বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬ ।। ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১১ জিলহজ ১৪৪৭


পরীক্ষার পূর্বে যে বিষয়গুলো আপনাকে জানতে হবে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

দরজায় কড়া নাড়ছে কওমি মাদরাসার বিভিন্ন জামাতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা। এবার কোভিড-১৯ এর কারণে শিক্ষাবর্ষের সময় কম হলেও কমেনি পরীক্ষার সিলেবাসের পরিমাণ। তাই অল্প সময়ে দীর্ঘ এ নেসাব থেকে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করার কলাকৌশল বিষয়ে অনলাইন সংবাদ মাধ্যম আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম আয়োজন করেছে পরীক্ষা বিষয়ক শিক্ষাপরামর্শ ‘পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি ও সেরা ফলাফলের কৌশল’। আজ থাকছে পর্ব-২

লিখছেন দারুল উলুম রামপুরা বনশ্রী মাদরাসার উস্তাযুল হাদিস, দারুল উলুম দেওবন্দের ফাজেল ‘মাসুম আবদুল্লাহ’


(গত পর্বের পর)
নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকুন
ভালো পড়াশোনা ও শ্রেষ্ঠ ফলাফলের মূল নিয়ামক—সবকে নিয়মিত উপস্থিত থাকা। প্রতিদিনের সবক প্রতিদিন ইয়াদ-তাকরার-মুজাকারা করা মানে কিতাবের প্রতিটি লাইন-পৃষ্ঠা-অধ্যায় ও বিষয় আয়ত্ত করে নেয়া। যার পরিণতি হলো—পরীক্ষার আগেই পরীক্ষার শতভাগ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। অল্প কিছু দিন বা নির্দিষ্ট সময় পড়া-শোনা করে পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা আর বছর জুড়ে বুঝে-শুনে রয়ে-সয়ে ধীর ধীরে প্রস্তুতি গ্রহণ করা কখনো-ই এক নয়।

তা-ছাড়া ক্লাসে ওস্তাদের মুখে শুনে পড়া যত সহজে বুঝে আসে ও মুখস্থ হয়—একা একা বা নোট-গাইড দেখে তা কখনো-ই হয় না। সচেতন কাউকে একথা যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে বুঝানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
তাই ভালো পড়াশোনা ও শ্রেষ্ঠা ফলাফলের জন্য ক্লাসের নিয়মিত উপস্থিতি ও ধারাবাহিক পড়াশোনার কোনো জুড়ি নেই।

ক্লাসে অনিয়মিত হওয়া ও অনুপস্থিত থাকার ক্ষতি
উল্লেখ্য—ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা একটি অলসতা ও আত্মিক ব্যাধি। যার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এর সূচনাটা মধুর ও সাধারণ হলেও পরিণতি খুবই তেতো ও সর্বগ্রাসী।
ক্লাসে অনিয়মিত হওয়া বা অনুপস্থিত থাকা একছন ছাত্রকে অনেক পিছিয়ে দেয়। ছাত্রদের ছাত্রজীবনের ছন্দ পতন ঘটায়। যা তার পড়া-শোনাকে জটিল ও দূবোর্ধ্য করে দেয়।

পড়াশোনার স্বাদ ও মজা নষ্ট করে দেয়। মনোবল ভেঙ্গে দেয়। নিজের প্রতি নিজের আস্থার হানী ঘটায়। প্রতিযোগিতার মনোভাব নষ্ট করে দেয়। এগিয়ে থাকার ও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ভুলিয়ে দেয়। সর্বপরি প্রতিভা ও যোগ্যতাকে মেরে ফেলে।

উপরন্তু কারো কারো বেলায় পড়া-শোনা থেকে ছিটকে পড়ারও কারণ হয়ে দাঁড়ায় এ অনুপস্থিতি। আজ নয় কাল করতে করতে অনেকে মাসকে মাস ক্লাসে উপস্থিত হয় না। এক পর্যায়ে ক্লাসে যেতে লজ্জার সৃষ্টি হয়। এ লজ্জা একসময় দীর্ঘ হতে হতে বছর/সেমিস্টার শেষ হয়ে যায় কিন্তু ক্লাসে আর যাওয়া হয়। যার ভয়াবহ ক্ষতি কম-বেশি সবারই জানা।

মনোযোগসহ পড়াশোনা করুন
যে-কোনো কাজে সফলতা লাভের আরেকটি মূলমন্ত্র হলো—একনিষ্ঠ মনোযোগ। মনোযোগই একজন মানুষকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে অল্পতে পৌঁছে দেয়। তাই ভালো ও সেরা ফলাকাক্সিক্ষদের আবশ্যক—মন দিয়ে পড়া-শোনা করা। মন দিয়ে পড়া-শোনার একটি মাপকাঠি হলো—পড়া অবস্থায় আশপাশের কোনো দিকে মনোযোগ না যাওয়া। সামনে-পিছে কী হচ্ছে? কে কী বলছে? সে দিকে মন না যাওয়া—এমন হলে বলা যায় মন দিয়ে পড়া হচ্ছে। অন্যথায় বলা যায় মনোযোগ ছাড়া পড়া হচ্ছে।

পড়া-শোনায় মনোযোগ সৃষ্টি করার সহজ উপায়
পড়াশোনায় মনোযাগ সৃষ্টি করতে করণীয় হলো—নির্জন পরিবেশে পড়ার চেষ্টা করা। কোলাহল মুক্ত পরিবেশ নির্বাচন করা। আলো-বাতাস ও স্বাস্থ্যসমম্মত পরিবেশ বেছে নেয়া। নিজের কিতাবের দিকে চেয়ে পড়া। প্রয়োজনে আঙ্গুল দিয়ে ধরে ধরে পড়া। কোনো ক্রমেই এদিক সেদিক না তাকানো।

বুঝে বুঝে পড়া। পড়ায় ডুবে যাওয়া। পড়ার পূর্বা-পড়ের দিকে পূর্ণ মনোযোগ রাখা। ধ্যানের সঙ্গে পড়া। একাজগুলোকে প্রথম প্রথম একটু কষ্টসাধ্য মনে হলেও একটু মুজাহাদা করলে পুরোই সম্ভব। ধারাবাহিকভাবে এভাবে মনোযোগ দিলে একপর্যায়ে তা অভ্যাসেও পরিনত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!

কেউ যদি এভাবে পড়াশোনা করে—তবে তার পড়াশোনা ও মুতালায় অভূতপূর্ণ বরকত হবে। অল্প সময়ে দ্বিগুণ পড়া হবে। অল্প মেহেনতে বেশি ফল পাওয়া যাবে। যার পরিণতি ও ফলাফল সবার কাছে সুস্পষ্ট।

নিয়মানুবর্তিতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা সফলতার রাজপথ
নেযামুল আওকাত ও রুটিন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেও পড়া-শোনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে ইনশাআল্লাহ! অনেক ছাত্র ভাইয়েরা ‘ইনতেশারে মুতায়ালা’র শিকার। কখন কী পড়বে? কতক্ষণ পড়বে? কীভাবে পড়বে? কোন্ কিতাব আগে পড়বে? কোন্টা পরে পড়বে? তারা এসব ব্যাপারে চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। এমন ছাত্রভাইদের উচিত—মুশফিক (দয়াবান) ও ইস্তেতাদওয়ালা (যোগ্য) একজন ওস্তাদের শরণাপন্ন হওয়া। তার পরামর্শক্রমে একটি নেযামুল আওকাত ও সময়ের রুটিন করে নেয়া।

এ রুটিনকে যথাসাধ্য রক্ষা করে চলার চেষ্টা করা। কিতাবভিত্তিকও রুটিন করা যায়। সময়ভিত্তিকও করা যায়। এ রুটিনে ২৪ ঘণ্টা সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভাগ করবে। যেখানে খাওয়া-দাওয়া, ওযু-গোসল, ইস্তেন্জা-জরুরত, তেলায়াত-খেদমত ও প্রত্যেক কিতাব পড়ার পৃথক পৃথক সময় বণ্টন করা থাকবে। যাতে পুরো সময়ের পূর্ণ হেফাযত করা যায় এবং এতটুকু সময় নষ্ট না হয়। সেই সঙ্গে কোনো কিতাব পড়া থেকেও বাদ না পড়ে। কোনো কিতাবে পাকাপোক্ত প্রস্তুতি নেয়া থেকে বাদ রয়ে না যায়। কোনো কিতাবই কাঁচা না থাকে। বরং সকল কিতাবে যেনো সমান প্রস্তুতি নেয়া হয়।

এভাবে প্রস্তুতি নিলে সকল কিতাবের নম্বর কাছাকাছি থাকবে। যা ভালো পরীক্ষার মানে উত্তীর্ণ। যার থেকে ভালো ও কাক্সিক্ষত ফলাফল করার ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা রাখা যায়।

দক্ষ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করুন
পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির হালচাল জানানোর জন্যে কোনো মুশফিক ও ইস্তেদাদওয়ালা ওস্তদাদের মুখামুখি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এমন কোনো দক্ষ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থেকে পড়াশোনা করা। পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। তত্ত্বাবধায়ককে প্রতিনিয়ত নিজের সকল সমস্যা ও নিজের সার্বক্ষণিক হালাত, পড়াশোনার পরিস্থিতি-অবস্থা, উন্নতি-অবনতি সব জানাবে। সকল বিষয়ের ও কিতাবের কিছু প্রশ্নের উত্তর লিখে সে ওস্তাদকে দেখাবে।

তিনি বিষয়বস্তু ও তথ্যগত ভুলভ্রান্তি, বানান ও শব্দপ্রয়োগগত ত্রুটি-বিচ্যুতি, দাড়ি-কমা-ক্লোন-সেমিক্লোন ইত্যাদির সঠিক প্রয়োগ এবং লেখার গতি-রীতি ও উপস্থাপন শৈলীসহ সকল বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন। যে ভুল তিনি একবার ধরিয়ে দেবেন—সে ভুল যেনো আর না হয়, সে দিকে পূর্ণ খেয়াল রাখবে। এভাবে কিছুদিন পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলে আশা করা যায় নিজের যোগ্যতার ঝালাই হবে। যোগ্যতার ভিত মজবুত হবে ও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা যাবে ইনশাআল্লাহ। এক্ষেত্রে পূর্ণ ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগুতে হবে। তবেই আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে।

পুরো কিতাব অবশ্যই পড়বেন
প্রত্যেকটি কিতাবের আদ্যোপান্ত মুখস্থ ও ঠুটস্থ করবেন। কাফিয়া ও তার নিচের জামাতের ছাত্র ভাইয়েরা দরসের প্রত্যেকটি কিতাবকে সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে ছয়বার শেষ করবেন। আর তার ওপরের জামাতের ছাত্র ভাইয়েরা তিন থেকে চারবার শেষ করবেন। পড়ার সময় যে বিষয়গুলো কঠিন বা পরীক্ষায় আসতে পারে বলে মনে হয়—সে সব বিষয়গুলোকে লিখে নেবেন বা সাথীদের সঙ্গে মুজাকারা করবেন। যে-কোনো কিতাব শেষ হলে পুরো কিতাবের কোথায় কী আছে? একবার আপন যেহেনে ঘুড়াবে বা কোনো সাথীকে সংক্ষেপে শাজারা ও নকশা আকারে শুনিয়ে নেবে।

পঠিত অংশের হেন্ডনোট তৈরি করে অনুশীলন করুন
প্রয়োজনে বিষয়ভিক্তি বা কিতাবভিক্তিক হেন্ডনোট তৈরি করে নেবেন। মূল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করে নেবেন। পরীক্ষায় আসতে পারে এমন আলোচনাগুলো লিখে তত্ত্বাবধায়ক ওস্তাদকে দেখাবেন। এক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর প্রশ্নের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। এসব প্রশ্ন থেকে প্রশ্নের ধরণও অনুমান হয়। তাই সময়-সুযোগে বিগত বছরগুলোর প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা দেখার অভ্যাস করবে। প্রশ্নের ধরন ও তার উত্তরের ধরন হাতে-কলমে রপ্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। (চলবে)

নিয়মিত এ আয়োজনের বাকি পর্বের লেখাগুলো আমাদের  ‘শিক্ষাঙ্গন’ ক্যাটাগড়িতে পাবেন।

-কেএল


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ