সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ।। ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
সিলেট সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বিএনপি-জামায়াত আমলে আলিয়া মাদরাসা বাড়ে ১৫৪১টি, আ.লীগ আমলে কমেছে ১৭৯টি আলী মিয়াঁ নদভীকে নিয়ে বই লিখে দিল্লি উর্দু একাডেমির পুরস্কার লাভ রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় হেফাজতের শোক, ক্ষতিপূরণ ও বিনামূল্যে চিকিৎসার দাবি রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি হামলার নিন্দা পাকিস্তানসহ ৪ দেশের  বিশ্বজয়ী হাফেজ হিরাকে শুভেচ্ছা জানালেন মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী ২০২৭ সালে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন, তারিখ চূড়ান্ত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌদি আরব ও কাতারের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ বিশ্বজয়ী হাফেজ ইহতেশামুল হক হিরাকে সংবর্ধনা দিল ধর্ম মন্ত্রণালয় লক্ষ্মীপুরে ড্রাম ট্রাকচাপায় বৃদ্ধ ভ্যানচালকের মৃত্যু

মূর্তি ভাস্কর্য বিষয়ে যা বললেন মুফতি আবদুল মালেক

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

মুফতি আবদুল মালেক।।

জনাব হুমায়ুন আহমেদ-এর ‘এখন কোথায় যাব, কার কাছে যাব’ শীর্ষক নিবন্ধটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নিবন্ধকার ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে, হাজী ক্যাম্পের সামনে থেকে লালন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার কারণে সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে হাদীস ও সীরাতের কিছু উদ্ধৃতি এবং কতিপয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ ও অনুমোদিত।

নিবন্ধকার যদি ভাস্কর্য শিল্প সম্পর্কে তাঁর নিজের মত বা সতীর্থ বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য উল্লেখ করতেন তবে আমাদের বিশেষ কিছু বলার ছিল না। কিন্তু তিনি ইসলামী আকীদা ও বিধানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে সম্পূর্ণ অসত্য কথা বলেছেন। তাই এই বিষয়ে কলম ধরাকে আমরা ঈমান ও আমানতের দাবি বলে মনে করি।

وما توفيقي إلا بالله، عليه توكلت وإليه أنيب.

তিনি প্রথমে যে (অবাস্তব) ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন তা তার ভাষায় এই: আমাদের মহানবী (সা.) কাবা শরীফের ৩৬০টি মূর্তি অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেয়ালের সব ফ্রেসকো নষ্ট করার কথাও তিনি বললেন। হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল কাবার মাঝখানের একটি স্তম্ভে, যেখানে বাইজেন্টাইন যুগের মাদার মেরির একটি অপূর্ব ছবি আঁকা। নবীজী (সা.) সেখানে হাত রাখলেন এবং বললেন, ‘এই ছবিটা তোমরা নষ্ট করো না।’ কাজটি তিনি করলেন সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর অসীম মমতা থেকে। মহানবীর (সা.) ইন্তেকালের পরেও ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ খলিফাদের যুগে কাবা শরীফের মতো পবিত্র স্থানে এই ছবি ছিল, এতে কাবা শরিফের পবিত্রতা ও শালীনতা ক্ষুণ্ণ হয়নি।

মহানবীর (সা.) প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাকের (আরব ইতিহাসবিদ, জন্ম : ৭০৪ খৃষ্টাব্দ, মদীনা, মৃত্যু : ৭৬৭ খৃষ্টাব্দ, বাগদাদ) লেখা দি লাইফ অব মোহাম্মদ গ্রন্থ থেকে ঘটনাটি বললাম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছেন আলফ্রেড গিয়োম (প্রকাশকাল ২০০৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫৫২)’’

পর্যালোচনা: এটি একটি অসত্য বর্ণনা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত যাদের অধ্যয়নে এসেছে এবং প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি ও তার ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর ফয়সালা যারা অবগত আছেন তারা নিজেরাই এ মিথ্যাচার বুঝতে পারেন। তদ্রূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন এবং মক্কা বিজয়ের সময় যেভাবে কাবা শরীফকে সব ধরনের ছবি ও মূর্তি থেকে মুক্ত করেছেন তা যাদের সহীহ হাদীস থেকে অধ্যয়ন করার কিংবা অন্তত নিবন্ধকারের উদ্ধৃতিগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ হয়েছে তাদেরও কোনো সন্দেহ থাকবে না যে, ঐ বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বিষয়টা তাদেরকে দলীল-প্রমাণ দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যাদের সামনে এই বিষয়গুলো নেই তারা ওই সীরাত-গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেখে বিভ্রান্তহওয়ার আশংকা রয়েছে।

এজন্য মূল কথাগুলো প্রথমে সংক্ষিপ্ত আকারে আরজ করছি:

১. আলফ্রেড গিয়োম ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’ অনুবাদ করেননি, করেছেন ইবনে হিশামকৃত ‘সীরাত’ এর অনুবাদ। যদিও প্রচ্ছদে সরাসরি ইবনে ইসহাকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু ভূমিকায় তিনি প্রকৃত কথাটা বলেছেন। ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরের ব্যক্তি। তার মৃত্যু ২১৮ হিজরী তে। অন্যদিকে ইবনে ইসহাকের জন্ম ৮০ হিজরীতে এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরীতে।

২. ঐ ঘটনা ইবনে ইসহাকের কিতাবুস সীরাতেও নেই, ইবনে হিশামের কিতাবুস সীরাতেও নেই। অনুবাদক অন্য জায়গা থেকে বর্ণনাটি সংগ্রহ করে সীরাতে ইবনে হিশামে জুড়ে দিয়েছেন।

৩. নিবন্ধকার ইংরেজি অনুবাদের ২০০৬ সালের সংস্করণের ৫৫২ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে নিজের পক্ষ থেকেও এমন কিছু কথা যোগ করেছেন যা ইংরেজি অনুবাদে নেই।

৪. সর্বশেষ কথা এই যে, ইংরেজি অনুবাদকের জুড়ে দেয়া বর্ণনা এবং হুমায়ূন সাহেবের নিজস্ব বক্তব্য আগাগোড়া বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

একটিমাত্র উদ্ধৃতিতেই যদি এত ‘কান্ড’ থাকে তবে তাকে কী বলা যায়? এবার বিস্তারিত শুনুন।

১. ইবনে ইসহাককে ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম জীবনীকার’ বলে দাবি করা ভুল। ইবনে ইসহাকের অনেক আগেই এ বিষয়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। কেননা, হাদীস শরীফ হল সীরাতের সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস আর হাদীস শরীফ গ্রন্থাকারে সংকলন শুরু হয়েছিল ইবনে ইসহাকের জন্মেরও আগে থেকে। দ্বিতীয়ত ইবনে ইসহাকের দাদা উস্তাদ উরওয়া ইবনুয যুবাইরও (জন্ম : ২২হি. মৃত্যু : ৯৪হি.) সীরাত-সংকলকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাহলে ইবনে ইসহাক প্রথম জীবনীকার কীভাবে হচ্ছেন?

ইবনে ইসহাকের পূর্বসূরীদের ‘মাগাযী’ শিরোনামে সংকলিত গ্রন্থগুলো মূলত সীরাত-গ্রন্থ। ইবনে ইসহাকের ‘সীরাত’কেও ‘কিতাবুল মাগাযী’ বলা হয়েছে। [দেখুন: সীরাতে ইবনে ইসহাক, তাহকীক : মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ (ভূমিকা ও গ্রন্থের সূচনা অংশ); তাহযীবু সীরাতে ইবনে হিশাম, আবদুস সালাম হারুন পৃ.৮; তাদবীনে সীরাত ওয়া মাগাযী, মাওলানা কাযী আতহার মোবারকপূরী, প্রকাশনা শায়খুল হিন্দ একাডেমী, দারুল উলূম দেওবন্দ; সীরাতুন্নবী, শিবলী নু’মানী (ভূমিকা অংশ)]

২. ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’ তার একাধিক শাগরিদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। তাদের একজন যিয়াদ আলবাক্কায়ী। এরই সূত্রে ইবনে হিশাম এই গ্রন্থ গ্রহণ করেছেন এবং সংযোজন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে তার সারসংক্ষেপ প্রস্ত্তত করেছেন।

অত্যন্ত আমানতদারীর সঙ্গে তিনি এই কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনাগুলোর সনদ ও মতন-(সূত্র ও বক্তব্য) হুবহু বর্ণনা করেছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে যা কিছু বাড়িয়েছেন তা ‘ক্বালা ইবনে হিশাম’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে হিশামের এই রচনা ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ নামে পরিচিত। যেহেতু সীরাতে ইবনে ইসহাকের পূর্ণ পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না তাই একেই সীরাতে ইবনে ইসহাকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আলফ্রেড গিয়োম এই রচনারই, অর্থাৎ সীরাতে ইবনে হিশামেরই অনুবাদ করেছেন এবং এতে সংযোজন-বিয়োজন করেছেন, তবে বিশ্বস্ততা রক্ষা করেননি। যেমন আগেও বলা হয়েছে যে, তিনি সীরাতে ইবনে হিশামকে সীরাতে ইবনে ইসহাক নামে পেশ করেছেন। তদ্রূপ এমন বর্ণনা তিনি এই গ্রন্থে সংযুক্ত করেছেন যা না মূল গ্রন্থে রয়েছে আর না সীরাতে ইবনে ইসহাকের কোনো পান্ডুলিপি বা মুদ্রিত সংস্করণে। আমাদের কাছে ইবনে ইসহাকের ওই গ্রন্থের তিনটি সংস্করণ রয়েছে, কোথাও বর্ণনাটি নেই।

খোদ ইংরেজি অনুবাদকও এই বর্ণনা ওই দুই গ্রন্থের কোনো মুদ্রিত সংস্করণে কিংবা পান্ডুলিপিতে পাননি। তাই তা বন্ধনীর মধ্যে রাখতে বাধ্য হয়েছেন এবং একেই এই সংযুক্তির বৈধতার পক্ষে যথেষ্ট মনে করেছেন। বিষয়টা অনুবাদের বিশ্বস্ততা ক্ষুণ্ণ করে কি না এ দিকে তিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি।

নিবন্ধকার যখন ইংরেজি অনুবাদ থেকে বর্ণনাটা গ্রহণ করেছেন তখন তার বলে দেওয়া অপরিহার্য ছিল যে, অনুবাদে এটা বন্ধনীর মধ্যে রয়েছে, অর্থাৎ বর্ণনাটা সীরাতে ইবনে হিশাম বা সীরাতে ইবনে ইসহাক কোনো গ্রন্থেই নেই।

৩. ইংরেজ অনুবাদক এই বর্ণনাটা আযরাকীকৃত ‘আখবারু মক্কা’ থেকে সংগ্রহ করে সীরাতে ইবনে ইসহাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অথচ আযরাকী ঘুণাক্ষরেও বলেননি যে, এই বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে। হাঁ, আযরাকীর সনদে ইবনে ইসহাক একজন বর্ণনাকারী হিসেবে রয়েছেন।

আযরাকী ইবনে ইসহাকের শাগরিদ নন, তার অনেক পরের। অতএব আযরাকী থেকে ইবনে ইসহাক পর্যন্ত যে সনদ তা-ও বিচার করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ইবনে ইসহাক এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তবুও এটা প্রমাণিত হয় না যে, এটা তার ‘কিতাবুস সীরাত’-এ রয়েছে? মানুষ সাধারণ আলাপচারিতায় প্রসঙ্গত কোনো ভিত্তিহীন বর্ণনা উল্লেখ করতে পারে (যেমন তার ভিত্তিহীনতা আলোচনার উদ্দেশ্যে) কিন্তু সেটাকে সে ‘সহীহ’ মনে করে না এবং তার রচনায় অন্তর্ভুক্ত করে না।

অনুবাদক এসব বিষয়ে মোটেও অসচেতন নন, কিন্তু যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক বর্ণনাটা এখানে সংযুক্ত করা তার কাছে অপরিহার্য বলে মনে হয়েছে!

৪. এখানে বিষয়টা শুধু এই নয় যে, দলীল-প্রমাণ ছাড়া একটা বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে; বরং আসলে অপরাধ এই যে, একটি মিথ্যা অপবাদ খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আরোপ করা হয়েছে।

৫. আযরাকীর (মৃত্যু : ২৪৭ হিজরীর পরে) রচনা ‘আখবারু মক্কা’ থেকে প্রথমে বর্ণনাটির সনদ ও পূর্ণ মতন লক্ষ্য করুন :

أخبرني محمد بن يحى، عن الثقة عنده، عن ابن اسحاق، عن حكيم بن عباد بن حنيف وغيره من أهل العلم، أن قريشا كانت قد جعلت في الكعبة صورا فيها عيسى بن مريم عليهما السلام، قال ابن شهاب : قالت أسماء بنت شعر : إن امرأة ن غسان حجت في حاج العرب، فلما رأت صورة مريم في الكعبة قالت : بأبي وأمي إنك لعربية، فأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يمحوا تلك الصور إلا ما كان من صورة عيسى ومريم.

এই বর্ণনার যে তরজমা গিয়োম করেছেন এবং যার উদ্ধৃতি আমাদের নিবন্ধকার দিয়েছেন তা এই :

I. I. From Hakim b.`Abbad b. Hanif and other traditionists : Quraysh had put picturers in the Ka’ba including two of Jesus son of Mary and Mary (on both of whom be peace!) 1. Shihab said : Asma’ b. Shaqr said that a woman of Ghassan joined in the pilgrimage of the Arabs and when she saw the picture of Mary in the Ka’ba she said, `My father and my mother be your ransom! You are surely an Arab woman!’ The apostle ordered that the pictures should be erased except those of Jesus and Mary.

আলোচিত নিবন্ধে এই অংশটুকুর যে অনুবাদ করা হয়েছে তা মূল ইংরেজি পাঠের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। সেখানে কি এ কথা আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারইয়াম রা.-এর ছবিতে হাত রেখেছিলেন? কিংবা এটা কি আছে যে, এই ছবি বাইতুল্লাহ শরীফে ৬৮৩ খৃ. পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল? তদ্রূপ এ কথাও তো নেই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টি হঠাৎ কা’বার মাঝখানের স্তম্ভে পড়ল, যেখানে মাদার মেরির একটি অপূর্ব ছবি আঁকা ছিল।

অথচ এই কথাগুলো নিবন্ধকার উপস্থাপন করেছেন গিয়োম-এর অনুবাদ ও সীরাতে ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে।

মূল আরবী গ্রন্থে-সীরাতে ইবনে ইসহাক ও সীরাতে ইবনে হিশামে-আদৌ এই বর্ণনা আছে কি না তা খুঁজে দেখা সম্ভব না হলে অন্তত ইংরেজি অনুবাদের উদ্ধৃতিতে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেওয়া কর্তব্য ছিল। প্রকাশক, প্রকাশনার সন এবং পৃষ্ঠানম্বর ইত্যাদি সব কিছু উল্লেখ করে এ ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন কি সাধারণ পাঠকের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে যায় না?

৬. আযরাকীর বর্ণনায় যে বিষয়টুকু পাওয়া যাচ্ছে আমরা প্রথমে তার উপর আলোচনা করব। এরপর নিবন্ধকার যা যোগ করেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে।

আযরাকী ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইবনে ইসহাক এই বর্ণনার কিছু অংশ হাকীম ইবনে আববাদ ইবনে হানীফ ও জনৈক অজ্ঞাত ব্যক্তির উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন, আর কিছু কথা ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে। ইবনে শিহাব সম্পর্কে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি কিছু কথা আসমা বিনতে শাকার এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন এবং কিছু কথা উদ্ধৃতি ছাড়া।

বর্ণনার এই অংশটুকু সঠিক যে, (জাহেলিয়াতের যুগে) বাইতুল্লাহয় মারইয়াম রা.-এর ছবি ছিল। বিভিন্ন সহীহ বর্ণনায় তা আছে। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর মারইয়াম রা.-এর ছবি না মুছে রেখে দেওয়া হয়েছিল, কিংবা (মাআযাল্লাহ) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা রেখে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন-এটা নির্জলা মিথ্যা।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুতাওয়াতির ও সুপ্রমাণিত শিক্ষা, তাঁর পবিত্র সীরাতের বাস্তব ঘটনাবলি এবং সহীহ ও মুত্তাছিল হাদীসসমূহের সুস্পষ্ট বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইনশাআল্লাহ পাঠকবৃন্দ তা দেখতে পাবেন।

এখন প্রশ্ন এই যে, এই অবাস্তব বিষয়টা কীভাবে, কার কল্যাণে ‘বর্ণনা’র রূপ লাভ করল? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য সনদ বিচার করতে হবে। সনদে একটি নাম আসমা বিনতে শাকার। সে এমনই অজ্ঞাতপরিচয় যে, আসমাউর রিজালের গ্রন্থে তার নামই পাওয়া যায় না। এরপর কোন সূত্রে সে গাসসানের ওই আগন্তুক মহিলার কথা জানতে পেরেছে তারও কোনো উল্লেখ নেই। ইবনে ইসহাককে স্বয়ং ইবনে শিহাব এই তথ্য দিয়েছেন এটা তিনি বলেননি। যদি ভিন্ন কোনো সূত্রে ইবনে শিহাবের বর্ণনা তিনি পেয়ে থাকেন তবে সেই মাঝের সূত্রটি কে তা ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেননি।

মোটকথা, সনদে যেমন শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে তদ্রূপ উল্লেখিত রাবীদের পরিচয়ও অজ্ঞাত। এধরনের বিচ্ছিন্ন ও অজ্ঞাত সূত্রে প্রাপ্ত বিবরণ দ্বারা দাবি প্রমাণের কাজ চলে না।

কথা এখানেই শেষ নয়। খোদ আযরাকী সম্পর্কেও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা তার সম্পর্কে বিস্তর তালাশ করেছি। একে তো তার সম্পর্কে আলোচনা খুব অল্প গ্রন্থেই পাওয়া যায়। এরপর যারা তার সম্পর্কে লিখেছেন তার সততা ও সত্যবাদিতা এবং তার স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ইমামদের কোনো মন্তব্য আনতে সক্ষম হননি। এজন্য খোদ আযরাকীরই সততা ও বিশ্বস্ততা অজ্ঞাত। আযরাকী থেকে ইবনে ইসহাক পর্যন্ত মাঝের দুটি সূত্রও সন্দেহযুক্ত। সবশেষে ইবনে ইসহাক সম্পর্কেও দেখার বিষয় এই যে, জরহ-তা’দীলের ইমামদের দৃষ্টিতে তাঁর অবস্থান কেমন?

একজন বর্ণনাকারীর কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তাকে সততা ও সত্যবাদিতা ছাড়াও উত্তম স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তির অধিকারী হতে হয়। এটা অপরিহার্য। এছাড়া তার মধ্যে তাদলীসের প্রবণতা থাকলে দেখতে হবে যে, যার উদ্ধৃতিতে তিনি বর্ণনা করেছেন তার নিকট থেকে সরাসরি ওই তথ্যটা গ্রহণ করেছেন কি না।

‘তাদলীস’ বলতে বোঝায়, একজন রাবী কোনো বিষয় কারো কাছ থেকে সরাসরি শোনেনি, অন্যের মাধ্যমে শুনেছে, কিন্তু বর্ণনার সময় মাঝের সূত্র গোপন রেখে পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর উদ্ধৃতি দিল, যার কারণে শ্রোতা মনে করে যে, কথাটা তিনি সরাসরি উদ্ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকেই শ্রবণ করেছেন। অথচ প্রকৃত অবস্থা এমন নয়। যেমন-ইয়াযীদ ইবনে জু’দুবা একটা তথ্য ইবনে ইসহাককে প্রদান করলেন ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে। ইবনে ইসহাক যদি কথাটা ইয়াযীদ ইবনে জু’দুবার নাম উল্লেখ করা ছাড়া ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন তাহলে তা হবে ‘তাদলীস’। বর্ণনাকারীদের পরিচয় ও সময়কাল সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা যেহেতু জানেন যে, ইবনে ইসহাক ছিলেন ইবনে শিহাবের শীষ্য তাই তাদের ধারণা হতে পারে যে, ইবনে ইসহাক তথ্যটা সরাসরি ইবনে শিহাব থেকেই নিয়েছেন। অথচ প্রকৃত বিষয় এমন নয়। ইবনে ইসহাকের সূত্র হল ইয়াযীদ ইবনে ইয়ায। সেই তাকে তথ্যটা সরবরাহ করেছে ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে।

মোটকথা, তাদলীস-প্রবণ বর্ণনাকারীর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একটি শর্ত এই যে, তিনি যার উদ্ধৃতি দিচ্ছেন তার নিকট থেকে সরাসরি শুনেছেন- এটা পরিষ্কার ভাষায় বলবেন।

বিষয়গুলো যেহেতু ইলমে উসূলে হাদীস ও ইলমে উসূলে ফিকহের স্বীকৃত ও সর্বসম্মত মূলনীতি এবং প্রাচ্যবিদ গবেষকরাও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন না তাই এ প্রসঙ্গে বরাত উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি না।

আলোচিত বর্ণনার বর্ণনাকারী ইবনে ইসহাকের মধ্যে তাদলীসের প্রবণতা ছিল এবং তার স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তিও আশানুরূপ ছিল না। তার এই দুর্বলতা দুটি সম্পর্কে জরহ-তা’দীলের (বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতা বিচার-পর্যালোচনা করার শাস্ত্র) ইমামগণ একমত। এবং উপরোক্ত কারণে তার বর্ণনার মধ্যে কিছু মুনকার (আপত্তিকর ও অবাস্তব) বিষয় ঢুকে পড়েছে-এটাও জরহ-তা’দীল ও ইলালুল হাদীসের ইমামগণের কাছে স্বীকৃত।

বরং অনেক বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত এই যে, কোনো দ্বীনী মাসআলা প্রমাণের জন্য একা ইবনে ইসহাকের বর্ণনা দলীল হতে পারে না। (সিয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭, পৃষ্ঠা : ৪১; মীযানুল ই’তিদাল খ : ৩, পৃ. ৪৭৫ দারুল ফিকর মিসর)

এখানে ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’কেই দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আমাদের সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণী প্রাচ্যবিদদের প্রভাবে একে সীরাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বলে মনে করলেও তারীখ, সীরাত ও হাদীসের বিশেষজ্ঞদের বিচারে কিন্তু তা নয়। তারা এই গ্রন্থকে মোটামুটিভাবে সীরাতের একটা ভালো তথ্যসূত্র মনে করেন সঙ্গে সঙ্গে এই সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেন যে, এতে মুনকার-মুনকাতে (বিচ্ছিন্ন ও অবাস্তব) বর্ণনাও বিদ্যমান রয়েছে। শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. মীযানুল ই’তিদাল গ্রন্থে (খ. ৩, পৃ. ৪৬৯) অভিযোগ করেছেন যে, ইবনে ইসহাকের ‘কিতাবুস সীরাত’-এ অনেক মুনকার বিষয় রয়েছে যেগুলোর সনদ ‘মুনকাতে’ (বিচ্ছিন্ন)। তদ্রূপ বিভিন্ন্ বানানো কবিতাও তাতে রয়েছে।

জরহ-তা’দীলের ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানের মন্তব্য উল্লেখ করে যাহাবী বলেন, ‘কাত্তান ইঙ্গিত করেছেন যে, সীরাতে ইবনে ইসহাক-এ কিছু ভিত্তিহীন কবিতা এবং কিছু মুনকাতে-মুনকার রেওয়ায়েত রয়েছে। সুতরাং গ্রন্থটির পরিমার্জিত সংস্করণ তৈরি হলে তা পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭. পৃষ্ঠা ৫২, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪০২ হি.)

দেখুন, বিশেষজ্ঞ মনীষীগণ যেখানে এই গ্রন্থের মুনকার বিষয়গুলো বাদ দিতে বলেছেন সেখানে গিয়োম অন্য স্থান থেকে আরো মুনকার বর্ণনা তাতে প্রক্ষেপণ করেছেন।

পাঠক অনুগ্রহপূর্বক আবার একবার বর্ণনার সনদটা লক্ষ করুন। দেখা যাচ্ছে যে, ইবনে ইসহাক হাকীম ইবনে আববাদ-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সরাসরি তার কাছ থেকে শুনেছেন-একথা বলেননি। তদ্রূপ ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সেখানেও সরাসরি শোনার কথা নেই। ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, ইবনে ইসহাক তাদলীস-প্রবণতার শিকার ছিলেন এবং ধরন ও পরিমাণ কোনো দিক থেকেই তা সামান্য ছিল না।

বিশেষজ্ঞ ইমামগণ স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন যে, অনির্ভরযোগ্য ও অজ্ঞাতপরিচয় লোকেরা বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য লোকের উদ্ধৃতিতে যেসব তথ্য বর্ণনা করত তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং বর্ণনা করার সময় মধ্যবর্তী সূত্র গোপন রেখে সরাসরি ওই নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির বিবরণ বলে বর্ণনা করতেন। অর্থাৎ তার সনদে জয়ীফ বা মাজহুল রাবী বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তিনি তা গোপন রেখেছেন। তো যে তাদলীসের উদ্দেশ্য সনদ থেকে অনির্ভরযোগ্য রাবী বাদ দিয়ে বাহ্যত ওই সনদকে ‘সহীহ’ বলে প্রকাশ করা তা কত মারাত্মক বিষয় হতে পারে-তা তো বলাই বাহুল্য। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় বহু মুনকার বিষয় এই পথেই অনুপ্রবেশ করেছে।

জরহ-তা’দীলের ইমাম ইবনে হিববান বুসতী (মৃত্যু : ৩৫৪ হিজরী) ইবনে ইসহাকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করার পর লেখেন, ‘তার সমস্যাটা হল, তিনি জয়ীফ রাবীদের নিকট থেকে রেওয়ায়েত শুনতেন এবং তাদের নাম গোপন রেখে বর্ণনা করতেন। এজন্য তার বর্ণনায় বিভিন্ন মুনকার বিষয় অনুপ্রবেশ করেছে।’ (কিতাবুছ ছিকাত খ. ৭, পৃ. ৩৮৩ হায়দারাবাদ, প্রথম সংস্করণ ১৩৯৩ হি.)

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (মৃত্যু : ৮৫২ হি) লেখেন, ‘ইবনে ইসহাক নিজে সত্যবাদী। তবে জয়ীফ, মাজহুল ও তারও নীচুস্তরের রাবীদের কাছ থেকে বর্ণনা সংগ্রহ করতে এবং তাদের নাম গোপন রেখে বর্ণনা করতে অভ্যস্ত। এই তাদলীস-প্রবণতায় তিনি প্রসিদ্ধ। ইমাম আহমদ, ইমাম দারাকুতনী প্রমুখ তার এই প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। (তা’রীফু আহলিত তাকদীস বিমারাতিবিল মওসূফীনা বিত তাদলীস নং ২২৯)

ইমাম ইবনে হাজার রাহ. ঐ গ্রন্থে তাদলীসকারীদের যে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন তাতে তাকে অন্তর্ভু&ক্ত করেছেন চতুর্থ শ্রেণীতে, যাদের ব্যাপারে তার রায় এই যে, এদের বর্ণনায় যদি উদ্ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণ করে বর্ণনা করার কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া না যায় তবে সর্বসম্মতিক্রমে তা অগ্রহণযোগ্য।

ইমাম ইয়াকুব ইবনে শাইবা (মৃত্যু : ২৬২ হি.)ও তাকে ‘সদূক’ (সত্যবাদী) বলে মন্তব্য করার পর লেখেন, তার সমস্যাটা হল তিনি মাজহুল (অজ্ঞাতপরিচয়) রাবীদের থেকে বাতিল (ভিত্তিহীন) কথা বর্ণনা করে থাকেন। (সীয়ারু আলামিন নুবালা খ : ৭, পৃ. ৪৩)

আলোচিত বর্ণনাও তার ওই ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সামনের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হবে ইনশাআল্লাহ।

৭. ইবনে ইসহাক যেহেতু এই কথাটা ইবনে শিহাব থেকে সরাসরি শুনেছেন বলে উল্লেখ করেননি, অর্থাৎ ‘আমি ইবনে শিহাবকে বলতে শুনেছি’ বাক্য ব্যবহার না করে ‘ইবনে শিহাব বলেছেন’ ব্যবহার করেছেন তাই তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, ইতোপূর্বে বলা হয়েছে, তিনি ওই সব তাদলীসকারীর অন্তর্ভুক্ত যাদের প্রত্যক্ষ শ্রবণের উল্লেখবিহীন বর্ণনা সর্বসম্মতভাবে অগ্রহণযোগ্য।

রেওয়ায়েতের বিচার-বিশ্লেষণ সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তারা যদি আযরাকীর ‘আখবারু মক্কা’ গ্রন্থের পৃ. ১৬৮-এর শেষ প্যারা এবং পৃ. ১৬৯-এর প্রথম প্যারাটুকুই মনোযোগ সহকারে লক্ষ করেন তবে তাদের বুঝতে বাকি থাকবে না যে, এই রেওয়ায়েতে ইবনে ইসহাক ও ইবনে শিহাবের মধ্যে ইয়াযীদ ইবনে ইয়ায ইবনে জু’দুবা বা এ ধরনের আরো কোনো মাতরূক-মুত্তাহাম (পরিত্যক্ত ও মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত) রাবী বিদ্যমান ছিল, যার নাম ইবনে ইসহাক তাদলীসের পন্থায় গোপন করেছেন। এই ইয়াযীদ এজন মাতরূক ও মুত্তাহাম রাবী। তিনি ইবনে ইসহাকের সমসাময়িক এবং দু’জনের আবাসও ছিল একই শহরে। [মীযানুল ই’তিদাল, শামসুদ্দীন যাহাবী (মৃত্যু : ৭৪৮ হি.) খ : ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৬-৪৩৮; তারীখু বাগদাদ, খতীব বাগদাদী (মৃত্যু : ৪৬৩ হি.) খ : ১৪, পৃষ্ঠা ৩৩২ মাকতাবাতুল খানজী, কায়রো; আলকামিল ইবনে আদী (মৃত্যু : ৩৬৫ হি.) খ : ৭, পৃষ্ঠা : ২৬৪ তৃতীয় সংস্করণ ১৪০৯ হি.]

৮. তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ইবনে শিহাব এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আচ্ছা, ধরে নেওয়া হল তিনি তা বর্ণনা করেছেন! তখন প্রশ্ন হবে যে, তিনি কি মক্কাবিজয়ের সমসাময়িক? সবাই জানেন যে, মক্কাবিজয় ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হয়েছে আর ইবনে শিহাব জন্মগ্রহণ করেছেন ৫০ হিজরীতে। তিনি রেওয়ায়েতের উপযু্ক্ত হতে হতে মক্কাবিজয়ের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, ইবনে শিহাব এই তথ্য কার কাছ থেকে পেয়েছেন?

এখানে কেবলই শূন্যতা বিরাজ করছে। ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি অনুযায়ী ইবনে শিহাব তা বর্ণনা করেছেন বলে ধরে নিলেও দেখা যাচ্ছে, তিনি এই তথ্যের কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি। বিনাসূত্রে কেবল একটি দাবিমাত্র। এরপর সনদের অন্যান্য ত্রুটিগুলো তো রয়েছেই।

৯. নিবন্ধকার যদি মূল আরবী গ্রন্থের সহায়তা নিতে পারতেন তবে সম্ভবত তিনি সরাসরি আযরাকীর ওই কিতাবটা খুলে দেখতেন। সেক্ষেত্রে টীকাকার রূশদী ছালেহ সন্নিবেশিত দীর্ঘ টীকাও তার নজরে পড়ত। রূশদী ছালেহ পরিষ্কার ভাষায় আলোচনা করেছেন যে, আযরাকীর কোনো কোনো বর্ণনায় ঈসা আ. ও তাঁর জননীর ছবি না মোছার যে বিবরণ আছে তা প্রক্ষিপ্ত। সহীহ ও সঠিক বর্ণনাগুলোতে এই কথা নেই; বরং সকল ছবি মুছে ফেলার সুস্পষ্ট বিবরণ এসেছে। নিঃসন্দেহে আযরাকীর ওই বর্ণনা বাতিল ও মাতরূক (পরিত্যাক্ত ও ভিত্তিহীন)।

রুশদী ছালেহ লেখেন, প্রথমত ওই দুই ছবি আলাদা রাখার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো হারামকে বহাল রাখার আদেশ করা তো দূরের কথা, এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর শরীয়তে প্রাণীর ছবি সংরক্ষণ হারাম, যা অসংখ্য হাদীস শরীফদ্বারা প্রমাণিত।

তৃতীয়ত প্রক্ষিপ্ত অংশটি এ বিষয়ক অনেক সহীহ হাদীসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি এই বলে তার দীর্ঘ আলোচনার সমাপ্তি টেনেছেন যে, এই বিষয়গুলো অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রক্ষিপ্ত অংশটুকুর স্বরূপ প্রকাশ করে। (আখবারু মক্কা পৃষ্ঠা : ১৬৫-১৬৬ টীকা : ১, মাকতাবাতুছ ছাকাফা, অষ্টম সংস্করণ ১৪১৬ হি.)

বাইতুল্লাহকে চিত্র ও মূর্তি থেকে পবিত্র করার বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদক্ষেপ

এবার আমরা পাঠকবৃন্দের সামনে সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যাদির মাধ্যমে এই বিষয়টা পেশ করতে চাই যে, মক্কাবিজয়ের সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ ও তার চারপাশ থেকে কত গুরুত্বের সঙ্গে সকল ধরনের মূর্তি ও প্রাণীর প্রতিকৃতি অপসারণ করেছেন এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া কীভাবে সকল ছবি, মূর্তি ও ভাস্কর্য বিলুপ্ত করেছেন।

কা’বার বাইরে যে তিনশত ষাটটি মূর্তি স্থাপিত ছিল সেগুলোর ক্ষেত্রে তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই মু’জিযা প্রকাশ পেয়েছিল যে, তাঁর হাতের লাঠির শুধু ইশারার দ্বারাই সেগুলো ভূপাতিত হয়ে যাচ্ছিল। আর যে মূর্তিগুলো বিভিন্ন স্থানে রাখা ছিল তা তিনি বের করে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। কা’বার বিভিন্ন স্তম্ভে এবং ভিতরের ও বাইরের দেয়ালে যত ছবি অঙ্কিত ও খোদিত ছিল সব মুছে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় একাধিক ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর আদেশে সকল চিত্র মুছে ফেলা হয় এবং এ সংবাদ জানানোর পর তিনি বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে খোদিত ছবিগুলো মুছে ফেলার পরও কিছু কিছু দৃষ্টিগোচর হচ্ছে দেখে পুনরায় ভালোভাবে মোছার আদেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে ডলে ডলে সমান করার চেষ্টা করলেন। এরপরও যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেগুলোতে জাফরানের রং লাগিয়ে দিলেন। কিছু কিছু খোদিত চিত্রে মাটির লেপ দিয়ে জাফরানের রং লাগানো হল। এই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

এবার হাদীসগুলো লক্ষ করুন। সবগুলো হাদীসই মানের বিচারে ‘সহীহ’ বা ‘হাসান’ পর্যায়ে উন্নীত এবং সনদ মুত্তাছিল ও অবিচ্ছিন্ন।

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন তখন বাইতুল্লাহর আশে পাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি বিদ্যমান ছিল। তিনি প্রত্যেক মূর্তির দিকে হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করছিলেন এবং বলছিলেন:

جاء الحق وزهق الباطل، إن الباطل كان زهوقا، جاء الحق وما يبدئ الباطل وما يعيد.

সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। সত্য আগমন করেছে আর মিথ্যা না পারে কোনো কিছু সূচনা করতে, না পারে পুনরাবৃত্তি করতে। (সহীহ বুখারী হা. ২৪৭৮, ৪২৮৭, ৪৭২০; সহীহ মুসলিম হা. ১৭৮১)

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর বর্ণনায় এসেছে যে, লাঠির শুধু ইঙ্গিতের দ্বারাই মূর্তিগুলো ধরাশায়ী হচ্ছিল।

[সীরাতে ইবনে হিশাম খ : ৭, পৃষ্ঠা : ১১৪ (আররওযুল উনুফ-এর সঙ্গে মুদ্রিত সংস্করণ) তারীখুল ইসলাম শামসুদ্দীন যাহাবী খ : ২ পৃষ্ঠা : ৩১৮ ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে, দি লাইফ অব মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুবাদে আলফ্রেড গিয়োম পৃ. ৫৫২]

এই কথাটা হযরত জাবির রা-এর হাদীসেরও এসেছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হাদীস : ৩৮০৬)

৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন বাইতুল্লাহ্য় মিথ্যা উপাস্যদের থাকা অবস্থায় তাতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তাঁর আদেশে ওই মূর্তি ও প্রতিকৃতিগুলো বের করা হল। এগুলোর মধ্যে ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এরও প্রতিকৃতি ছিল। তাঁদের হাতে ছিল ভাগ্যনির্ধারণী শর! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন, তাদের জানা ছিল যে, এই দুইজন কখনও শর দ্বারা ভাগ্যগণনার চেষ্টা করেননি। (সহীহ বুখারী হা. ৪২৮৮,১৬১৯; সুনানে আবু দাউদ হা. ২০২০)

উল্লেখ্য যে, এই হাদীসে প্রতিকৃতিসমূহকে মিথ্যা উপাস্য বলা হয়েছে। ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর প্রতিকৃতি পূজার মূর্তি ছিল না।

দেয়ালে ও স্তম্ভে অঙ্কিত ছবি

৪. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইতুল্লাহতে বিভিন্ন প্রতিকৃতি দেখলেন তখন তাতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং সেগুলো বিলুপ্ত করার আদেশ দিলেন। তাঁর আদেশে সেগুলো মুছে দেওয়া হয়। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৫২; সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৬১)

৫. জাবির রা. থেকে বর্ণিত, মক্কাবিজয়ের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাব রা.কে আদেশ দিলেন, তিনি যেন কাবা ঘরের সব ছবি মুছে ফেলেন। সকল ছবি মোছার আগ পর্যন্ত তিনি কাবায় প্রবেশ করেননি। (সুনানে আবু দাউদ হা. ৪১৫৩; সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৫৭; তবাকাতে ইবনে সা’দ খ : ২, পৃষ্ঠা : ৩২০ আরো দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা খন্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৪৭৯ হা. ৪/৩৮০৭৪)

যে ছবিগুলো মোছার পরও কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিল তার উপরও তিনি আপত্তি করেছেন এবং ভালোভাবে মোছার কাজে নিজেও অংশগ্রহণ করেছেন।

৬. আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্য় প্রবেশ করে ইবরাহীম আ. ও মারইয়াম রা.-এর ছবি দেখলেন। তখন তিনি বললেন, এঁরা তো (যাদের চিত্র এই লোকেরা অঙ্কন করেছে) (আল্লাহর এই বিধান) শুনেছেন যে, ফেরেশতারা সে গৃহে প্রবেশ করেন না, যাতে কোনো চিত্র থাকে। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৫১;সহীহ ইবনে হিববান হা. ৫৮৫৮)

অর্থাৎ চিত্র সম্পর্কে এঁরা কখনও সম্মত থাকতে পারেন না। অথচ জাহেলরা তাঁদেরই প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। এই বর্ণনায় মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতির উপরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপত্তি জানিয়েছেন। এরপরও তিনি তা বহাল রাখতে বলবেন?

৭. উসামা রা. বলেন, আমি কাবা ঘরের ভিতরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলাম। তখন কিছু চিত্র তার দৃষ্টিগোচর হল। তিনি এক বালতি পানি আনতে বললেন। আমি পানি উপস্থিত করলাম। তিনি তখন ছবিগুলো মুছতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন-

قاتل الله قوما يصورون ما لا يخلقون

‘আল্লাহ তাদের বিনাশ করুন যারা এমন কিছুর ছবি অঙ্কন করে যা তারা সৃষ্টি করতে পারে না।’

(মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী পৃ. ৮৭; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হা. ৩৮০৬৫; শরহু মাআনিল আছার তহাবী খন্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩৮৩; আলআহাদীসুল মুখতারা, জিয়াউদ্দীন মাকদেসী-সূত্র : সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, নাসীরুদ্দীন আলবানী খ. ২, পৃ. ৭৩১; আনীসুস সারী ফী তাখরীজি আহাদীসি ফাতহিল বারী, নাবীল ইবনে মানসূর খ : ৪, পৃষ্ঠা : ৩০৬৮)

যে প্রতিকৃতিগুলো মোছার চেষ্টা সত্ত্বেও পুরোপুরি মোছা যায়নি তার উপর জাফরানের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল।

৮. জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্য় প্রবেশ করে দুই রাকাত নামায পড়লেন। সেখানে ইবরাহীম আ., ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর প্রতিকৃতি দৃষ্টিগোচর হল। তারা ইবরাহীম আ.-এর হাতে ভাগ্যনির্ধারণী ‘শর’ স্থাপন করেছিল, যেন তিনি সেগুলোর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করছেন! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা ওই মূর্খদের বিনাশ করুন, ইবরাহীম আ. তো কখনও শর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করেননি!

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফরান আনতে বললেন এবং সেগুলোর উপর জাফরানের প্রলেপ দিয়ে দিলেন।

فلطخه بتلك التماثيل

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা হা. ৩৮০৬০; মুসনাদে ইবনে আবী শাইবা- আলমাতালিবুল আলিয়া ইবনে হাজার আসকালানী হাদীস : ৪৩০৩)

৯. একই বিবরণ মুসাফে ইবনে শাইবার বর্ণনাতেও এসেছে।

মুসাফে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাইবা রা.কে বললেন-

اكفني هذه

এই বিষয়টা সমাধা কর। কিন্তু কাজটা ছিল কঠিন। (কেননা, কিছু ছবি সহজে মোছা যাচ্ছিল না) একজন পরামর্শ দিলেন যে, এগুলোতে মাটির প্রলেপ দিয়ে উপরে জাফরানের রং লাগিয়ে দাও। পরে তাই করা হল। (তারীখুল ইসলাম, শামসুদ্দীন যাহাবী খন্ড : ২ পৃষ্ঠা : ৩১৯)

মোটকথা, হাদীস ও ইতিহাসের স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে অসংখ্য সূত্রে যেসব তথ্য এসেছে, নিবন্ধকার সেগুলো পরিত্যাগ করেছেন এবং আযরাকীর একটি কাহিনীগ্রন্থের ভিত্তিহীন বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্তে কিছু ছবি বহাল রেখেছিলেন! বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক।

ধারণা করা যায় যে, ঈসা আ. ও তাঁর জননী মারইয়াম রা.-এর ছবি খোদিত ছিল, যা মাটি ও জাফরান দ্বারা লেপে দেওয়া হয়েছিল। কালক্রমে কোনো কোনো স্থান থেকে সেই প্রলেপ খসে পড়লে নীচের খোদিত ছবি প্রকাশিত হয়ে যায়। এই অবস্থাটা যাদের দৃষ্টি-গোচর হয়েছে তারা বর্ণনা করেছেন যে, বাইতুল্লাহর স্তম্ভে ঈসা আ. ও মারইয়াম রা.-এর ছবি দেখেছি। জিজ্ঞাসা করা হল, এখন সেগুলো কোথায়? উত্তরে বলেছেন, ৬৪ হিজরীর অগ্নিকান্ডে ভস্মিভূত হয়ে গেছে।

নিবন্ধকার সম্ভবত কোনো সূত্র থেকে এই বর্ণনাটা জেনেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন যে, এই ছবি ৬৮৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাইতুল্লাহর শোভাবর্ধন করছিল এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও তা বাইতুল্লাহ্তে বিদ্যমান ছিল!

বলাবাহুল্য, এটা নিছক একটা কল্পনা। যে দু’একজন বলেছেন যে, আমরা বাইতুল্লায় অমুক অমুকের ছবি দেখেছি তারা একই সঙ্গে একথাও বলেছেন যে,

واراهما والطمس عليها

ওই ছবিগুলো যে মোছা হয়েছিল তা দেখা যাচ্ছিল। (আযরাকী পৃ. ১৬৮)

পরিষ্কার কথা যে, মাটি ও জাফরান লাগিয়ে বিলুপ্ত করার পর যখন কোনো কোনো স্থান থেকে তা খসে পড়েছিল তখন তা দৃষ্টিগোচর হয়। তাহলে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এই ছবি ছিল, কিন্তু তা ছিল মাটি ও জাফরানের প্রলেপের নীচে।

এই হল প্রকৃত অবস্থা। কিন্তু একেই তারা বানিয়েছেন যে, এই ছবি-নাউযুবিল্লাহ-অমুক সন পর্যন্ত বাইতুল্লাহর শোভাবর্ধন করছিল!

বাইতুল্লাহ তো আল্লাহর ঘর, মসজিদ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো নিজের ঘরেও ছবি রাখা বরদাশত করতেন না। সহীহ বুখারীতে (৫৯৫২) হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে-

لم يكن يترك في بيته شيئا فيه التصاليب إلا نقضه، وفي نسخة : تصاوير

‘তিনি তাঁর ঘরে ছবি অঙ্কিত কিছু দেখলে তা বিনষ্ট করে দিতেন।’

একবার মদীনাতে হযরত আলী রা. কে পাঠালেন যে, যেখানেই কোনো ছবি দেখবে তা মুছে দিবে। -সহীহ মুসলিম ৯৬৯

যিনি ঘরে-বাইরে কোথাও ছবি রাখার অনুমোদন দেননি; বরং তা মুছে ফেলার আদেশ করেছেন, তিনি বাইতুল্লাহতে কোনো ছবি, বিশেষত নারীর ছবি বহাল রাখতে বলবেন যেখানে শুধু ছবিই নয় পর্দাহীনতাও রয়েছে?

আয়েশা রা. বলেছেন, বাইয়াত গ্রহণের সময় তাঁর হাত কখনও কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মৌখিক বাইয়াত নিতেন।

উম্মে আতিয়্যা রা. বলেছেন, এ মৌখিক বাইআত পর্দার আড়াল থেকে বা অন্য কারো মাধ্যমে নেওয়া হত। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৯১; সহীহ মুসলিম হা. ৪৯৭৯; ফাতহুল বারী ৮/৫০৫ দারুর রায়্যান, কায়রো, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪০৭ হি.)

তো তাঁর সম্পর্কে এ মিথ্যাচার করা যে, সকল চিত্র মোছার আদেশ দিয়েও শুধু একজন নারীর ছবির উপর তিনি হাত রেখেছেন এবং না মোছার অনুরোধ করেছেন কতখানি ন্যক্কারজনক হতে পারে!

খোলাফায়ে রাশেদীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। এটা তো হতেই পারে না যে, চিত্র সম্পর্কে তাঁর এই সকল সতর্কবাণী জানা সত্ত্বেও তারা এ বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিবেন।

মক্কা বিজয়ের সময়েরই আরেকটি ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহকে মুশরিকদের সকল নিদর্শন থেকে পবিত্র করার পর কিছুক্ষণ তাতে অবস্থান করে যখন বের হলেন তখন উছমান ইবনে তলহা (যাঁর কাছে কাবার চাবি ছিল) তাকে ডেকে বললেন, আমি তোমাকে ওই শিং দু’টি ঢেকে দেওয়ার আদেশ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভুলে গিয়েছি। সেগুলো ঢেকে দিও। ঘরে এমন কোনো বস্ত্ত থাকা উচিত নয়; যা নামাযীর মনোযোগ বিনষ্ট করে।

لا ينبغي أن يكون في البيت شيء يشغل المصلي

(সুনানে আবু দাউদ হা. ২০২৩; মুসনাদে আহমদ হা. ১৬৬৩৭; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হা. ৯০৮৩; আসসুনানুল কুবরা বায়হাকী খ : ২, পৃষ্ঠা : ৪৩৮)

এই হাদীসটি সহীহ। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, শিং দু’টি ছিল ওই দুম্বার, যা ইসমাঈল আ.-এর বদলে হযরত ইবরাহীম আ. কুরবানী করেছিলেন।

শিং দুটো ঢেকে দেওয়ার আদেশ যিনি করছেন তিনি নারীর ছবি রেখে দিতে বলবেন?

সবশেষে বিনয়ের সঙ্গে একটি প্রশ্ন করতে চাই যে, আপনাদের ধারণায় যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চিত্র ও ভাস্কর্যের মধ্যে আপত্তির কিছু না থেকে থাকে তাহলে অন্য সব চিত্র মুছে ফেলার আদেশ কেন দেওয়া হল? সেগুলোও থাকত অন্তত মিল্লাতে ইবরাহীম-এর ইমাম হযরত ইবরাহীম আ.-এর প্রতিকৃতিটা অক্ষত থাকত, শুধু তার হাতে যে ভাগ্য-শর মূর্খেরা স্থাপন করেছিল সেটা বাদে?

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, একটি ভিত্তিহীন বর্ণনাকে তারা এভাবে অবলম্বন করছেন! যদি প্রকৃতপক্ষেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আদর্শ হয়ে থাকেন তবে তাঁর জীবনাদর্শ ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে নয়, বিশুদ্ধ ও সহীহ বর্ণনা থেকে গ্রহণ করা কর্তব্য। সকল সহীহ হাদীসের বক্তব্য এ বিষয়ে অভিন্ন যে, মক্কাবিজয়ের সময় বাইতুল্লাহর ভিতরে-বাইরে এবং চারপার্শ্বে না কোনো মূর্তি অবশিষ্ট রাখা হয়েছিল না কোনো চিত্র।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে চিত্র ও চিত্রকর

পাঠকবৃন্দ ওই সহীহ হাদীসগুলোর উপর একবার নজর বুলাতে পারেন যেগুলোতে চিত্র ও চিত্রকর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে।

১. হযরত আমর ইবনে আবাসা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে।’ (সহীহ মুসলিম হা. ৮৩২)

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إن الذين يصنعون هذه الصور يعذبون يوم القيامة يقال لهم : أحيوا ما خلفتم.

‘যারা এই সব প্রতিকৃতি প্রস্ত্তত করে তাদেরকে কিয়ামতের দিন আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা সৃষ্টি করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার কর।’ (সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫১; সহীহ মুসলিম হা. ২১০৭)

৩. মুসলিম ইবনে সুবাইহ্ বলেন- ‘আমি মাসরূকের সঙ্গে একটি ঘরে ছিলাম যেখানে মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতি ছিল। মাসরূক জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি কিসরার প্রতিকৃতি? আমি বললাম, না, এটি মারইয়াম রা.-এর প্রতিকৃতি। তখন মাসরুক বললেন-

سمعت عبد الله ابن مسعود يقول : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أشد الناس عذابا يوم القيامة المصورون.

আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে (রা.) বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতিকৃতি প্রস্ত্ততকারীরা কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন আযাবের মুখোমুখি হবে। (সহীহ মুসলিম হা. ২১০৯)

৪. আবু যুরআ রাহ বলেন-

دخلت مع أبي هريرة في دار مروان، فرأى فيها التصاوير، فقال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : قال الله عز وجل : ومن أظلم ممن ذهب يخلق خلقا كخلقي فليخلقوا ذرة، وليخلقوا حبة، أو ليخلقوا شعيرة.

আমি আবু হুরায়রা রা.-এর সঙ্গে মারওয়ানের গৃহে প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছু চিত্র তাঁর দৃষ্টিগোচর হল। তিনি তখন বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন-

ومن أظلم ممن ذهب يخلق خلقا كخلقي

ওই লোকের চেয়ে বড় জালেম আর কে যে আমার সৃষ্টির মতো কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চায়। (তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তবে) সৃষ্টি করুক একটি কণা, একটি শষ্য কিংবা একটি যব! (সহীহ মুসলিম হা. ২১১১; সহীহ বুখারী হা. ৫৯৫৩)

৫. হযরত আবু তলহা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاوير

‘ওই গৃহে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না যাতে কুকুর বা ছবি রয়েছে।’ (সহীহ বুখারী ৫৯৪৯; সহীহ মুসলিম হা. ২১০৬)

৬. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تدخل الملائكة بيتا فيه تماثيل أو تصاوير

‘ফেরেশতারা ওই ঘরে প্রবেশ করেন না যাতে মূর্তি বা ছবি রয়েছে।’ (সহীহ মুসলিম ২১১২)

৭. আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন-

سمعت محمدا صلى الله عليه وسلم يقول : من صور صورة في الدنيا كلف يوم القيامة أن ينفخ الروح وليس بنافخ.

আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, যে কেউ দুনিয়াতে à