বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


অনৈতিক কর্মকাণ্ড বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সে অপরাধেই কেন ফাঁসছেন তারকারা?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

গত কয়েকদিনে বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনে তারকা খ্যাতি পাওয়া বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও পর্নোগ্রাফিসহ নানা অভিযোগ করেছেন আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর সদস্যরা। এই তালিকায় আছেন নায়িকা পরীমনি, প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ, মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, মরিয়ম আক্তার মৌ ও নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর।

‘এছাড়াও আরও এক ডজন মডেল নজরদারিতে রয়েছেন। এতে আতঙ্কে অন্তত ২১ প্রভাবশালী ব্যক্তির ‘ঘুম হারাম’ হওয়ার অবস্থা’ । হুবহু এমন শিরোনামেই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখা গেছে দেশের প্রথম সারির একটি সংবাদমাধ্যমকে।

গত কয়েকদিনে আটক অভিনেত্রী ও মডেলরা  জিজ্ঞাসাবাদে স্বর্ণ চোরাচালান, ব্ল্যাকমেইলিং, মাদক ব্যবসা, জাল মুদ্রা তৈরি, অস্ত্র কারবারে সম্পৃক্ততাসহ নানা অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়েছেন সরকার। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মাদকসহ নানা অনৈতিক কাজের বিরোধী প্রচারণাতেও সোচ্চার হতে দেখা যায় তারকাদের। এদিকে কিছুদিন পর পর সংবাদমাধ্যমে আসে এই মডেল-অভিনেত্রীদের বড় একটি অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার খবর।

‘সরকারের এমন উদ্যোগ স্বস্তিদায়ক’

বিষয়টি কীভাবে দেখছেন, এতে দেশের ইমেজে প্রভাব পড়ছে কতটা? - এমন প্রশ্নে জাগ্রত কবি মাওলানা মুহিব খান বলছেন, ‘বাংলাদেশের  জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশই যুব সমাজ। মাদক এবং অশ্লীলতা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের যুব সমাজের চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে তরুণরা নানা ধরনের ভুল মেসেজ পাচ্ছেন। শোবিজ অঙ্গনের লোকজনের কাছ থেকেও যুবকদের কাছে ভুল বার্তা কম আসে না; তাদের মধ্যে যাদের জীবনধারা সন্দেহজনক অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সরকারের এমন উদ্যোগ আপাতত স্বস্তিদায়ক। কিছু মানুষকে গ্রেফতারের মাধ্যমে বাকিরা হয়তোবা ঠিক হয়ে যাবেন বলছেন কবি মুহিব খান।

বর্তমানে চালানো এই অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়ে কবি মুহিব খান প্রশ্ন তুলছেন; যুবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অপতৎপরতাগুলো বন্ধে এতদিন অভিযান দেখা যায়নি কেন? এজন্য দায়িত্বশীল মহলের কর্তাদেরও প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

‘দেশপ্রেমী, সচেতন, ধর্মপরায়ণ নাগরিক মাত্রই জানেন, এরা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেন’

মাদকসহ নানা অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে দেখা যায় শোবিজ অঙ্গনের মানুষদের- তারাই আবার ফেঁসে যাচ্ছেন এসব-কাণ্ডে এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কবি মুহিব খান বলছেন,  দেশপ্রেমী, সচেতন, ধর্মপরায়ণ নাগরিক মাত্রই জানেন, এরা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিছু ফাঁপা বুলি আওড়ান।

তার ভাষায়, তারকারা মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে থাকেন এজন্য তারা মাদক থেকে দূরে থাকবেন; এটা কমন চিন্তা-ধারা; কিন্তু এটা বাস্তবতা নয়। সচেতন মানুষ মাত্রই তা উপলব্ধি করেন এবং তারা এসব কর্মকাণ্ডে অবাক হননি।

কবি মুহিব খানের ভাষায়, জাতীয় পুরস্কার পাওয়া তারকাদের অনেকেই এমন চরিত্রে অভিনয় করছে যাকে কোনভাবেই শালীন বলা যায় না। এমন মানুষেরা  বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে প্রচারণা চালাতে পারেন, এদের থেকে এর বেশি কিছু আশা করা যায় না।

‘যারা সেলিব্রেটি হওয়ার যোগ্য না তাদেরও সেলিব্রেটি হিসেবে উপস্থাপনে তোড়জোড়ের কমতি নেই’

তিনি আরও যুক্ত করেন, বর্তমান সময়ে মিডিয়াগুলোতে এমন লোকদের সেলিব্রেটি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় যারা আসলে সেলিব্রিটি হওয়ার যোগ্য নয়। প্রসঙ্গ হিসেবে তিনি বলছেন, সানাই মাহমুদকে নিয়ে দেশের মূলধারার মিডিয়াগুলোতে এক সময় ব্যাপক চর্চা ছিল, তাকে জাতীয় সেলিব্রিটি বানাতে কোন ধরণের কসরতের কমতি ছিল না।

তিনি প্রশ্নের ভঙ্গিতে প্রতিবেদককে বলেছেন; তবে সানাই শোবিজ অঙ্গন ছেড়ে ধর্ম-কর্মের পথে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর এ সংবাদটি মূলধারার মিডিয়ায় কি প্রচার হয়েছে?... প্রচার করা হয়নি।

‘যাকে নিয়ে এতোদিন মিডিয়াপাড়ায় হইচই ছিল, সেলিব্রিটি বানানোর আয়োজন ছিল, সে মানুষটির শোবিজ ছাড়ার ঘোষণায় তাকে নিয়ে এক মিনিটের প্রচারণাও কি হতে পারতো না মিডিয়ায়? আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলোতে কাদের সেলিব্রিটি বানানোর চেষ্টা চালানো হয়; এ বিষয়টি এখান থেকে উপলব্ধি করে নেয়া যায়- বলছিলেন মুহিব খান।

‘একই প্রশাসনের দুই নীতি কখনোই কার্যকর হয় না’

এদিকে আবৃত্তিশিল্পী ও টিভি উপস্থাপক শাহ ইফতেখার তারিক মনে করেন সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে যে নীতি ঘোষণা করেছে তা মিথ্যা। তার ভাষায়, মাদক চাই তা ওয়াইন হোক গাজা বা ফেনসিডিল। সবগুলোই নিষিদ্ধ এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকার ওয়াইন ও বারের অনুমোদন দিচ্ছে, আবার গাজা নিষিদ্ধ করছে। তাহলে এখানে জিরো টলারেন্স নীতি কোথায়? প্রশ্ন করেন তিনি।

তিনি বলছেন, একই প্রশাসনের দুই নীতি হলে তা কখনো কার্যকর হয় না।

‘শুধু আইন দিয়ে একটা সমাজ রক্ষা করা সম্ভব হয় না’

তিনি আরো যোগ করেন, শুধু আইন দিয়ে একটা সমাজ রক্ষা করা সম্ভব হয় না। যারা আইনের সাথে জড়িত আছে তাদের অনেকেই মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধকাণ্ডে জড়িত- এমন খবরও পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়ে। যেই সমাজে দায়িত্বশীলদের এই অবস্থা এবং টাকা দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব, সেখানে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা দূরহ ব্যাপার’।

তিনি আরও বলছেন, ‘বর্তমানে প্রচার মাধ্যমগুলোতে এমন মানুষদের সেলিব্রিটি বানানোর চেষ্টা করা হয় যাদের মাঝে তেমন কোয়ালিটি নেই। যে নৈতিক আদর্শ থাকলে একজন মানুষকে সেলিব্রিটি মনে করা যায় তাদের মাঝে এমন কিছুই নেই। এসব অঙ্গনের লোকজন রং দেওয়া পুতুলের মত; উপরে দেখতে অনেক সুন্দর; তবে ভিতরে ফাঁপা, প্রাণ বলতে কিছুই নেই।

‘মিডিয়ার প্রচরণায় মানুষ প্রতারণার শিকার’

শাহ ইফতেখার তারিকের ভাষায়, মিডিয়া মানুষের চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে বিস্তর প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বস্তুবাদী সেক্যুলারপন্থীদের হাতে মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণের  কারণে তারা যেভাবে যাকে চাচ্ছে তারকা বানাচ্ছে, সাধারণ মানুষ তা গিলছে। বর্তমানে মিডিয়া থেকে গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্ক, চিন্তা-চেতনা এক ধরনের প্রতারণার শিকার বলছেন তিনি।

এর পরিশুদ্ধির জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় সবারই সদিচ্ছা ও একান্ত প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এনটি


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ