আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
সময়টা ১৯৯১ সাল। জালালপুর এলাকার একটি মাহফিলে বয়ান পেশ করছিলেন তরুণ আলেম মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী। সেই মাহফিলে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী বেড়তলা গ্রামের কিছু মুসল্লিও। তরুণ যুবায়েরের হৃদয়গ্রাহী, মনোমুগ্ধকর এবং আত্মাকে জাগিয়ে তোলার মতো সেই বয়ান শুনে গভীরভাবে প্রভাবিত হন গ্রামবাসী। তাঁর কণ্ঠে তাঁরা শুনতে পেয়েছিলেন দীনের সুমহান আহ্বান, অনুভব করেছিলেন মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম দরদ এবং তাঁর চিন্তাধারায় উপলব্ধি করেছিলেন একটি আলোকিত সমাজ গঠনের সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন। অনেক দিন ধরেই তাদের মনে একটি গ্রামে একটি দীনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা ছিল। কিন্তু এর জন্য উপযুক্ত ও যোগ্য কোনো ব্যক্তিত্ব তাঁরা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই তরুণ আলেম যুবায়ের আহমদকে পেয়ে যেন তাঁরা হাতে আকাশের চাঁদ খুঁজে পেলেন।
অষ্টগ্রামের মাওলানা জয়নাল আবেদীন তরুণ মাওলানা আনছারীকে সঙ্গে করে বেড়তলা পূর্বপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়ে আসেন। সে সময় ওই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মাওলানা আব্দুস সামাদ ফতেপুরী রহ.। তিনি ছিলেন একজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন বুজুর্গ ও আল্লাহওয়ালা মানুষ। তাঁর অন্তরেও দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই এলাকায় একটি দীনি মাদরাসা গড়ে তোলার সুপ্ত বাসনা ছিল।
এরপর মসজিদের ইমাম সাহেব ও গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সবাই মিলে একত্রিত হয়ে মাওলানা আনছারী সাহেবের কাছে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। আনছারী সাহেব তাদের এই মহৎ প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন। কারণ, তাঁর নিজের হৃদয়েও সবসময় দীনি খেদমতের এক অদম্য আকাক্সক্ষা ও স্পৃহা কাজ করত। এই প্রস্তাবকে তিনি আল্লাহর জমিনে দীনি শিক্ষা ও ইসলামি আদর্শ ব্যাপকভাবে বিস্তারের একটি সম্ভাবনাময় ঊর্বর ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
এদিকে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার এই মহান উদ্যোগের কথা জানতে পেরে আমেরিকা প্রবাসী জনাব শফিকুল ইসলাম সানন্দচিত্তে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে মাদরাসার জন্য সাত শতাংশ জায়গা দানের প্রতিশ্রুতি দেন।
শুরু হয় পথচলা
বেড়তলা পূর্বপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অস্থায়ীভাবে মাদরাসার কার্যক্রম শুরু হলো। এর সঙ্গে যুক্ত হলেন আরও কয়েকজন বিজ্ঞ আলেম এবং দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকে। জমে উঠতে থাকে দীনি ইলমের মজমা। এভাবে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মাদরাসাটি গ্রামীণ পরিবেশেই পরিচালিত হতে থাকে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় দেখা দেয় তীব্র জায়গার সংকট। পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থাও ছিল খুবই অপ্রতুল। বিশেষ করে আমেরিকা প্রবাসী শফিকুল ইসলামের প্রতিশ্রুত জমি শেষ পর্যন্ত না পাওয়ার কারণে মাদরাসার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে আরেকটি সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি গ্রামের ভেতর অবস্থিত, এজন্য আশপাশের বাড়ির নারীদের পর্দা রক্ষার বিষয়টি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠে। শুরুর দিকে ছাত্ররা ছোট থাকায় তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে ধীরে ধীরে ক্লাস ও শিক্ষার্থীদের বয়স বৃদ্ধি এবং বড় বড় ছাত্র ভর্তি হওয়ায় পর্দার বিষয়টি বেশ জটিল হয়ে দাঁড়ায়। একটি দীনি প্রতিষ্ঠানের কারণে এই ধরনের পর্দার সংকট কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না, যা মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারীকে দারুণভাবে পীড়িত করতে থাকে।
এমতাবস্থায় তিনি এই সংকটগুলোর কথা গ্রামবাসীর কাছে খুলে বলেন এবং মাদরাসার জন্য একটি বড় পরিসরে জায়গা ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু সেই মুহূর্তে গ্রামবাসীর পক্ষে বড় জায়গা বা জমি ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় একপর্যায়ে আনছারী সাহেব মাদরাসা ছেড়ে চলে যান। যারা সেখানে ছিলেন, তারাও মাদরাসাটিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে কিছু দিন পর সাময়িকভাবে মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যায়।
নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত একটি দীনি প্রতিষ্ঠান এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত কষ্ট ও পীড়াদায়ক এক অভিজ্ঞতা ছিল। এটি তাদের মর্যাদার জন্যও ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। তাই তারা অনুতপ্ত হয়ে পুনরায় মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারীর কাছে ছুটে গেলেন। এবার গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হলো, মাদরাসার জন্য অবশ্যই রাস্তার পাশে উপযুক্ত জায়গা জোগাড় করা হবে এবং এই বিষয়ে গ্রামবাসী একমত হলেন।
নামকরণ ও প্রাথমিক অগ্রযাত্রা
সে সময় বেড়তলা বাজারে দুই শতক জায়গার ওপর একটি ছোট্ট টিনের ঘর ছিল, যেখানে স্থানীয় বাজারের লোকজন নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। ১৯৯৪ সালে সেই টিনের ঘরটিকে কেন্দ্র করে আরও দুই শতক জায়গা বাড়িয়ে নেওয়া হয়। এই জায়গাটি নেওয়া হয়েছিল মাওলানা আবুল কায়েস সাহেবের বাবার কাছ থেকে। গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় অবশেষে আবারও নতুন উদ্যমে চালু হয় ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’।
তবে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেই মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. ক্ষান্ত হননি। মাদরাসার ভবিষ্যৎ রূপরেখা, সুন্দর পরিবেশ, শিক্ষা ও শিক্ষকতার মান এবং দীনি খেদমতের পরিধি কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়Ñসে বিষয়ে তিনি নিরন্তর গভীরভাবে ভাবতে থাকেন।
টিনের ঘর থেকে দৃষ্টিনন্দন জামিয়া
নতুন উদ্যমে মাদরাসার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় সবার মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। আস্তে আস্তে মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যাও বাড়তে থাকে। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই এখানেও সেই আগের মতো জায়গার সংকট দেখা দেয়। ছাত্রদের স্থান সংকুলান করতে তখন আশপাশের কয়েকটি দোকান ও ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও যখন স্থায়ী সমাধান হলো না, তখন মসজিদের দক্ষিণ পাশে আরও কিছু জায়গা সংগ্রহ করা হয়।
তবে এভাবে সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে তো আর দীর্ঘকাল চলা যায় না! জায়গার এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েন মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.। ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে মাদরাসার জন্য একটি উপযুক্ত ও প্রশস্ত জায়গা সংগ্রহের বহুমুখী চেষ্টা অব্যাহত থাকে। তিনি বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করতে থাকেন; আস্তে আস্তে সবাই তাঁর এই স্বপ্নের কথা জানতে পারেন।
এক পর্যায়ে তিনি এই স্বপ্নের কথা জানান তাঁর পীর ও মুর্শিদ আল্লামা গহরপুরী রহ.কে। তিনি তখন বলেনÑ আমি গিয়ে দোয়া করে দেব, তোমার মাদরাসার জায়গা ব্যবস্থা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। একবার গহরপুরী রহ. ঢাকা অথবা ময়মনসিংহে যাবেনÑআনছারী রহ.কে আগেই জানান, তিনি যেন রাস্তায় অপেক্ষা করেন। তখন যেহেতু মোবাইলের ব্যবহার শুরু হয়নি এজন্য আনছারী রহ. তাঁর সাথীবৃন্দকে নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে দিনভর অপেক্ষা করেন গহরপুরী হুজুরের জন্য। শেষ বিকেলে হঠাৎ দেখতে পান গহরপুরী রহ.-এর গাড়ি তাদের পার হয়ে সামনে চলে গেছে। দৌড়ে গিয়ে গাড়ি থামানো হয়। হুজুরকে বলা হয়Ñ মাদরাসা কিছুটা পেছনে ফেলে এসেছেন। হুজুর তখন জানান, দেরি হয়ে গেছে, হাতে সময় নেই। এজন্য গাড়ি যেখানে থেমেছে সেখানেই দোয়া করে দেন। আল্লাহর কী ফায়সালা, পরবর্তী সময়ে জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা গড়ে উঠে ঠিক সেই জায়গাটিতেই, যেখানে গাড়ি থামিয়ে গহরপুরী রহ. দোয়া করেছিলেন। এটাকে বরেণ্য এই বুজুর্গের অন্যতম কারামাত হিসেবে দেখা হয়।
২০০৪ সালে আলহাজ্ব আব্দুস সাত্তার সাহেব মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে জমি বিক্রি করতে রাজি হন এবং একই সঙ্গে মসজিদ নির্মাণের জন্য ৫ শতক জায়গা সম্পূর্ণ দান করেন। এই জমিতেই বর্তমান সময়ের ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’ গড়ে উঠেছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’ তার নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায়। এটি ছিল বহু বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণের এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়। নতুন এই জায়গার ভিত্তি ও বরকতের জন্য পরম আন্তরিকতায় দোয়া করেছিলেনÑআল্লামা নূরউদ্দীন গহরপুরী রহ., ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনূসিয়ার সাবেক মুহতামিম মুফতি নূরুল্লাহ রহ. এবং শাইখে দীঘলবাগী আল্লামা আব্দুর রহমান রহ.।
সময়ের পরিক্রমায় ‘জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা’র পরিধি বাড়তে থাকে। শুরুর দিকে এখানে কেবল ‘তাইসির’ জামাত পর্যন্ত ছিল; পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে নতুন জামাতগুলো খোলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে ‘মিশকাত জামাত’ এবং ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’ চালু করা হয়।
দেশ-বিদেশের হিতাকাক্সক্ষীদের অনুদান এবং নিজের উপার্জনের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করে মাওলানা আনছারী রহ. পরম ভালোবাসায় এই প্রতিষ্ঠানকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন। ছনের বা টিনের একটি সাদামাটা ঘর থেকে আজকের এই দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাসে রূপান্তরের পেছনে রয়েছে হজরত আনছারী রহ.-এর অক্লান্ত পরিশ্রম, ইখলাস, দূরদর্শী চিন্তা এবং একনিষ্ঠ কুরবানি।
জামিয়ার সুরম্য মসজিদ
২০১২-১৩ সালের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠান শেষে দেশের প্রখ্যাত আলেম ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান রহ. বেড়তলা জামিয়ায় তাশরিফ আনেন। সেখানে এসে তিনি জানতে পারেন, মাদরাসায় কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ নেই এবং সবাই মিলে একটি হলরুমে জামাতে নামাজ আদায় করেন। তখন তিনি মাদরাসার জন্য আন্তরিক দোয়া করেন এবং মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.কে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
এরপর আনছারী রহ. ঢাকায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মুফতি আব্দুর রহমান রহ. তখন মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই ওয়াদা অনুযায়ী তিনি ধাপে ধাপে মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী পাঠাতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে এই অনুদানের সঙ্গে আরও ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন এবং মসজিদের নান্দনিক নকশা তৈরির জন্য একজন দক্ষ প্রকৌশলীও পাঠিয়ে দেন।
এই আর্থিক সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই মূলত বেড়তলা জামিয়ার ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এই ঘটনার পর থেকে বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে মাওলানা আনছারী রহ.-এর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পাশাপাশি এর প্রভাবে মাদরাসার সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে মাদরাসার মেহমানখানা, অজুখানা এবং গোসলখানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বসুন্ধরার আদলে ও নকশায় নির্মিত হয়।
বর্তমানে জামিয়ার এই দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস, সুরম্য মসজিদ, চারপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, পাখ-পাখালির কলকাকলি এবং সবুজ গালিচায় বেষ্টিত ইমারত যে কারও নজর ও মন কেড়ে নেয়।
হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.: বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও সাধনা (পর্ব: ২)
লেখক: আব্দুল্লাহ আফফান
চলবে....
আইও/