শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ।। ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্জাগরণে গড়ে উঠতে পারে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র: ড. খালিদ হোসেন রূপপুরে দ্বিতীয় ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু মক্কায় ড্রোন ধ্বংসের দাবি, সৌদিকে মিথ্যাচারের অভিযোগ হুথিদের  তুরস্কের ক্যাপাডোসিয়ায় পাহাড়ধসে ৩ জনের মৃত্যু সফরসঙ্গীদের নিয়েই দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী: আতিকুর রহমান রুমন  যাত্রাবাড়ীতে লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘এলভান্ট’-এর নতুন আউটলেট উদ্বোধন  জুমার জামাতে ঐক্য, সমাজে বিভেদের দেয়াল জুমার আজানের পর বেচাকেনার বিধান কী? মাওলানা আরশাদ মাদানীর স্বাস্থ্য নিয়ে ‘উদ্বেগের কারণ নেই’ বিনামূল্যে আস-সুন্নাহর মোবাইল ও মোটরসাইকেল সার্ভিসিং সেবা পেয়েছেন ৩৩০০ জন

জুমার আজানের পর বেচাকেনার বিধান কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

জুমার প্রথম আজান হওয়ার পর বেচাকেনা বন্ধ করে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া ওয়াজিব। এ সময় বেচাকেনায় লিপ্ত হওয়া মাকরূহে তাহরিমি। তবে এ অবস্থায় সম্পন্ন হওয়া বেচাকেনা বাতিল হয় না; বরং তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সহিহ হলেও গুনাহের কাজ।

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। তাই জুমার নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া, মসজিদে উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহর স্মরণে মনোনিবেশ করার জন্য পবিত্র কোরআনে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনার অংশ হিসেবেই জুমার আজানের পর বেচাকেনা ছেড়ে দেওয়ার আদেশ এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জুমার কোন আজান থেকে বেচাকেনা বন্ধ করা ওয়াজিব? প্রথম আজানের পর বেচাকেনা করলে তা কি নাজায়েজ হবে? আর এ সময় কেউ বেচাকেনা করে ফেললে সেই লেনদেন কি বাতিল হয়ে যাবে?

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সূরা আল-জুমুআহ, আয়াত: ৯)

প্রথম আজান থেকেই বেচাকেনা বন্ধের বিধান

এ বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে আজানের সময় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, জুমার সময় হওয়ার পর যে প্রথম আজান দেওয়া হয়, তা থেকেই বেচাকেনা বন্ধ করা ওয়াজিব। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যবস্থায় জুমার খুতবার আগের প্রথম আজান থেকেই এ বিধান কার্যকর হবে।

যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর যুগে খুতবার সময় মিম্বরের সামনে একটি আজান দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উসমান (রা.) মানুষের সুবিধার্থে আরও একটি আজানের প্রচলন করেন। এ কারণে কোন আজানকে প্রথম আজান বলা হবে, তা নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত হলো, সময়ের বিবেচনায় জোহরের ওয়াক্ত হওয়ার পর মিনার থেকে যে আজান দেওয়া হয়, সেটিই এ বিধানের ক্ষেত্রে প্রথম আজান।

এ প্রসঙ্গে হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-জাওহারাতুন নায়্যিরাহ-তে বলা হয়েছে, 

قوله: وإذا أذن المؤذن يوم الجمعة الأذان الأول ترك الناس البيع والشراء وتوجهوا إلى الجمعة

অর্থাৎ, জুমার দিন মুয়াজ্জিন প্রথম আজান দিলে মানুষ বেচাকেনা ছেড়ে জুমার নামাজের দিকে অগ্রসর হবে।

গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে, শুধু বেচাকেনাই নয়; বরং যেসব কাজ মানুষকে জুমার নামাজের প্রস্তুতি ও মসজিদে যাওয়ার কাজ থেকে বিরত রাখে, সেগুলোও এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। (আল-জাওহারাতুন নায়্যিরাহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৯২)

একই বিষয়ে রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে—

(ووجب سعي إليها وترك البيع) ولو مع السعي، في المسجد أعظم وزراً (بالأذان الأول) في الأصح

অর্থাৎ, জুমার নামাজের জন্য অগ্রসর হওয়া এবং বেচাকেনা ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, প্রথম আজান থেকেই এ বিধান কার্যকর হবে। এমনকি মসজিদের ভেতরে বেচাকেনা করলে গুনাহ আরও বেশি হবে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৬১)

এখানে বেচাকেনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলেও এর দ্বারা এমন সব কাজ উদ্দেশ্য, যা জুমার নামাজের জন্য অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। তাই প্রথম আজানের পর ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাকাটা কিংবা অন্য কোনো ব্যস্ততায় এমনভাবে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়, যা জুমার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটায়।

এ সময়ের বেচাকেনা কি বাতিল হয়ে যাবে?

প্রথম আজানের পর বেচাকেনা করা নিষিদ্ধ হলেও এ সময় সম্পন্ন হওয়া বেচাকেনা বাতিল হয়ে যায় না। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, এ ধরনের বেচাকেনা সহিহ বা কার্যকর হয়; তবে তা মাকরূহে তাহরিমি এবং এতে লিপ্ত হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুনাহগার হবেন।

এর কারণ হলো, এখানে নিষেধাজ্ঞাটি বেচাকেনার মূল চুক্তি বা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। জুমার নামাজের জন্য অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ অমান্য করার কারণে এ নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এ জন্য বেচাকেনাটি কার্যকর হলেও তা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ও গুনাহের কাজ।

রদ্দুল মুহতার-এর অন্য একটি স্থানে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, 

(وكره) تحريماً منع الصحة (البيع عند الأذان الأول)

অর্থাৎ, প্রথম আজানের সময় বেচাকেনা করা মাকরূহে তাহরিমি; তবে তা বেচাকেনার বৈধতাকে নষ্ট করে না। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১০১)

এমন বেচাকেনা প্রত্যাহার করা কি জরুরি?

এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের মাকরূহে তাহরিমি বেচাকেনা প্রত্যাহার করার বিষয়েও ফিকহবিদদের বক্তব্য রয়েছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য ফিকহি সূত্রে গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার জন্য উভয় পক্ষের ওপর এ লেনদেন প্রত্যাহার করা আবশ্যক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে, 

اعلم أن فسخ المكروه واجب على كل واحد منهما أيضا بحر وغيره لرفع الإثم مجمع

অর্থাৎ, গুনাহ দূর করার জন্য এ ধরনের মাকরূহ বেচাকেনা প্রত্যাহার করা উভয় পক্ষের জন্যও ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১০৫)

তবে এ বিষয়ে ফিকহি আলোচনায় ভিন্ন বক্তব্যও রয়েছে। তাই বিষয়টিকে লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। মূল কথা হলো, প্রথম আজানের পর বেচাকেনায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা এবং এমন লেনদেন হয়ে গেলে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী তা প্রত্যাহারের বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত।

পরিশেষে, জুমার দিন প্রথম আজান হওয়ার পর মুসলমানের কর্তব্য হলো সব ধরনের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা ছেড়ে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া এবং মসজিদের দিকে অগ্রসর হওয়া। সামান্য দুনিয়াবি লাভের আশায় আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও বিক্রেতা—সবারই উচিত জুমার প্রথম আজান থেকেই বেচাকেনা বন্ধ রাখা এবং জুমার নামাজের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ