বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮


বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি মোকাবিলায় ভারসাম্যপূর্ণ ফতোয়ার ওপর গুরুত্বারোপ মুফতি তাকী উসমানীর

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিশেষ সেমিনারে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি মোকাবিলায় ফতোয়ার ভূমিকা ও আলেমদের দায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহ শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী।

সম্প্রতি আয়োজিত সেমিনারে তিনি ‘أثر الفتوى في مواجهة الانحرافات الفكرية’ (বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতির মোকাবিলায় ফতোয়ার ভূমিকা) শিরোনামে বক্তব্য দেন।

মুফতি তাকী উসমানী বলেন, বিচ্যুতি হলো সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথ থেকে সরে যাওয়া। কুরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের সঠিক বুঝের ভিত্তিতে যে পথ প্রতিষ্ঠিত, সেটিই সরল পথ। এ পথ থেকে কোনো ব্যক্তি বা চিন্তাধারা সরে গেলে তা বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের আবির্ভাব ঘটেছে। খারিজি, মুতাজিলা ও জাহমিয়াসহ বিভিন্ন মতবাদ একসময় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করলেও পরবর্তী সময়ে তা অনেকাংশে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমান যুগের ভ্রান্ত চিন্তাধারাও যতই বিস্তৃত হোক, সত্য ও হকের প্রচেষ্টার মাধ্যমে একসময় তা দূর হয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বর্তমান যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতিকে মূলত দুই ধরনের বলে উল্লেখ করেন মুফতি তাকী উসমানী। এর একটি হলো গুলু বা চরমপন্থা। অপরটি হলো কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

তিনি বলেন, অপর্যাপ্ত জ্ঞান নিয়ে কুরআন-সুন্নাহর ভুল ব্যাখ্যা করে কাউকে তাকফির, তাবদিয় ও তাদলিলের দিকে নিয়ে যাওয়া চরমপন্থার অন্তর্ভুক্ত। কোনো কোনো চরমপন্থী মুসলিম শাসকদের কাফির বা মুরতাদ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকে ‘জিহাদ’ হিসেবে প্রচার করেছে। অথচ এটি কুরআন-সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা নয়; বরং দলিলের ভুল ব্যাখ্যার ফল।

অন্যদিকে পশ্চিমা দর্শন ও চিন্তাধারাকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নিয়ে কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্যকে নিজেদের পছন্দ ও আধুনিক মতবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টাকেও তিনি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি হিসেবে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ একদিকে অতিরঞ্জন ও চরমপন্থা, অন্যদিকে নসের প্রতি অবাধ্যতা ও অতিরিক্ত শিথিলতা—উভয় দিক থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মুফতি তাকী উসমানী বলেন, আলেমদের দায়িত্ব হলো কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী দলিলের মাধ্যমে ভ্রান্ত চিন্তাধারার মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে এসব বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্মও তা সহজে বুঝতে ও গ্রহণ করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের বিশেষ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হারামাইন শরিফাইনের ভূমি হিসেবে দেশটির ওপর এ দায়িত্ব আরও বেশি। তিনি বিশেষভাবে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসা করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সালাফে সালেহীনের মানহাজ অনুযায়ী কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা দিয়ে এমন বহু আলেম তৈরি করেছে, যারা চরমপন্থা ও অতিরিক্ত শিথিলতা—উভয় পথ থেকে দূরে রয়েছেন।

বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি মোকাবিলায় ফতোয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মুফতি তাকী উসমানী। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের হাইআতু কিবারিল উলামা, আল-লাজনাতুদ দায়িমাহ, রাবিতাতুল আলামিল ইসলামির মাজমাউল ফিকহ এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।

তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান গভীর গবেষণা ও ভারসাম্যপূর্ণ ফতোয়ার মাধ্যমে সমকালীন বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিয়েছে এবং চরমপন্থা ও অতিরিক্ত শিথিলতার বিরুদ্ধে কার্যকর জবাব দিয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বহু আলেম ভ্রান্ত চিন্তাধারার বিরুদ্ধে কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, উম্মাহ কখনোই জ্ঞানী ও ভারসাম্যপূর্ণ আলেমদের থেকে বঞ্চিত হবে না।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে ফিকহি মাজহাব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মুফতি তাকী উসমানী বলেন, স্বীকৃত সব ফিকহি মাজহাবই সম্মানযোগ্য। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও ফিকহি বিষয়ে মতভেদ ছিল। তবে সেই মতভেদের কারণে তারা পরস্পরকে বর্জন করেননি।

তিনি বলেন, মাজহাব কোনো আলাদা দ্বীন নয়; বরং ইসলামি শরিয়তের ফিকহি ব্যাখ্যার বিভিন্ন পদ্ধতি। তাই সব মাজহাব ও তাদের অনুসারীদের সম্মান করা উচিত। ফিকহি মতভেদকে মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদ ও দূরত্বের কারণ হতে দেওয়া উচিত নয়।

[মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ অনূদিত টেক্সট থেকে নিউজটি প্রস্তুত করা হয়েছে]

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ