|| আবদুল্লাহ আফফান ||
পূর্ব প্রকাশের পর থেকে.....
৫ম পর্ব
৫ মে ২০১৩ শাপলা চত্বরে
২০১৩ সালের ৫ মে। পবিত্র ইসলাম ধর্ম এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। ঐতিহাসিক এই কর্মসূচি বানচালের অসৎ উদ্দেশে তৎকালীন আওয়ামী সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লঞ্চ, ট্রেন ও সব ধরনের যান চলাচল আকস্মিক বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নবীপ্রেমিক তৌহিদি জনতা সেই সরকারি বাধাকে উপেক্ষা করে দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে উপস্থিত হন।
একপর্যায়ে ইসলামপ্রেমী এই লাখো মুসলিম রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।
ইসলাম ও প্রিয়নবী সা.-এর ভালোবাসায় উজ্জীবিত হওয়ার এই কর্মসূচিতে আগতদের সাহস ও মনোবল ধরে রাখতে আনছারী রহ. অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক আলোচনা করেন। বিশেষ করে, নিজে সম্পূর্ণ অভুক্ত থেকে তিনি চারপাশের সাধারণ মুসল্লিদের খোঁজখবর রাখেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য উজ্জীবিত করেন।
পরবর্তী সময়ে রাতের আঁধারে শাপলা চত্বর খালি করতে সরকারদলীয় পেটোয়া বাহিনী নির্মম তাণ্ডব চালায়। নির্বিচারে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি চালায়। এমন সংকটময় ও ভীতিকর পরিস্থিতিতেও মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. দৃঢ়ভাবে শাপলা চত্বর ত্যাগ না করে অবিচল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আল-আরাফাহ ওভারসিস ট্রাভেলসের মালিক জাকারিয়া সাহেব তাঁকে নিরাপদে নিজ অফিসে নিয়ে যান এবং সেখানে তিনি কিছু সময় অবস্থান করেন।
শাপলা চত্বরের সেই বিভীষিকাময় দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে অংশগ্রহণকারী যেসব তৌহিদি জনতা শহীদ হয়েছিলেন বা আহত হয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. ব্যক্তিগতভাবে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা করেন।
দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় কেনায় অবদান
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দীর্ঘদিনের একটি লালিত স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল-রাজধানী ঢাকার পল্টনে সংগঠনের একটি স্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয় কেনা। বিষয়টি নিয়ে বহু দিন ধরে দলটির নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা ও বৈঠক চলছিল। একবার তৎকালীন আমির প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান রহ.-এর অনুপস্থিতিতে সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.। সেই বৈঠকে স্থায়ী কার্যালয় কেনার বিষয়টি আবারও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়। দলের তৎকালীন মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক জানান, সংগঠনটি বর্তমানে যে অফিস ভাড়ায় ব্যবহার করছে, সেটির মালিক তা বিক্রি করতে ইচ্ছুক; তবে এর নির্ধারিত দাম সংগঠনের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি।
কিন্তু অদম্য মনোবল ও দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ না করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ফ্লোরটি কেনার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ফ্লোর কিনতে প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বিরাট অংশ নিজে এককভাবে প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেন। পাশাপাশি, বাকি অর্থ দেশ ও প্রবাসের বিত্তবান হিতাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সংগ্রহের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখার জোরালো আশ্বাস দেন।
তাঁর এই অভাবনীয় দূরদর্শিতা, আর্থিক ত্যাগ এবং অটল ও দৃঢ় নেতৃত্ব দলের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে এক নতুন সাহসের সঞ্চার করে এবং তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে।
পরবর্তী সময়ে তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয় কেনার স্বপ্ন পূরণ হয়, যা দলটির জন্য একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.-এর আজীবনের স্বপ্ন ছিল-বাংলাদেশে পবিত্র কুরআনের সুমহান শাসন ও খেলাফতের আদর্শ প্রবর্তন করে একটি ইনসাফপূর্ণ, শোষণমুক্ত ও শান্তিময় সমাজ গড়ে তোলা। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস এবং শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত তিনি এই পবিত্র আদর্শ ও স্বপ্নের পেছনেই অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন।
এমএম/