বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ ।। ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ২৪ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :
আদ্-দ্বীনের শোকজের জবাবে সন্তুষ্ট নই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী শুক্রবার ঢাকায় আসবেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জুড়তে লেবাননের প্রতি হিজবুল্লাহর আহ্বান ১৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অনশন অব্যাহত রাখবেন ইবতেদায়ী শিক্ষকরা রাজশাহীতে ট্রাক-মাহিন্দ্রা মুখোমুখি সংঘর্ষে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ নিহত ২ ‘যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিশ্বে গর্বের বিষয়’ অপরাধের বিচার হোক সমান চোখে, ধর্মীয় পরিচয়ে নয় সুযোগ দিয়ে দেখুন, মাদরাসার ছাত্ররাই বদলে দিতে পারে চিত্র ‘সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে ইসলামি রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রাম জোরদার করতে হবে’

ইসলামী ব্যাংক: আস্থার সংকট ও উত্তরণের পথ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুফতি ইউসুফ সুলতান || 

বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সত্যিই উদ্বেগজনক। অতি দ্রুত ব্যাংকটির নেতৃত্ব ও শীর্ষ নির্বাহী পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যাদের প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে এবং যারা ব্যাংকটির সুশাসন ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম। এতে শুধু ব্যাংকটির প্রতিই নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনীতির প্রতিও মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ কোনো সাধারণ ইসলামী ব্যাংক নয়। এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামী ব্যাংকিং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৭৫ সালে Islamic Development Bank (IsDB) প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বজুড়ে আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় Dubai Islamic Bank-সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেকের কাছেই ইসলামী ব্যাংকিং ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর জন্য উপযোগী একটি ধারণা।

কিন্তু বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশে ইসলামী ব্যাংকিং সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব—সেই বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ১৯৮৩ সালে একই বছরে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং Bank Islam Malaysia Berhad প্রতিষ্ঠিত হয়। লাইসেন্সিং ও কার্যক্রম শুরুর সময় বিবেচনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক প্রায় দুই থেকে তিন মাস আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ব্যাংকটি যখন যাত্রা শুরু করে, তখন আজকের মতো AAOIFI (Accounting and Auditing Organization for Islamic Financial Institutions), IFSB (Islamic Financial Services Board) কিংবা আধুনিক শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড ও গভর্ন্যান্স কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে সে সময়ের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, শরিয়াহ স্কলার, পরিচালক এবং নির্বাহীদের কাজ ছিল প্রকৃত অর্থেই পথিকৃতের মতো।

পরবর্তী কয়েক দশকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ শুধু একটি সফল বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবেই নয়, ইসলামিক ফাইন্যান্সের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তাদের Rural Development Scheme (RDS) বিশ্বব্যাপী ইসলামী মাইক্রোফাইন্যান্সের অন্যতম সফল মডেল হিসেবে আলোচিত। আমার মাস্টার্সের থিসিসের জন্য ইসলামী মাইক্রোফাইন্যান্স নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যেমন Akhuwat-এর উদাহরণ এসেছে, তেমনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আরডিএস মডেলকেও অধ্যয়ন করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য কেস স্টাডি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

একইভাবে Islamic Bank Training and Research Academy (IBTRA) দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং পিয়ার-রিভিউড জার্নাল Journal of Islamic Economics, Banking and Finance প্রকাশনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি অত্যন্ত সক্রিয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য তারা নিজস্ব উদ্যোগে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এমনকি সর্বশেষ মার্চ ২০২৬-এর Bangladesh Bank Monthly Report on Workers’ Remittance Inflows in Bangladesh প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে বাজার অংশীদারিত্ব, গ্রাহকসংখ্যা এবং সামগ্রিক প্রভাবের দিক থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ দীর্ঘদিন অন্যতম সফল বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল এবং দেশি-বিদেশি বহু স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করেছে। কিন্তু গত রাজনৈতিক সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।

তারপরও গত দুই বছরে বিভিন্ন সংস্কার, নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ এবং ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যেতে দেখা গেছে এবং ধীরে ধীরে জনগণের আস্থাও ফিরে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর আবারও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগের বিষয়।

জাতীয় ও বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স খাতের একজন সাধারণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে আমি মনে করি, ব্যাংকটির নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সর্বস্তরে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়টিকে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বিশেষ করে সম্প্রতি একাধিক ব্যাংকের একীভূতকরণ (মার্জার) নিয়ে জনগণের মধ্যে যে আস্থাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকের সংকট সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ও অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রতিক্রিয়া (ripple effect) দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পুঁজিবাজার থেকে শুরু করে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সকল নীতিনির্ধারকের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন অত্যন্ত সতর্কতা, পেশাদারিত্ব এবং সুপরিকল্পিতভাবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ এটি শুধু একটি ব্যাংকের বিষয় নয়; এটি লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের আস্থা, বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং—বরং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের—সুনামের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিশেষ করে এমন এক অস্থির বৈশ্বিক সময়ে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও স্কলার

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ