মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
জাতীয় শিশু-কিশোর ইসলামি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে ইফা সড়কে প্রাণ গেল মেধাবী তরুণ আলেম মাহমুদ হাসান আরিফের স্বচ্ছতা বাড়াতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ডিজিটাল করছে বাংলাদেশ ব্যাংক দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার নিবন্ধনের সাধারণ সময় শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার সপ্তাহখানেকের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে: রিজভী বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা ৬ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাসের শঙ্কা! হারামাইনের সাউন্ড সিস্টেম বদলে দেওয়ার কারিগর তুর্কি প্রকৌশলী পাল্টে গেল দাখিল-আলিমের ‘সাধারণ শাখা’র নাম সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত তোলা নিয়ে নতুন নির্দেশনা

স্বচ্ছতা বাড়াতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ডিজিটাল করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি সংগৃহীত।

বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপের নিলাম, ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরির প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ-সবকিছু একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা বিভাগের জারি করা পরিচালন নির্দেশিকায় নতুন এই ব্যবস্থার বিস্তারিত কার্যপ্রণালি তুলে ধরা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা কেনা বা বিক্রির নিলাম পরিচালনা করতে পারবে।

পাশাপাশি অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায়ী ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার তাৎক্ষণিক, ভবিষ্যৎ ও বিনিময়ভিত্তিক লেনদেন একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এর ফলে লেনদেন সম্পন্ন করা, নিষ্পত্তি, নজরদারি, প্রতিবেদন তৈরি এবং তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপের নিলাম প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা। দ্বিতীয়ত, অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা তৈরি করা। তৃতীয়ত, রফতানি, আমদানি ও প্রবাসী আয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরি ও প্রকাশ করা।


নিলাম হবে ডিজিটাল ব্যবস্থায়
নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাজার পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা কেনা বা বিক্রির নিলাম আয়োজন করতে পারবে। এ জন্য নিলামের পরিমাণ, তারিখ, সময়, লেনদেনের ধরন, অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং অন্যান্য শর্ত উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নোটিশ দেওয়া হবে।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদিত ব্যাংকগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থায় তাদের দরপত্র জমা দিতে পারবে। নিলামে একটি ব্যাংকের দরপত্রের পরিমাণ মার্কিন ডলারে উল্লেখ করতে হবে এবং তা ৫ লাখ ডলার ও এর গুণিতক হতে হবে। একই সঙ্গে ডলার-টাকার বিনিময় হার এবং অর্থ পরিশোধের ধরন উল্লেখ করতে হবে।

নিলামের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাপ্ত দরপত্রের ভিত্তিতে ফলাফল তৈরি ও বরাদ্দ চূড়ান্ত করবে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে বরাদ্দের ফল দেখতে পারবে এবং তা গ্রহণের স্বীকৃতি দেবে।দরপত্র জমা দেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এর পরিমাণ বা দর পরিবর্তন কিংবা দরপত্র বাতিলের সুযোগ থাকবে। তবে নিলামের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে কোনো দরপত্র সংশোধন বা বাতিলের আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

ব্যাংকগুলোর ডলার লেনদেনও একই ব্যবস্থায়
নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিনের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। তাৎক্ষণিক ও ভবিষ্যৎ তারিখের লেনদেনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং বিনিময়ভিত্তিক লেনদেনের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাৎক্ষণিক বা ভবিষ্যৎ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রথমে বিক্রেতা ব্যাংক লেনদেনের প্রস্তাব দেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ক্রেতা ব্যাংক ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটি গ্রহণ করবে। তাৎক্ষণিক লেনদেনের নিষ্পত্তি সর্বোচ্চ দুই কার্যদিবসের মধ্যে হতে পারে। আর ভবিষ্যৎ লেনদেনের ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ উল্লেখ করতে হবে। সেই মেয়াদের ভিত্তিতে ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তির তারিখ নির্ধারণ করবে।কোনো লেনদেনে সংশোধনের প্রয়োজন হলে ক্রেতা ব্যাংক তা বিক্রেতা ব্যাংকের কাছে ফেরত পাঠাতে পারবে। লেনদেন বাতিল হলে তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে।

বিনিময়ভিত্তিক লেনদেনেও একই কাঠামো
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ভিত্তিক লেনদেনও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। এ ধরনের চুক্তিতে দুটি পর্যায়ে লেনদেন সম্পন্ন হয়-একটি নিকটবর্তী তারিখে এবং অন্যটি পরবর্তী তারিখে। ফলে লেনদেনের সময় পরবর্তী পর্যায়ের নিষ্পত্তির তথ্যও দিতে হবে। ক্রেতা ব্যাংক ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রস্তাব গ্রহণ করার পর লেনদেনের অবস্থা অনুমোদিত হিসেবে দেখাবে। এরপর উভয় পক্ষের কার্যালয়ের মাধ্যমে অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রার নিষ্পত্তি সম্পন্ন হবে।

নিষ্পত্তিতে থাকবে দুই স্তরের অনুমোদন
নতুন ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা ও টাকা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও দুই স্তরের অনুমোদন রাখা হয়েছে। বিক্রেতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রথমে বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করবেন। এরপর আরেক কর্মকর্তা তা যাচাই ও অনুমোদন করবেন।এরপর ক্রেতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা টাকার নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করবেন এবং অপর কর্মকর্তা তা অনুমোদন করবেন। উভয় পক্ষের অনুমোদন শেষ হলে টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রার নিষ্পত্তি সম্পন্ন হবে।
বিনিময়ভিত্তিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও নিকটবর্তী ও পরবর্তী-দুই পর্যায়ের নিষ্পত্তিতে একই ধরনের যাচাই ও অনুমোদন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

দিনে তিনবার ডলারের লেনদেনের তথ্য
নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের তথ্য সংগ্রহ ও রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরি। এ জন্য অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিন রফতানি, আমদানি ও প্রবাসী আয়সংক্রান্ত গ্রাহক পর্যায়ের তথ্য জমা দিতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরি ও প্রকাশ করা হবে।নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি কর্মদিবসে তিন দফায় তথ্য দিতে হবে। প্রথম দফায় সকাল ১১টা পর্যন্ত সংঘটিত লেনদেনের তথ্য সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যে জমা দিতে হবে। দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৪টা পর্যন্ত সংঘটিত লেনদেনের তথ্য বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে জমা দিতে হবে। আর বিকেল ৪টার পর থেকে দিনের শেষ পর্যন্ত সংঘটিত লেনদেনের তথ্য পরবর্তী কর্মদিবসের সকাল ১১টার মধ্যে জমা দেওয়া যাবে। কোনো ব্যাংকের নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন করার মতো বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন না থাকলেও ‘শূন্য প্রতিবেদন’ জমা দিতে হবে।

এক লাখ ডলারের বেশি লেনদেনের তথ্য
রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরির জন্য অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে এক লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি পরিমাণের গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেনের তথ্য জমা দিতে হবে। তবে প্রবাসী আয় বা মজুরি-ভিত্তিক প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ এক লাখ ডলারের কম হলেও প্রকৃত লেনদেনের তথ্য দিতে হবে।এর ফলে প্রবাসী আয়সংক্রান্ত ছোট-বড় সব লেনদেনের তথ্যই কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করার সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ
নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্বও আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সামনের সারির কর্মকর্তারা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন তৈরি ও গ্রহণ এবং নিলামে দরপত্র দেওয়ার কাজ করবেন। মধ্যবর্তী পর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যবহারকারীর পরিচয় তৈরি, অনুমোদন, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়ীদের লেনদেনসীমা নির্ধারণ করবেন। পেছনের সারির কর্মকর্তারা অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রার নিষ্পত্তি এবং প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পালন করবেন।বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রাথমিকভাবে মধ্যবর্তী পর্যায়ের একজন প্রস্তুতকারী ও একজন যাচাইকারী কর্মকর্তার জন্য ব্যবহারকারী পরিচয় দেবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ব্যবহারকারী পরিচয় তৈরি করতে পারবে।

তথ্য না দিলে চলবে না
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী তথ্য জমা দিতে পারবে ফাইল আকারে অথবা পৃথক লেনদেনের তথ্য হিসেবে। নির্ধারিত ছক ছাড়া অন্য কোনো ফরম্যাটে তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। কোনো নির্দিষ্ট সময় বা দিনে লেনদেন না থাকলে শূন্য প্রতিবেদন দিতে হবে।ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা তথ্য জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যাচাইকারী কর্মকর্তা তা অনুমোদন করবেন। একাধিক ফাইল জমা পড়লে সেগুলো একত্র করে অনুমোদনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের লেনদেনের তথ্য আরও দ্রুত ও কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিলাম থেকে শুরু করে আন্তঃব্যাংক লেনদেন, অর্থ পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তি এবং গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেন-প্রতিটি ধাপের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিলাম পরিচালনা, দরপত্র গ্রহণ ও মূল্যায়ন, বরাদ্দ, প্রতিবেদন তৈরি এবং তথ্য সংরক্ষণে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে লেনদেন নিশ্চিতকরণ, নজরদারি, প্রতিবেদন, নিরীক্ষা-তথ্য এবং রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের লেনদেন ও তথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হলে বাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো কতটা নির্ভুল ও সময়মতো তথ্য দিচ্ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সেই তথ্য বাজার ব্যবস্থাপনায় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। সব মিলিয়ে নতুন এই ব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রা বাজারকে আরও তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমএন/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ