমল ও মোতাকারেব ছন্দের। কেবল ছন্দের কারুকাজই নয়; ছড়ার ভাষা, চিত্রকল্প এবং বক্তব্যও ছিলো তীর্যক ও আকর্ষণীয়। (দৈনিক সংগ্রাম, ৩০ ডিসেম্বর ২০০৫)
রকীবুল ইসলাম ছিলেন মাদরাসার ছাত্র। তাই তার লেখায় ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ পেয়েছে। তার ছড়াগুলো বেশি বড় হতো না। অল্প কথায় তিনি পুরো বিষয় স্পষ্ট করে দিতে পারতেন। ছড়ায় নতুন অন্তমিল সৃষ্টিতে তার নজর ছিল বেশি।
আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের ওপরও তার দক্ষতা ছিল। তার ছড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল বলেছেন, ‘রকীব আমার ছড়ার বাত্তি। রকীব আমার ছড়ার বংশীয় রক্তের ভাই।’ (ছড়ার আসর, জানুয়ারি ২০০৬)
রকীবুল ইসলাম ছিলেন স্বাধীনচেতা এক কবি। তার ছড়া ও কবিতা ছিল অনেকটা সংস্কারমূলক। সমাজের দোষত্রুটিগুলো জাতির চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া ছিল তার কর্তব্য। একজন সুনাগরিক হিসেবে অসাম্য ও বৈষম্যকে তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাইতো জাতীয় অসমতা ও বৈষম্যগুলো তার কলমে ভাষা পেয়েছে সুনিপুণভাবে।
তার কবিতা অনেকটা আধ্যাত্মিক চেতনানির্ভর। তার কবিতায় সমসাময়িক প্রসঙ্গের পাশাপাশি দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোও প্রাধান্য পেয়েছে। ছন্দের সুনিপুণ গাঁথুনী তার কবিতাকে নদীর স্ররোতের মতো সাবলীল করে তুলেছে। আর তাইতো মানব-মানবীর প্রেম তার কলমে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
রকীবুল ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী। ডানপন্থি কি বামপন্থি সমস্ত সাহিত্য আসরে তিনি নিয়মিত যেতেন। টুপি পরা মাদরাসার ছেলেটি নির্ভয়ে নিঃসংকোচে চলে যেতেন বামের কোনো সাহিত্য আসরে। সত্য প্রকাশে তিনি ছিলেন নির্ভীক।
একবার নজরুল ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ১০০ জন সেরা ছড়াকার ও কবিকে আমন্ত্রণ করেছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে রকীবুল ইসলামও ছিলেন। তিনি সেদিন পাঠ করেছিলেন, ‘ওম শান্তি ওম/জীবে যদি এত দয়া/বানাও কেন বোম?’ তার অর্থবহ এ ছড়াটির সমালোচনা করতে গিয়ে কবি আল হাফিজ বলেন, ‘কেউ যদি ছড়া নিয়ে পিএইচডি করতে চায় সে এই তিন ছত্র দিয়ে পিএইচডি করতে পারবে।’
কবি রকীবুল ইসলাম রাহমানিয়া মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসে পড়ার সময় ২৬ ডিসেম্বর ২০০৫ রাত আড়াইটায় পরপারে পাড়ি জমান। যে অদম্য স্পৃহা নিয়ে মাদরাসায় এসেছিলেন তা পূরণ করে যেতে পারেননি তিনি। জীবনের রঙিন খোলস ছেড়ে সফেদ আলখেল্লা গায়ে জড়িয়ে শুরু করতে হলো পরপারের যাত্রা।
ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছড়া ও কবিতার আটটি পান্ডুলিপি রেখে গেছেন। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক বিভিন্ন পত্রিকায় তার ছড়া ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি তার জীবদ্দশায় কোনো প্রকাশিত গ্রন্থ দেখে যেতে পারেননি।
বাংলা সাহিত্যের ‘কিশোর কবি’ হিসেবে খ্যাত সুকান্ত ভট্টাচার্য একুশ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে রেখে যান অমর কীর্তি। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোই তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে।
কবি রকীবুল ইসলামের ‘গভীর গজল’ কাব্যগ্রন্থ ছাড়া পরবর্তী সময়ে আর কোনো গ্রন্থই প্রকাশিত হয়নি। বোদ্ধামহেেলর বিশ্বাস, তার সমস্ত পান্ডুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে তিনিও তরুণ কবি হিসেবে পৌঁছে যাবেন খ্যাতির চূড়ায়।
.
[লেখা ও লেখকের কথা নিয়ে প্রকাশিত সাময়িকী ‘লেখকপত্র’ এর জানুয়ারি-মার্চ: ২০২০ সংখ্যার সৌজন্যে]
আরএম/