বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


মুফতী আমিনী: বীর মরে একবার কাপুরুষ মরে হাজার বার

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ
লেখক, গবেষক ও মুহাদ্দিস

অবিসংবাদিত বুযুর্গ হজরত আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী ছিলেন বাংলাদেশের এক ইতিহাস, এক আদর্শ ও হায়দরী হুংকারের এক প্রোজ্জ্বল প্রতীক। এ প্রতীক ছিল হক ও হক্কানিয়্যাতের প্রতীক; আস্থাশীলতা ও মানবতা বোধের প্রতীক; ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধার্মিকতার প্রতীক।

এ প্রতীকের ছায়াতলে আশ্রয় পেয়েছে বাংলার মানুষ। বাঙ্গালী হিন্দু মুসলিম এখানে আস্থার হাতছানি পেয়েছে এক দীর্ঘকাল। মানবতা বিরুদ্ধ বাতিল শক্তি যখনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই চিরঅকুতভয় মর্দে মুমিন গর্জে উঠেছে সিংহের দোলায়িত কেশর নিয়ে। কী মহান দুর্দমনীয় সিপাহসালার!

দীন ও শরীঅত বিরোধী কোন কিছুর সাথে আপোষ করে চলা যার ভেতরে আসেই না কখনো। শেষ রাতের সেহেরগাহীতে মহান আল্লাহর সমীপে যারযার কান্নায় ভিজে থাকতো যেই চোখ সেই চোখকে বাতিলের হিংস্র থাবা একবারের জন্যও কাঁদাতে পারেনি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু মানুষের আসে; সবাইকে মরতে হয়; কিন্তু বীর মরে একবার কাপুরুষ মরে হাজার বার। কোন সন্দেহ নেই, ইসলাম ও মানবতার স্বার্থ সংরক্ষণে নিবেদিত ইতিহাসের এই বীর সৈনিকরা যুগে যুগে জাগ্রত আছে বলেই আজো টিকে আছে খোদার আসমান ও জমিন। নইলে জুলুম নিপীড়নের ভারে কত আগেই তা খতম হয়ে ঘটে যেত কিয়ামতের মহাপ্রলয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এই দ্বীন সংরক্ষণের জন্য মনোনীত মানুষের একটা দল সব সময় থাকবে। মহান আল্লাহ তাদের নুসরত করে যাবেন। বাতিল তাদের কখনো নির্মূল করতে সক্ষম হবে না। আঘাতের পর আঘাত মোকাবেলা করে তারা হককে ধরে রাখবে বজ্রকঠিন হাতে।

হাদিসে মহানবী সা. যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলো- তায়িফাতুম মিন উম্মাতি- যা থেকে বুঝা যায়, সেই দলটির মধ্যে সদস্য সংখ্যা বিপুল হবে তা নয়। বরং স্বল্প সংখ্যক, বরং গুটি কতেক মানুষের একটি দল হবে। তবে তারা থাকবে হায়দরী শক্তিতে বলীয়ান।

ইতিহাস প্রমাণ করে, উপমহাদেশের মাটিতে এ দলটি একবার জেগে উঠেছিল মোঘল সম্রাট আকবরের যুগে; যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুজাদ্দিদে আলফে ছানী। আবার জেগে উঠেছিল ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠা লগ্নে; যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হযরত শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলবী।

আবার জেগে উঠেছিল ১৮৫৭ সালে; যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী। এভাবে সকল যুগেই আল্লাহর মনোনীত এই দলটি তাদের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আলোচ্য হাদীস থেকে আরো বুঝা যায়, হকের নিশান বরদার এই তায়িফার আগমন অব্যাহত থাকবে ইমাম মাহদী পর্যন্ত।

তবে এই তায়িফা কে বা কারা সেটি কারো জীবনকালে নির্দেশ করা সুকঠিন। শরিঅতে এ বিষয়ে অনুমতিও নেই। কেননা হাদীসে বলা আছে, ফাইন্নাল হাইয়া লা তু-মানু আলাইহিল ফিতনা। অর্থাৎ কাউকে তার জীবনকালে পদস্খলন থেকে বিমুক্ত থাকবেন এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। মওতের পরে কে কি ছিলেন তার সব কিছু পরিষ্কার হয় স্পষ্টভাবে।

আমাদের দেশেও সেই আশীষপুষ্ট তায়িফা নিঃসন্দেহে অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তারা কারা, কে তাদের দলনেতা; এ সব ঠিক কিছুই বলার সুযোগ নেই।

আমরা হজরত মুফতী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির নির্মোহ জীবন দেখেছি, তাঁর ইলমী উচ্চাসন দেখেছি, ওরাসাতের নবুওয়াতের দায়িত্ববোধ দেখেছি, নির্ভীক ব্যাঘ্র হুংকার দেখেছি, শেষ রজনীর বুকফাটা রোনাজারী দেখেছি, মৃত্যু পরবর্তী জানাযার দৃশ্য দেখেছি, তাঁর জানাযায় আলেম উলামার অকল্পনীয় স্রোত দেখেছি, জানাযার নামাযে প্রতিটি মানুষের চোখের পানি দেখেছি, আরো দেখেছি বৃষ্টির আকারে আকাশের কী বিরল আহাজারী।

উহ উপস্থিত মানুষের এ কী মাতম; যেন কোন মহামহীরুহ হঠাৎ ভেঙ্গে পড়েছে আর তার ছায়ায় অবস্থিত মানুষগুলো অতর্কিত ছায়াহীনতার শোকে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। বলুন! এসব কিসের আলামত? কোন জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই মনে বার বার প্রশ্ন জাগে তবে তিনি বস্তুত কে ছিলেন, কি ছিলেন.., তাকবীনে ইলাহীর রেকর্ডে তার কি পরিচয় লেখা ছিলো?

একটি স্বপ্ন থেকে তাঁর সম্পর্কীয় এসব প্রশ্নের উত্তর আমি সহজে পেয়ে গিয়েছি। স্বপ্নটি দেখেন আমার এক বন্ধু। তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড রেলগেটের বাসিন্দা। নাম সরদার মুসলেহ উদ্দীন মূসা। আমার খুব ঘনিষ্ঠজন। আমাদের দাওয়াত ও তাবলীগের সাথী। ব্যক্তি জীবনে তিনি একজন বিদআত বিদ্বেষী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা।

শরয়ী বিধি-বিধানের খুবই পাবন্দ। জামাআতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাক্কা মুসল্লী। ধর্মীয় প্রায় সকল বিষয় নিয়ে তার সাথে আমার আলোচনা হয়। এক সময় তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ থাকতেন। হোটেল হিলটনে চাকরি করতেন। পাঁচবেলা মসজিদুল হারামে নামাজ আদায় করতেন। পবিত্র হরমে দীর্ঘ কালীন অবস্থানের সুবাদে তাঁর মন ও প্রাণ ছিল বড়ই পরিচ্ছন্ন।

হজরত মুফতী আমীনী সাহেবের ইন্তেকালের ঠিক আগের রাতের ঘটনা। চব্বিশ ঘন্টার ব্যবধানও নয়। এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন তিনি। অনেক আবেগ নিয়ে বললেন, আমি দেখলাম- আমি হিলটন হোটেল থেকে মসজিদুল হারামে নামাজ পড়তে গেলাম। বাবে আজয়াদ দিয়ে ঢুকলাম। সোজা বায়তুল্লাহর কাছে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি, কী অদ্ভুত কাণ্ড! কাবা শরীফ ভেঙ্গে মুছড়ে চুরমার হয়ে স্তুপ আকারে পড়ে আছে। আমি নির্বাক। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি বুঝলাম; ওহ! এটা ছিল একটা স্বপ্ন।

তিনি বলেন, স্বপ্নটি দেখে আমি খুব বিচলিত হয়ে গেলাম। এটা কী দেখলাম? এর ব্যাখ্যা কী? হাতের কাছে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরীন এর তাবীরুর রুইয়া কিতাবখানা ছিল। আমি কিতাবটি খুললাম। দেখলাম, তাবীর লেখা আছে, সমকালীন আমীরুল মুমিনীন বা খলীফাতুল মুসলিমীনের ইন্তিকাল হয়ে যাবে।

আমি মহা ভাবনায় পড়ে গেলাম। আমার মন তখন সৌদি আরবের বাদশার দিকে গেল। কিন্তু খটকা লাগলো, তা হলে এ স্বপ্ন আমি দেখবো কেন? কোন কিছুই বুঝে আসলো না। এভাবেই দিনটি চলে গেলো। রাত শুরু হলো। আমার মনের অস্থিরতা কোন ক্রমেই লাঘব হচ্ছে না। ঘুমও আসে না।

ততক্ষণে আমারই এক আত্মীয় থেকে হঠাৎ ফোন পেলাম। গভীর রাতের ফোন একটু ভয় পাওয়ারই কথা। সে আমাকে বলল, মামা! আপনি কি শুনেছেন, হজরত মুফতী আমীনী সাহেব ইন্তিকাল করেছেন। আমি ইন্না লিল্লাহ পড়লাম। জিজ্ঞেস করলাম, কখন? সে বলল, এই তো দশ মিনিট হলো।

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমি নিজকে আর সংযত রাখতে পারিনি। কারণ গতকাল রাতের স্বপ্ন আমার সামনে এখন বাস্তব ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির। ভাবলাম, মাওলার কী মহিমা! আমার স্বপ্ন দেখা আমীরুল মুমিনীনকে আমি সৌদি আরবে খুঁজছি। অথচ যে আমীরুল মুমিনীনের ওফাত সংবাদ আমাকে আগাম জানানো হয়েছে তিনি অন্য কেউ নয়। তিনি তো আমাদের এই হজরত মাওলানা মুফতী ফজলুল হক আমীনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

জনাব সরদার মুসলেহ উদ্দীন মুসা তার স্বপ্ন ও স্বপ্নের উপরোক্ত ব্যাখ্যা বিষয়ে আমাদের বেশ কজন আলিম উলামার সাথে আলাপ করেন। এ আলিমগণের সবাই ছিলেন ইলমে জাহির ইলমে বাতিনের যুগপৎ পণ্ডিৎ। তাঁরা বিষয়টা শুনলেন তারপর উত্তর দিলেন, আপনার স্বপ্ন ও স্বপ্নের তাবীর যথার্থ।

নিঃসন্দেহে হজরত মুফতী ফজলুল হক আমিনী ছিলেন এই যুগে হাদীসে বর্ণিত সেই তায়িফা- এর দলনেতা। খোদায়ী তাকবীনের রেজিস্ট্রারে তাঁর পরিচয় আমীরুল মুমিনীন লেখা ছিল।

আফসুস! তাঁর এই বিশেষণে আমরা তাঁকে জীবনকালে চিনতে পারিনি। তাই তিনি নিজ পরিচয় দিয়ে চলে গেলেন পরপারে। তবে তাঁর জীবন থেকে আমরা যে দীক্ষা লাভ করি তা হলো, তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন, দুনিয়ার মানুষ!

আল্লাহর উপর ঈমান আনার পর আর কাউকে ভয় করা যায় না। তাই ভয় পেয়ো না। হিম্মত নিয়ে অগ্রসর হও; কাজ করো, কাজ করো, বীর মরে একবার কাপুরুষ মরে হাজার বার।

-কেএল


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ