বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১১ জিলহজ ১৪৪৭


শেষ যুগের আকাবির: মুফতি ইফতেখারুল হাসান কান্ধলুভি রহ.-এর জীবনকর্ম

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

গত রমজান মাসে আসরের পর উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেম ও বুজুর্গ হজরত মাওলানা ইফতেখারুল হাসান কান্ধলুভি রহ.-এর ইন্তেকাল হয়। মুহূর্তেই এই সংবাদ হিন্দুস্তানসহ সকল মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যু সংবাদে ভক্তকূল শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কারণ তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সকলেই জানতো। যদিও বার্ধক্যের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সফরে বের হতে পারেননি, আগের মতো মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ তেমন একটা করতে পারেননি, কিন্তু তারপরেও তাকে সবাই নিজেদের ওপর ছায়ার মতো মনে করতো।

জন্ম: তিনি ১০ জুমাদাল উলা ১৩১৪ হিজরি মোতাবেক ১০ জানুয়ারি ১৯২০ তারিখে কান্ধুলায় জন্মগ্রহণ করেন।

বংশ পরিক্রমা: তার বংশ পরিক্রমা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর বংশের সঙ্গে মিলে। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন হজরত মুফতি ইলাহি বকশ কান্ধলুভি রহ.। তার বংশের ধারাবাহিকতা হচ্ছে, ইফতেখারুল হাসান ইবনে রউফুল হাসান ইবনে জিয়াউল হাসান ইবনে মুহাম্মদ সাদেক ইবনে নুরুল হাসান ইবনে আবুল হাসান ইবনে মুফতি ইলাহি বকশ কান্ধলুভি রহ.।

পারিবারিক পটভূমি: তিনি কান্ধুলার এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যার থেকে প্রতি যুগে যুগে যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও বুজুর্গ জন্মগ্রহণের ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিলো। তার পিতা মাওলানা রউফুল হাসান সাহেব একে একে দুটি বিয়ে করেন। যার থেকে মোট পাঁচজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম স্ত্রী থেকে মাওলানা নাজমুল হাসান, মাওলানা ইহতেশামুল হাসান (খলিফা: হজরত ইলিয়াস কান্ধলুভি রহ. ও হাকিম কমারুল হাসান জন্ম নেন।

তিন মেয়ে জুওয়াইরিয়া খাতুন (হজরত ইলিয়াস কান্ধলুভি রহ. এর সহধর্মিণী), আমাতুল মাতিন খাতুন (শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলুভি রহ. এর স্ত্রী) ও আমাতুদ দিয়ান খাতুন (মাওলানা জহিরুল হাসান শহিদ রহ. এর স্ত্রী) প্রথম স্ত্রীর সন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রী থেকে জন্ম নেন মাওলানা আজহারুল ইসলাম সাহেব ও মাওলানা মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেব। এই হিসেবে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলুভি রহ. ও শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া রহ. এর মধ্যে শ্যালক-ভগ্নিপতির সম্পর্ক ছিলো।

শিক্ষা সমাপন: মুফতি ইফতেখারুল হাসান রহ. ১৯৪৮ সালে মাদরাসায়ে মাজাহেরে উলুম সাহরানপুর থেকে ফারেগ হন।

ইসলাহি তায়াল্লুক ও খেদমত: তিনি সময়ের বিশিষ্ট আলেম শাহ আব্দুল কাদের রায়পুরি রহ. এর কাছে ইসলাহি সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরি রহ. তাকে খেলাফত দেন। তার আচার-আচরণ আর ওঠা-বসা থেকে তার শায়েখ ও রুহানি মুর্শিদ আব্দুল কাদের রায়পুরি রহ. ‘সুফি জি’ উপাধি দিয়েছিলেন। হজরত মাওলানা জাকারিয়া রহ. নিজ কিতাব ‘আপবিতি’তেও তার নাম ‘সুফি ইফতেখার’ উল্লেখ করেছেন। তবে সাধারণ মানুষ তাকে মুফতি ইফতেখারুল হাসান নামেই চিনতো।

হজরতের খলিফাগণ: মুফতি সাহেবের কাছে বড় একটা জামাত আধ্যাত্মিক ইসলাহের জন্য বায়াত হয়েছিলো। তাদের কাছেও তিনি প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। তার খলিফা সংখ্যা পঞ্চাশেরও অধিক। যাদের মধ্যে হজরত মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব রায়পুরি (প্রাক্তন শিক্ষা সচিব, মাজাহেরে উলুম সাহরানপুর), হজরত মাওলানা কামেল হাসেব রহ., হজরত মাওলানা জোবায়রুল হাসান কান্ধলুভি রহ., হজরত মাওলানা সাদ সাহেব কান্ধলুভি এবং হজরত মাওলানা মোহাম্মদ শা’বান বস্তুভি সাহেব প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁর বড় ছেলে মাওলানা নুরুল হাসান রাশেদ কান্ধলুভি এখন তার উত্তরাধিকরী।

পবিত্র কোরআনে কারিমের দরস: মাদরাসায়ে মাজাহেরে উলুম সাহরানপুর থেকে ফারেগ হয়ে প্রথমে তিনি কান্ধুলার জামে মসজিদে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে নুসরতুল উলুমে কিছুদিন ইলমি খেদমত আঞ্জাম দেন। কিছুদিন খেদমত করে একটা মসজিদে ফজরের পর কুরআনে কারিমের দরস দেয়া শুরু করেন। আর ঘরের ভেতর চালু করেন বাইয়াত ও অন্যান্য কিতাবের তাদরিসের কাজ। এলমে নবুওয়াতের প্রতি অনুরাগীরা দলে দলে ভিড় করতে শুরু করে মুফতি সাহেবের কাছে। এ সকল অনুরাগীগণ তাঁর কাছে অবস্থান করে কিতাবের জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতো।

মুফতি ইফতেখারুল হাসান রহ. অনেক বড় মুফাসসির হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। জামে মসজিদে দীর্ঘ দিন তাফসির করে ভক্তক‚লের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। শেষ বয়সে নিজ ঘরের পাশের মসজিদে প্রতিদিন প্রায় দেড় ঘণ্টা করে প্রায় ৫৫ বছর পর্যন্ত তাফসিরের কাজটা জারি রেখেছিলেন। এতে আশপাশের ভক্ত তো বটেই; দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ সাইকেল চালিয়ে চলে আসতেন। মুফতি সাহেব রহ. পবিত্র কোরআনের দরসে আয়াতগুলো অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতেন। আয়াতের প্রাসঙ্গিক আলোচনাও করতেন।

কখনো একেকটি আয়াতের আলোচনায় ইলমের নদী এমনভাবে প্রবাহিত হতো, যা সমাপ্ত করতে কয়েকদিন লেগে যেত। সুরা বাকারার আয়াত ‘ওয়া ইজ কলা রাব্বুকা লিল মালায়িকাতি ইন্নি জায়িলুন ফিল আরদি খলিফাতুন’ এর তাফসির একটি অপূর্ণাঙ্গ কিতাব আকারে সকালের সামনে এসেছিলো। তাও ছিলো মাত্র ৯ দিনের তাকরির। কিতাবটির নাম ছিলো ‘তাকারিরে তাফসিরুল কোরআন’। যদি কিতাবটিকে সংরক্ষণ করা হতো, তাহলে ইলমি দুনিয়া অনেক উপকৃত হতে পারতো। মুফতি সাহেবের (রহ.) এই কুরআনি মজলিস অনেক বরকতময় ছিলো।

অর্ধ শতাব্দ থেকে চালু হওয়া এই মজলিস আনুমানিক ১৯৯২ বা ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিলো। যাতে প্রায় পাঁচ যুগ অতিবাহিত হয়েছিলো। তার এই কার্যক্রম যখন সমাপ্ত হলো, তখন কোরআনের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করে জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে বিশাল একটা ইজতিমা করেন। অনুষ্ঠানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন, যার ফলে কান্ধুলার সবচেয়ে প্রশস্ত ঈদগাহটি ভরে যায়। অনেক বড় বড় আলেম তাতে অংশগ্রহণ করেন। যার মধ্যে মুফাক্কিরে ইসলাম হজরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. অন্যতম ছিলেন। হজরত নদবি রহ. তার আত্মজীবনীতে অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুন্দরভাবে মজলিসটির কথা উল্লেখ করেছেন।

ফুলাতবাসিদের সঙ্গে মুফতি সাহেবের সম্পর্ক: যখন হজরত মাওলানা আলাউদ্দিন ফুলাতি রহ. ফুলাত থেকে পাকিস্তান চলে গেলেন, তখন ফুলাত মাদরাসার জিম্মাদারির বিষয়টি সামনে এলো। কীভাবে মাদরাসাটি সুন্দরভাবে চালিয়ে নেয়া যায়, এ বিষয় নিয়ে মিটিং বসা হলো। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফুলাত থেকে একটি প্রতিনিধি দল হজরত শায়খ জাকারিয়া রহ. এর খেদমতে হাজির হয়। তারা শায়খকে আবেদন করলেন যেন তিনি ফুলাত মাদরাসার জন্য এমন একজন জিম্মাদার পাঠান, যিনি মাদরাসাও পরিচালনা করবেন, আবার দরসও প্রদান করবেন।

শায়খ জাকারিয়া রহ. মাওলানা এহতেরামুল হাসান কান্ধলুভি রহ. কে নির্বাচন করে পাঠালেন। মাওলানা এহতেরামুল হাসান কান্ধলুভি রহ. লম্বা একটা সময় পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ফুলাত মাদরাসার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তাদরিসের কাজও চালিয়ে যান। হজরত মাওলানা তখন ফুলাতেই অবস্থান করতেন।

১৯৮১ সালের দিকে কিছু সমস্যার কারণে মাওলানা এহতেরামুল হাসান কান্ধলুভি রহ. পুনরায় কান্ধুলায় চলে আসেন। যার ফলে মাদরাসা হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন। এই সংকট নিরসনের জন্য পুনরায় ফুলাত মাদরাসা থেকে একটি প্রতিনিধি দলকে পাঠানো হয় মুফতি ইফতেখারুল হাসান রহ. এর কাছে। যার মধ্যে ছিলেন, হাকিম জহির রহ., হাজি মোহাম্মদ আরিফ রহ., হাফেজ আব্দুল ওলি এবং হাজি মোহাম্মদ ওকিল সিদ্দিকি রহ. প্রমুখ। তাদের সঙ্গে হজরত মাওলানা মোহাম্মদ কালিম সিদ্দিকি সাহেব সফর করেছিলেন।

কালিম সিদ্দিকি সাহেব মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেবের নিকট প্রায়ই সফর করতেন। রাস্তায় এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তারা তাকে সঙ্গে নিয়ে নেয়। যদিও তখন কালিম সিদ্দিকি সাহেবের বয়স ছিলো খুব কম। তো যখন এই প্রতিনিধি দল মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেবের নিকট গেলো এবং দরখাস্ত পেশ করলো তখন মুফতি সাহেব রহ. ফুলাতের নিসবতে ও মাদ্রাসার কল্যাণের জন্য মাওলানা এহতেরামুল হাসান কান্ধলুভি রহ. কে পুনরায় ফুলাত মাদরাসায় যাওয়ার জন্য রাজি করালেন। তিনি পুনরায় ফুলাত মাদ্রাসায় গিয়ে আগের মতো দায়িত্ব বুঝে নেন এবং হিফজ পড়াতে শুরু করেন। এভাবেই হজরত ফুলাতের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের প্রমাণ দিলেন যাতে মাদরাসার উন্নতি-অগ্রগতির আরো পাকাপোক্ত হয়।

ফুলাতবাসীর সঙ্গে মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেবের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো। যার ফলে ফুলাতে উলামায়ে কেরামদের কদর বাড়তে থাকে দিন দিন। একবার ফুলাতের জামে মসজিদে বিশাল মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাকেও দাওয়াত করা হয় বিশেষভাবে। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে বয়ান করলেন।

এছাড়াও মাদরাসায়ে ফয়জুল ইসলামে একবার বড় একটি জলসা হলো। সেখানে দেশের নামি-দামি উলামায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করেন। যাদের মধ্যে হজরত মাওলানা জাকির হাসান উবাইদি ফুলাতি  বেঙ্গলোর থেকে আগমন করেন। এছাড়াও তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন হজরত মাওলানা হিফজুল কবির জালালাবাদী রহ., মুফতি মুজাফফর হুসাইন সাহরানপুরি রহ., মাওলানা আনজর শাহ কাশ্মিরি রহ. প্রমুখ। তাদের সঙ্গে মুফতি ইফতেখারুল হাসান রহ. উপস্থিত থেকে বয়ান করেছিলেন। তিনি বয়ান করার সময় লম্বা লম্বা হাদিস আরবি মতন মুখস্থ শুনাতেন। তার সুললিত কণ্ঠ আর সুন্দর উচ্চারণে হাদিসের মতন শুনে সাধারণ মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তো। তার বয়ান শোনার জন্য ভিড় করতো দলে দলে।

ফুলাতবাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বিশেষ করে এই কথাটা বলতেন, ‘আমার মহাব্বতের মানুষ এসেছে’। এতে আগমনকারী বড্ডো খুশি হয়ে যেত। ফুলাতে তখন দু’জন বেশ বড় মাওলানা ছিলেন। একজন মাওলানা বুরহানুদ্দিন রহ. অন্যজন মাওলানা নওয়াব লিয়াকত আলি। এই দু’জনের সঙ্গে মুফতি সাহেবের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো। তিনি মাওলানা বুরহানুদ্দিন সাহেবের কাছে আসতেন এবং মাঝে মধ্যে তার কাছে অবস্থান করতেন। এভাবে বেশ কয়েকবার ফুলাতে আসেন এবং জুমআর নামাজ পড়ান। শেষবার বুরহানুদ্দিন সাহেবের মৃত্যুর সময় এসেছিলেন।

ভারতবর্ষে হাদিসের সনদের দিক দিয়ে মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভি রহ. এর সনদের শাখা সবচে বেশি। যার মধ্যে একটি শাখা হলেন হজরত মাওলানা ফয়েজ রহমানগঞ্জ মুরাদাবাদি। মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেব এই শাখার সনদ অর্জনের জন্য ফুলাতে আগমন করেন এবং হজরত মাওলানা আলাউদ্দিন ফুলাতি রহ. থেকে হাদিসের ইজাজত গ্রহণ করেন। তার হাদিস গ্রহণের এই সিলসিলা এমন ছিলো, মুফতি ইফতেখারুল হাসান কান্ধলুভি রহ., মাওলানা আলাউদ্দিন ফুলাতি রহ., মাওলানা নুরুল হক টুঙ্কি রহ., মাওলানা ফয়জ রহমানগঞ্জ মুরাদাবাদি রহ., হজরত শাহ আব্দুল আজিজ রহ., হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভি রহ.।

হজরত মাওলানা মোহাম্মদ কালিম সিদ্দিকি সাহেবকে মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেব অনেক মোহাব্বত করতেন। একবার কান্ধুলার একটি মজলিসে মাওলানা মোহাম্মদ কালিম সিদ্দিকি সাহেব তার একজন সাথীসহ মুফতি সাহেবের খেদমতে উপস্থিত হোন। তখন দেখা গিয়েছিলো মুফতি সাহেব কতটা মোহাব্বত দেখিয়েছেন তার প্রতি। পীর হয়েও মুরিদকে যথেষ্ট সম্মান ও ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে মধুর ভাষায় কথা বললেন এবং দোয়া করে দিলেন।

একবার ফুলাতে গেলে ফুলাত মাদরাসার জিম্মাদারগণ মুফতি সাহেবকে আবেদন করলেন মাদ্রাসায় কিছু সময় বসে বরকত দিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি বললেন, ‘আমার তো এখন বড্ডো তাড়া, এক জায়গায় যেতে হবে। তবে আমি মাওলানা কালিম সিদ্দিকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাবো।’ কালিম সিদ্দিকি সাহেব মুফতি সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। মুফতি সাহেব যাওয়ার পথে গাড়িতে বসেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলেন।

২০১১ সালের ২১ মে রোজ রবিবার হজরত মুফতি সাহেব রহ. সাউদ আহমদের বিবাহ পড়িয়ে উপস্থিত সকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং মুসাফাহ করে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি মাওলানা আলাউদ্দিন ফুলাতি রহ. এর সঙ্গে নিজের আত্মিক সম্পর্কের কথা বললেন এবং এ প্রসঙ্গে কিছু কথাও বললেন। এমনিভাবে মাওলানা হুসাইন আহমদ কান্ধলুভি রহ. (ইমাম ও খতিব: ফুন্সওয়ালি মসজিদ বরুত) এর মৃত্যুর পর গোসল দেয়ার সময় হজরত মুফতি সাহেব রহ. হুইল চেয়ারে করে তাশরিফ আনেন। এসে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই তোমরা কোন জায়গা থেকে এসেছো?’

আমরা বললাম, ‘ফুলাত থেকে।’ হজরত তখন গোসলদাতা খাদেমকে বললেন, ‘ভাই, ফুলাতবাসী যেহেতু আছে, তারাই গোসল দেক।’

কোরআন ও ইলমের সঙ্গে সম্পর্ক: হজরত মুফতি ইফতেখারুল হাসান সাহেব রহ. কোরআনের দরস, শরয়ি বিধিবিধান বাস্তবায়িত করা এবং আমলের মাধ্যমে সৃষ্টির সেবায় জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। শরয়ি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে আলেম ও সাধারণ-সবার জন্য তিনি অনুসরণীয় ব্যক্তি ছিলেন। দেশের বড় বড় মাদরাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার থেকে একটু বরকত নেয়াকে সৌভাগ্য মনে করতো। এ কারণেই ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ একটা সময় ধরে দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লৌক্ষনও মাজাহেরে উলুম সাহরানপুরের মজলিসে শুরার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

দীনি দাওয়াতের জন্য সফর: মুরাদাবাদ, দিল্লি, মিরাঠ, মুজাফফর নগর, বুলন্দশহর, হারিয়ানা এবং পাঞ্জাবে মুফতি সাহেব রহ. কয়েকদিন পর পরই দিনি ও দাওয়াতি সফর করতেন। মুরিদদের তরবিয়ত, মসজিদ সংস্কার, শরয়ি মাসআলা সংশোধন এবং সমাজ থেকে যাবতীয় বিদআতি কর্মকান্ড দূর করতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ে-অসময়ে ব্যাপক সফর করতেন।

সন্তানাদি: হজরত মুফতি সাহেব রহ. এর মোট সাতজন সন্তান। এদের মধ্যে তিনজন ছেলে। প্রথম ছেলে মাওলানা নুরুল হাসান রাশেদ কান্ধলুভি তার উত্তরাধিকারী। অন্য দু’জন হলেন, মাওলানা জিয়াউর হাসান ও মাওলানা বদরুল হাসান। বাকি চারজন মেয়ে।

অসুস্থতা ও ইন্তেকাল: হজরত মুফতি সাহেব রহ. কয়েক বছর ধরেই বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন। সময়ে-সময়ে আগত মুহিব্বিনদের সঙ্গে কেবল মুসাফাহ করতেন। শেষ এক সপ্তাহ হজরতের প্র¯্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। খানা-পিনা সব বন্ধ হয়ে যায়। ১৪৪০ হিজরির ২৭ রমজান মোতাবেক ২০১৯ সালের ২ জুন রবিবার ফজরের পর শরীর খুব খারাপ হয়ে যায়। সন্ধ্যা ৫ টা ৪০ মিনিটে মুখে সামান্য জমজমের পানি ঢালা হয়। এরপর রক্তবমি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাওলায়ে পাকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান উর্ধ্ব জগতে। পরদিন সোমবার সকাল ৮ টায় কান্ধুলার ঈদগাহে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ পড়ান হজরত মাওলানা সাইদ আহমদ সাহেব কান্ধলুভি । পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। প্রচন্ড গরম আর রমজান মাস হওয়া সত্বেও অগণিত মানুষ তার জানাজায় শামিল হয়েছিলো।

-মোস্তফা কামাল গাজী অনূদিত

আরএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ