সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে একে একে তারা জ্বলতে শুরু করেছে। উঠোনে মাদুর পেতে দাদা বসেছেন। নাতি-নাতনিরা গোল হয়ে তাঁর চারপাশে বসেছে। একজন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদা, মানুষ যখন ইসলাম গ্রহণ করল, তখন কি সবাই খুশি হয়েছিল?
দাদা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। না রে সোনা, সত্যকে সবাই সহজে গ্রহণ করে না। আজ আমি তোমাদের এমন কিছু সাহসী মানুষের গল্প শোনাব, যারা ভয়ংকর কষ্ট সহ্য করেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থেকে একচুলও সরে যাননি।
দাদা বলতে শুরু করলেন...
মক্কার আকাশ যেন দিন দিন আরও ভারী হয়ে উঠছিল। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকছিলেন। কুরাইশ নেতারা বুঝতে পেরেছিল, এই দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লে তাদের অন্যায়, অহংকার আর মূর্তিপূজার সমাজব্যবস্থা টিকে থাকবে না। তাই তারা সত্যের জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, নির্যাতন দিয়ে দিতে শুরু করল। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন দরিদ্র, দাস বা সমাজের দুর্বল মানুষ। কুরাইশ নেতারা তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাতে শুরু করল। তাদের কাউকে প্রখর রোদের নিচে উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হতো, বুকে ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়া হতো, দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা হতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাদের মুখে তখনও উচ্চারিত হতো— "আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।"
দাদা একটু থামলেন। তারপর বললেন,তোমরা কি বিলাল (রা.)-এর নাম শুনেছ?
নাতিরা একসঙ্গে বলল, হ্যাঁ দাদা, শুনেছি!
দাদা বললেন, বিলাল (রা.) ছিলেন একজন দাস। তাঁর মালিক তাঁকে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে বুকের ওপর বিশাল পাথর চাপিয়ে দিত। বলত, "মুহাম্মদকে অস্বীকার করো!"
বিলাল (রা.) কষ্টে কাঁপলেও শুধু বলতেন, "আহাদ... আহাদ... অর্থাৎ "তিনি এক... তিনি এক..."
দাদা বললেন, দেখো, শরীর দুর্বল হতে পারে, কিন্তু ঈমান যদি শক্ত হয়, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে হারাতে পারে না।
এরপর দাদা আরেকটি পরিবারের গল্প শোনালেন।
হযরত ইয়াসির (রা.), তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া (রা.) এবং ছেলে আম্মার (রা.)— পুরো পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের ওপরও ভয়াবহ নির্যাতন করা হতো। একদিন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের কষ্ট দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল। তিনি বললেন, "হে ইয়াসিরের পরিবার! ধৈর্য ধারণ করো। তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান জান্নাত।" এই কথা শুনে তারা নতুন শক্তি পেলেন। শেষ পর্যন্ত সুমাইয়া (রা.) ইসলামের প্রথম শহীদ হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন।
শুধুমাত্র সাধারণ মুসলিমরাই নয়, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও প্রতিদিন অপমান সহ্য করতেন। কেউ তাঁকে পাগল বলত, কেউ জাদুকর, কেউ কবি। তিনি যখন কাবার পাশে নামাজ পড়তেন, তখন তাঁর ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেওয়া হতো।
নাতনিদের একজন অবাক হয়ে বলল, দাদা! তখন কি নবীজি রাগ করতেন না?
দাদা মমতা ভরা কণ্ঠে বললেন, না সোনা। তিনি প্রতিশোধ নেননি। বরং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন—'হে আল্লাহ! এদের হেদায়াত দান করুন।'
দাদা আবার বললেন, কুরাইশ নেতারা ভেবেছিল, অত্যাচার করলে মুসলমানরা ইসলাম ছেড়ে দেবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টোটা। যত কষ্ট বাড়ল, তাদের ঈমান তত মজবুত হলো।
আল্লাহ তাআলা তখন আয়াত নাজিল করলেন— "মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?"— সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২
এই আয়াত মুসলমানদের নতুন সাহস দিল। তারা বুঝল, কষ্ট মানেই আল্লাহ রাগ করেছেন— এমন নয়। কখনো কখনো কষ্টই হয় ঈমানের পরীক্ষা।
শেষে দাদা ধীরে ধীরে বললেন, "নির্যাতন এত বেড়ে গেল যে, নবীজি ভাবতে লাগলেন, কীভাবে তাঁর সাহাবিদের নিরাপদ রাখা যায়। আর সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো ইসলামের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়— হাবশায় হিজরত। সেই গল্পটি শুনবে আগামীকাল।
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম, তা হলো- সত্যের পথে চলতে গেলে পরীক্ষা আসবেই। ঈমানের শক্তি পৃথিবীর সব শক্তির চেয়েও বড়। ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা মানুষকে অটল রাখে। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা ও দয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তাছাড়া জান্নাতের আশা একজন মুমিনকে সব কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেয়।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১২)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/