|| মাওলানা আবু সাঈদ ||
প্রাক-উপনিবেশ কালে মাদরাসা শিক্ষাই ছিল ভারতবর্ষের মূলধারার শিক্ষা। মাদরাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণের যাবতীয় দায়িত্ব সরকারিভাবেই নির্বাহ হতো। রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে মাদরাসা শিক্ষায় সর্বোচ্চ শিক্ষিত এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদেরকেই নিয়োগ দেওয়া হতো।
বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর নিখাদ ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামি সংস্কৃতির সুরক্ষার স্বার্থে তৎকালীন ধর্মীয় অভিভাবক ওলামায়ে কেরাম সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজস্ব অর্থায়নে কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সূচনা করেন। পরবর্তীতে বৃটিশ শাসনের যবনিকাপাত হলেও বৃটিশ পদ্ধতির শাসন এদেশে থেকে যাওয়ায় এবং ইসলামি শিক্ষার সাথে সরকারগুলোর বিমাতাসুলভ আচরণ পরিলক্ষিত হওয়ায় মাদরাসাগুলো সরকারের হাতে তুলে দেওয়াকে ওলামায়ে কেরাম নিরাপদ মনে করেননি। ফলে আজও পর্যন্ত কওমি মাদরাসাগুলো প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা কওমের নিজস্ব অর্থায়নেই চলছে।
কওমি মাদরাসাগুলো একসময় কালেকশন নির্ভর ছিল পুরোপুরি। প্রত্যেকটি মাদরাসায় ছিল দুটি করে তহবিল:
১। সাধারণ তহবিল। যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষের সাধারণ দান-অনুদান গ্রহণ করা হতো। যা ব্যায়ের খাত ছিল মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য।
২। গোরাবা তহবিল। এ তহবিলে জনগণের জাকাত, ফেতরা, মান্নত, কাফফারা ও কুরবানির পশুর চামড়ার টাকা গ্রহণ করা হতো। এর ব্যয়ের খাত একমাত্র এতিম ও গরিব শিক্ষার্থীবৃন্দ।
এ দুই ধরণের অনুদান দিয়ে মাদরাসাগুলো চলে আসছে এ যাবৎকাল। গোরাবা তহবিলের কালেকশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌসুম ছিল কুরবানির মওসুম। এ মৌসুমে শহরের বড় বড় কওমি মাদরাসাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কুরবানীর পশুর চামড়া কোনোটা কিনে, কোনোটা সম্পূর্ণ ফ্রিতে, কোনোটা আংশিক ফ্রিতে সংগ্রহ করতো। অতঃপর সেগুলোকে ট্যানারিতে পাঠিয়ে কিংবা চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে উপযুক্ত ও ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হতো। এভাবে সচল থাকতো মাদরাসার গোরাবা ফান্ড।
উপরোল্লিখিত উভয় ফান্ড অনেক মাদরাসায় এখনও চালু আছে। তবে বর্তমানে অসংখ্য মাদরাসা এমন স্বাবলম্বী হয়ে গেছে যে, যেখানে কোনো কালেকশনই করা লাগে না, আলহামদুলিল্লাহ! আর যেসকল মাদরাসায় কালেকশন হয় সেগুলোও কেবল কালেকশনের উপরই নির্ভরশীল নয়। সেসকল প্রতিষ্ঠানে আয়ের নিজস্ব উৎসও রয়েছে। কুরবানির চামড়ার টাকা ছাড়াও এখন এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে সক্ষম।
গত কয়েকবছর যাবৎ কিছু ধর্মবিদ্বেষী, মাদরাসা শিক্ষাবিরোধী অসাধু লোক চামড়াশিল্পে সিন্ডিকেট তৈরী করে মাদরাসাগুলোকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পায়তারা করছে। চামড়ার যাবতীয় পণ্যের দাম দিনদিন বাড়লেও বড় বড় গরুর কাঁচা চামড়া গত আট দশ বছর যাবৎ পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাদের ধারণা এভাবে তারা মাদরাসা শিক্ষার উন্নতি-অগ্রগতি এবং এশিক্ষার জনপ্রিয়তাকে রুখে দিতে পারবে। না, কখনো নয়। আল্লাহ যার মুহাফিজ তার বিনাশ করতে পারে এমন সাধ্য কার?
يريدون ليطفؤوا نور الله بأفواههم والله متم نوره ولو كره الكفرو ن.
‘তারা চায় আল্লাহর নূরকে ফুক দিয়ে নিভিয়ে দিতে। আল্লাহ তায়ালা তো তার নুরকে পূর্ণতা দেবেনই। যদিও কাফেররা অপছন্দ করে।’ [সূরা : সফ, আয়াত : ৮]
چراغ را که ایزد بر فروزد + هر آن کس پف کند ریشش بسوزد
‘যে প্রদীপ প্রজ্বলিত করেন স্বয়ং স্রষ্টা, ফুঁ দিয়ে তা নেভাতে গেলে নিজের দাড়িই (মুখ) পুড়ে যায়।’
তবে যেহেতু একটি শ্রেণি এসকল দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিদ্বেষবশত এর স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে, তাই ওলামায়ে কেরামের কর্তব্য হবে মুখবুজে এগুলো সহ্য না করে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া এবং এর প্রতিকারে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা:
১। একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা। যে কমিটি চামড়ার দর পতনের বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে এর আসল কারণ চিহ্নিত করবে এবং দায়ীদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করে দিবে।
২। সম্মিলিতভাবে অর্থায়নের মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে যথাযথ মূল্য পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিজেরাই চামড়া সংরক্ষণ করা।
৩। চামড়ার ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে সরকার ও ট্যানারি মালিকদের সাথে নেগোসিয়েশন করা।
৪। অন্যথায় মাদরাসাগুলো দু’এক বছর চামড়া কালেকশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা। নবীর ওয়ারিস আলেম ও তালিবুল ইলেমদের ব্যবহার করে বছরের পর বছর সিন্ডিকেটকারীদের পেট ভরানোর তো কোনো অর্থ হয় না।
তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনা যোগ্য। দীর্ঘকাল ধেরে মাদরাসা এবং এলাকাবাসীর মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ যে সম্পর্ক চলে আসছে, সেটি যেন ব্যাহত না-হয়। কারণ মাদরাসার হিতাকাক্ষী যেসব কুরবানি দাতা আছেন, সবসময় যারা মাদরাসাগুলোতে সহযোগিতা করে থাকেন, এই সিন্ডিকেটে তাদের কোনো দায় নেই। দায়টা প্রধানত সিন্ডিকেটকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের। দ্বিতীয়ত সরকারের। তাই শহর বা গ্রামে যেসব মানুষ পশু জবাইয়ে আলেম ও তালেবে ইলমদের মুখাপেক্ষী, তাদের প্রতি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা চাই। বিশেষ করে শহরের মানুষজন পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে অনেকটাই আলেম তালেবে ইলেমদের উপর নির্ভরশীল। তাদেরকে ঠেকায় ফেলা উচিত হবে না।
লেখক : মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ
এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
