অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন।
এদিন দুপুর নাগাদ পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পাঠাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা।
এক সূত্র জানিয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরীক্ষায় তার নিউরো কেন্দ্রিক জটিল রোগ ধরা পড়েছে। তাই পদত্যাগ করে স্ত্রীসহ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যেতে চান মো. সাহাবুদ্দিন।
তবে এ বিষয়ে এখনো রাষ্ট্রপতি কার্যালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কীভাবে
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগের কারণ দেখানো, স্পিকারের সম্মতি নেওয়া কিংবা সংসদের অনুমোদনের কোনো শর্ত এ অনুচ্ছেদে নেই। পত্রটি স্পিকারকে সশরীরেই গ্রহণ করতে হবে, এমন কথাও সংবিধানে বলা হয়নি।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর কী হবে, তা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ব্যক্তি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করবেন।
এ সময় স্পিকার নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়ে যান না। তিনি সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক কার্যাবলি পালন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি কার্যভার নিলে স্পিকারের এই দায়িত্ব শেষ হবে।
কত দিনের মধ্যে নির্বাচন
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সেই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। পদত্যাগ না করলে ২০২৮ সালের এপ্রিলে তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি একসময় দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। তখন মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপপু নামে চিনত।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগেও নির্বাচন হতে পারে।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে, আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
ফলে কোনো দল উত্তরসূরি হিসেবে কারও নাম ঠিক করলেই তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে যাবেন না। তাকে প্রার্থী হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হতে হবে।
সংবিধানের ১১৯(১) (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করেন। নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।
তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ থাকবে। ভোট হবে সংসদ কক্ষে। সংসদের অধিবেশন না থাকলেও স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
কারা ভোট করতে পারবেন
রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সী এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে আগে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না।
প্রার্থীকে বর্তমান সংসদ সদস্য হতে হবে না। তবে তার মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হবে। প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর থাকতে হবে।
কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে কার্যভার গ্রহণের দিন তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে।
বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোট নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়, প্রকাশ্য
প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে। ভোটার ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে স্বাক্ষর করে সেটি সংগ্রহ করেন। এরপর যাকে ভোট দেবেন, তার নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করেন।
সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হন। দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলটির সিদ্ধান্তই নির্ধারক হবে। দলীয় ভোট অটুট থাকলে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত। আর অন্য কোনো বৈধ প্রার্থী না থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে শপথ নিয়ে কার্যভার গ্রহণ করবেন। সংবিধানের ৫০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব নেবেন না। কার্যভার গ্রহণের দিন থেকে তার নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন ঘোষণাতেই শেষ হয়ে যায় না। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ রয়েছে।’
সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই একমাত্র ভোটাভুটি হয়েছিল। বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর প্রতিটি নির্বাচনে একজন বৈধ প্রার্থী থাকায় আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি।
বাংলাদেশে সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন নবম জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ। আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে তিনি ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দ্বিতীয় মেয়াদে ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
এর আগে, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার প্রয়াত জমির উদ্দিন সরকার। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। তিনি ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৮ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
সূত্র: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর
