|| যাকারিয়া মাহমুদ || সাব-এডিটর
কওমি সিলেবাস সংস্কার—বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়। চাপা গুঞ্জন, নানা আলোচনা-পর্যালোচনা ও সমালোচনার হিড়িক চারদিকে। ছাত্র-উস্তাদ নির্বিশেষে প্রায় সবার দাবি—সিলেবাসের মানোন্নয়ন হোক, সংস্কার হোক। কিছুটা হলেও পূর্ণ হোক যুগ ও সময়ের চাহিদা। বিপরীত যদিওবা আছে—তবে সে সংখ্যা নগণ্য। তরুণ সমাজের এই সংস্কারের আওয়াজ ক্রমশই বাড়ছে। মাদরাসার অন্দরমহল ছাপিয়ে বহির্সমাজেও এটি এখন ব্যাপক আলোচিত বিষয়। বিজ্ঞ আলেমগণও চান সিলেবাসের মানোন্নয়ন ও এর সংস্কার। তবে সে সংস্কার যাই হোক—সংযোজন বা বিয়োজন—তা অবশ্যই কওমির মৌলিকত্ব ঠিক রেখে হওয়া চাই। এমনটাই বক্তব্য সচেতন আলেমদের।
বরেণ্য লেখক, কথাসাহিত্যিক ও মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন আওয়ার ইসলামকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যেহেতু এ-সময়ে ছাত্র-উস্তাদ সবার ভেতরেই মনোযোগ ও সাধনার একটা ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে—তাই যারা সিলেবাসের মৌলিকত্ব বজায় রেখে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তনের কথা বলেন এবং এ-পরিবর্তন উপকারী হবে বলে আশা রাখেন—আমি তাদের এই চিন্তাকে স্বাগত জানাই।
মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, যারা সিলেবাস পরিবর্তনের কথা বলেন, তারা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ হলো—যারা না ইসলামকে গভীরভাবে জানেন-বোঝেন, না কওমি সিলেবাসের আগাগোড়া সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। এ-শ্রেণির লোকেরা সিলেবাস পরিবর্তনের কথা বলে যা বোঝাতে চান—তা হলো, মানুষের পেশাভিত্তিক জীবন। কেননা তাদের কাছে মানুষের পেশাভিত্তিক কর্মজীবন ও ভবিষ্যতটাই প্রাধান্য। এবং এই আলোকেই তারা মনে করেন, অন্য আট-দশটা সিলেবাসের মতো কওমি মাদরাসার সিলেবাসও পরিবর্তন প্রয়োজন।
আরেক শ্রেণি হলো—যারা ইসলাম বোঝেন, কওমি মাদরাসার সিলেবাস—এর গুরুত্ব, গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতা—এবং গ্রহণযোগ্যতার পেছনের কারণগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করেন। তাদের মধ্যে আবার দুই শ্রেণি—এক শ্রেণি হলো, যারা বলে থাকেন সিলেবাস পরিবর্তন না; বরং যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজন। যদি শিক্ষকরা আমানতদারিতার সাথে পাঠদান করেন, তাহলে আগে যেমন এ সিলেবাস থেকে ভালো ভালো আলেম তৈরি হয়েছেন, তা এ যুগেও সম্ভব। আর অপর শ্রেণি হলো—যারা এই সিলেবাসের মৌলিকত্ব ঠিক রেখে যুগ-চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন চান। আমি তাদের এই চিন্তাকে স্বাগত জানাই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাকালে যে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছিল, তার পুরোপুরি বর্তমান সিলেবাসে না-থাকলেও মৌলিকত্ব ঠিক আছে। অর্থাৎ প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন নানা সময়ে হলেও সিলেবাসের মূলধারায় পরিবর্তন আসেনি।
বর্তমান সিলেবাসের মানোন্নয় অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ আলেম ও সিনিয়র সাংবাদিক মাওলানা লিয়াকত আলী। তিনি বলেন—ভাষা শেখায় আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। আরবি-উর্দু-ফারসি—সবই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবই শিখতে হবে। তবে আমাদের কিতাব বোঝা ও পড়াটা অবশ্যই বাংলা ভাষায় হওয়া চাই।
বিশিষ্ট এই আলেম বলেন, মূলত আমাদের দরসে নেজামিতে ইতিহাস-ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন সবই ছিল। কিন্তু ইংরেজ আমলে যখন দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা হয়, দীন রক্ষার তাগিদে আমাদের দরসে নেজামিকে কাটছাঁট করে যতটা না-হলেই না ততটুকু রেখেছিলেন আকাবিরগণ। ইংরেজ আমলের সেই দুর্ভোগপূর্ণ মুহূর্ত তো এখন কেটে গেছে। আমরা এখন নিজেদের মতো স্বাধীন। তাই এখন জরুরি হলো, সিলেবাসে হাত দেওয়া। যুগোপযোগী ও মানোন্নয়ন করে কওমি শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের সহায়তা করা এবং জাতিকে এর ফায়দা হাসিলের সুযোগ করে দেওয়া।
বর্তমান দেশের নানা স্থানে বিভিন্ন মাদরাসায় স্বতন্ত্র সিলেবাস প্রণয়নের বেশ প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তিনি এর নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসব মূলত বিশৃঙ্খলা। এতে উপকারের তুলনায় ক্ষতিই হয় বেশি। সিলেবাস প্রণয়নের এই গুরুদায়িত্ব হলো বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের। আলাদা আলাদাভাবে সবাই স্বতন্ত্র সিলেবাস প্রণয়ন করলে এর ফলাফল লাভজনক নয়।
কওমি সিলেবাসের মানোন্নয়ের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক, বরেণ্য লেখক মাওলানা উবাইদুর রহমান খান নদভী বলেন—দরসে নেজামি হলো আমাদের শিক্ষার ভিত্তি, যা আওরঙ্গজেবের সময়ের শিক্ষানীতি। ব্রিটিশ বা আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে আমরা এর মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন মেনে নিইনি। তবে আধুনিক যুগের প্রয়োজনে আমরা মৌলিক বিষয় ঠিক রেখে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছি। আমাদের ছাত্রদের বাংলা ও ইংরেজি ভাষার চর্চা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় ভালো। হাতের লেখা, ভাষাজ্ঞান, বানান, ব্যাকরণ ইত্যাদিতে মাদরাসার ছাত্ররা অনেক অগ্রসর। আমরা ধীরে ধীরে আইটি বা প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করছি। তবে আমাদের লক্ষ্য ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানো নয়, যার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বরং একজন দক্ষ আলেম তৈরি করাই মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য। যিনি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীনের খেদমত ও প্রচার করতে পারবেন।
তিনি কওমি মাদরাসার অবদান তুলে ধরে আরও বলেন, কওমি মাদরাসাকে খাটো করে দেখবেন না। বরং এর অবদানগুলো খোলা চোখে দেখুন। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় যে নৈতিক ও চরিত্রবান নাগরিক তৈরি হচ্ছে, তা সমাজের জন্য বড় সম্পদ। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সেভাবে স্থান না-পেলেও বিশ্বের সেরা হাফেজ ও কারিদের মধ্যে বাংলাদেশি কওমি মাদরাসার ছাত্ররা প্রথম স্থান, সনদ, অর্থ পুরস্কার, স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে। অন্য কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ব-দরবারে তেমন কিছুই পায় না। সেরা মাদরাসাগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অনেক মাদরাসা শীর্ষস্থানে রয়েছে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক অপূর্ণতা মাদরাসা শিক্ষার্থীরা পূরণ করতে পারে। মাদরাসার ঐতিহ্য, চেতনা, শিক্ষা, বহু ভাষাজ্ঞান, সাধনা, ইমানদারি, নৈতিকতা ও নির্লোভ, শান্তিপ্রিয়তা থেকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আলো নিতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি জনশক্তি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক কিছু নেওয়ার আছে। তাই আসুন একে অন্য থেকে উদাস না থেকে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।
মৌলিকত্ব ঠিক রেখে সিলেবাসের সংস্কার জরুরি বলেছেন মারকাযুল মাআরিফ আল ইসলামিয়া-ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি আবু বকর সাদী ও নাজিমে তালিমাত মুফতি মুহাম্মদ সানাউল্লাহ। তারা বলেন—কওমি সিলেবাসের মাকসাদ ও উদ্দেশ্যের বিবেচনায় এতে সংস্কার হতে পারে এবং এটা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনও বটে। সেটা হওয়া চাই—মৌলিকত্ব ঠিক রেখে যুগ চাহিদার অনুপাতে। তবে অবশ্যই সিলেবাসের উদ্দেশ্য নির্ধারণপূর্বক সংস্কার হতে হবে। ছাত্রদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সিলেবাসে সংস্কার করা এবং সুন্দর ও গঠনমূলক পরিকল্পনা অনুযায়ী সিলেবাসে নতুনত্ব আনাও একান্ত সময়ের দাবি।
উত্তর বাড্ডা বায়তুস সালাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মুফতি আশিকুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক শতাব্দীতে সবকিছুতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন আসে। আমাদের এই সিলেবাসের সময়ও শতাব্দী ছাড়িয়ে গেছে। তাই এখন এ যুগের চাহিদানুপাতে এতে পরিবর্তন আনা জরুরি। একই বক্তব্যে তিনি কওমি সিলেবাসে ‘সিরাত’ সংযোজনে জোরদার হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তরুণ আলেম ও ইসলামি গবেষক মুফতি মুহাম্মদ উসামা হাবীব বলেন, সিলেবাস সংস্কারের বিষয়টা নতুন নয়। আমাদের দেশে কওমি মাদরাসার রূপকার যারা আছেন, যেমন মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রমুখ—তারা সবাই সিলেবাস সংস্কারের কথা ভেবেছেন, বলেছেন এবং নিজেদের কর্মপরিধি অনুযায়ী তারা কাজ করেছেন। এর অসংখ্য প্রমাণ আমরা ইতিহাস ঘাঁটলে পাবো। সুতরাং এ কথা বলার সুযোগ নেই—আমরা আমাদের আকাবিরদের ধারা বজায় রাখতে সিলেবাস সংস্কার থেকে পিছিয়ে রয়েছি।
শামছুল হক ফরিদপুরীর বিখ্যাত উক্তি—‘ধর্মহীন কর্মশিক্ষা, কর্মহীন ধর্মশিক্ষা দুটোই জাতির জন্য অভিশাপ’উল্লেখ করে মুফতি উসামা হাবীব বলেন, ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি আমাদের কর্মমুখি শিক্ষাও প্রাধান্য দিতে হবে। যেমনটা আমরা আজকের ইউরোপ ও আমেরিকার আর্থিক উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে দেখতে পাই। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তারা প্র্যাকটিকেল শিক্ষার প্রতিও বেশ মনোযোগী এবং তাদের সিলেবাসও এভাবে প্রণিত। মোটকথা, ফরিদপুরীর কথার দিকে লক্ষ করে কওমি সিলেবাসে ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষারও ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে পড়াশোনা শেষ করে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে কওমির শিক্ষার্থীরা।
জেডএম/
