বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


পর-পর মহামারির হানা বরগুনায়, ডেঙ্গুর পর এবার হাম-ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

একের পর এক সংক্রামক ব্যাধিতে বিপর্যস্ত উপকূলীয় জেলা বরগুনা। গত বছরের রেকর্ড ভাঙা ডেঙ্গু সংক্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার হাম ও ডায়রিয়ার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হামের অস্বাভাবিক চরিত্র এবং ডায়রিয়ার ঊর্ধ্বমুখী চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে জনস্বাস্থ্য । চিকিৎসকরা বলছেন, পুষ্টিহীনতা, জলবায়ুর প্রভাব ও অসচেতনতার কারণে এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও প্রকৃত কারণ জানতে নতুন করে গভীর গবেষণার দাবি তুলেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।

হামের উদ্বেগজনক চিত্র—

বিশ্বস্বাস্থ্য-সংস্থার তথ্যমতে, দেশে হামের সংক্রমণের হার যেখানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে বরগুনায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা খুবই আশঙ্কাজনক।

বরগুনা জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৩৮ জন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই শতাধিকেরও বেশি শিশু। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫ শিশুর। জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বরগুনা সদর উপজেলায় হামের টিকা প্রদান করা হয়েছে—প্রায় ২২ হাজার শিশুকে।

সরেজমিনে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে—৪০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বাধ্য হয়ে মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। অনেক শিশুর মায়েরা ক্লান্ত হয়ে মেঝেতেই শুয়ে আছেন। প্রথমে জ্বর, পরে সর্দি, কাশি, নিউমুনিয়া, চোখ ওঠা ও শরীরে র্যাশ জটিলতা নিয়ে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে নবজাতক থেকে শুরু করে রয়েছে বয়স্কও। অথচ হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং পরের ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে।

অধিকাংশ রোগীর স্বজনরা জানান, টিকার বয়স হওয়ার আগেই দেখা দিয়েছে হামের উপসর্গ। আবার অনেকে বয়স হলেও গ্রহণ করেননি হামের টিকা। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হাম সন্দেহে ১৫ জন শিশু ভর্তি থাকলেও হাম নিশ্চিতে নয় কোনো শিশুর পরিবারই।

গত ৫ দিন আগে হামের উপসর্গ নিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সাত মাস বয়সী শিশু রমজান। রমজানের নানি—কুলসুম বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে হাম নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্যাম্পল কালেকশন করে ঢাকা পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত ফলাফল পায়নি। এদিকে আমার নাতি অনেকটাই সুস্থ।’

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. শায়লা আক্তার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যত রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই হামের টিকা নেননি। আবার অনেকেই টিকা নেওয়া থাকলেও আক্রান্ত হচ্ছেন। এটির একটি কারণ, আমাদের মনে হচ্ছে, বাচ্চাদের হার্ড ইউমুমিটি অর্জন হয়নি। আমাদের এখানে যত শিশু ভর্তি হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।

ডায়রিয়ার প্রকোপ ও শয্যা সংকট

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলায় মোট ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিনহাজার। গত একমাসে প্রায় এক হাজার ৫০০ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, যা চলতি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া গত এক সপ্তাহেই ৪৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুধু ২৪ ঘণ্টায়ই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৮৩ জন।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডটিতে ৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় মেঝেতে বিছানা পেতে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। নারী ও পুরুষ রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জনতাকে।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সরকারিভাবে স্যালাইন মিললেও অধিকাংশ ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। পাশাপাশি নোংরা পরিবেশের কারণে সুস্থ হতে এসে উল্টো অসুস্থ হয়ে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

সুজন মিয়া নামের এক রোগী জানান—‘আমার হঠাৎ করেই পেটে সমস্যা দেখা দিলে, হাসপাতালে ভর্তি হই। এখানে চিকিৎসা সেবা পেতে এসে উল্টো আরও মনে হয় অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এক জায়গায় গাদাগাদি করে মেঝেতে সবাইকে ভর্তি করা হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশও বেশ নোংরা।

এ বিষয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হামের প্রকোপের মধ্যে এখন আবার ডায়রিয়া রোগীর চাপ বেড়েছে। এজন্য আমরা আলাদা একটি ডায়রিয়া বিভাগ তৈরি করেছি। এছাড়া ভর্তির রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত স্যালাইন রয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লেও আমাদের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা নিরলসভাবে সেবা প্রদান করছেন।

গত বছরের ডেঙ্গুর ভয়াবহতা—

জেলা স্বাস্থ্যবিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে মারা যান অর্ধশতাধিক মানুষ। সেই সময় ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করায় বরগুনাকে হটস্পট ঘোষণা করে স্বাস্থ্য বিভাগ।

গত বছর ডেঙ্গুতে পরিবারের ৫ সদস্যসহ নিজে আক্রান্ত হয়েছিলেন বরগুনা উপ-শহরের লাকুরতলা এলাকার আব্দুল আলিম। আক্রান্ত হয়ে আইসিইউ পর্যন্ত যেতে হয়েছিল তাকে। ডেঙ্গু নিয়ে আব্দুল আলীম জানান, ‘আমার বাড়ি শহরের খুব কাছে হলেও এটি ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। এখানে সরকারিভাবে মশকনিধনসহ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি ৷ ফলে আমার এই এলাকার প্রায় ৯০ ভাগ বাড়ির মানুষই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন বরগুনায় ডেঙ্গুর রেড জোন করা হয়, তারপরে বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকে মশকনিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

একের পর এক সংক্রামক ব্যাধিতে কেন আক্রান্ত হচ্ছে বরগুনা—এ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন জানিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ বলেন, হাসপাতালে নয় মাসের নিচের শিশুরাই বেশি হাম সন্দেহে ভর্তি হচ্ছে। অথচ নয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাদের হাম আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার এই অঞ্চলে গতবছর ডেঙ্গুতেও ব্যাপক মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এছাড়া এ বছর ডায়রিয়ার প্রকোপও দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, এটি জলবায়ু ও পুষ্টিহীনতার প্রভাবে হতে পারে। এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণার প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে বেশি। গত বছর ডেঙ্গুর সময় মশার জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমরা আমাদের টিকা কেন্দ্রগুলোতে ৯ থেকে ১৫ মাসের শিশুদের হামের টিকা দিয়ে থাকি। কিন্তু এ বছর ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা যেমন হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, আবার প্রাপ্তবয়স্করাও একই উপসর্গ নিয়ে আসছেন। এসব বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব একটি গবেষণার মাধ্যমে। আমরা ইতোমধ্যেই আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ