|| শায়খ মুফতি মোহাম্মদ আলী ||
রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, শেষ জামানায় কেয়ামতের আগে মানুষের অন্তর থেকে ইলম ছিনিয়ে নেওয়া হবে না; বরং ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে। একজন বিজ্ঞ আলেম মৃত্যুবরণ করবেন, কিন্তু তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো যোগ্য আলেম তৈরি হবে না। এভাবে আলেমদের শূন্যতা তৈরি হতে হতে একদিন পৃথিবী আলেমশূন্য হয়ে পড়বে। তখন আর আল্লাহর জিকির থাকবে না এবং এভাবেই কিয়ামত কায়েম হবে।
পৃথিবীতে যতক্ষণ ইলম ও আলেম থাকবে, ততক্ষণ পৃথিবী টিকে থাকবে। আঠারো হাজার মাখলুকাত আলেমদের জন্য এই কারণেই দোয়া করে যে, আলেম সমাজ না থাকলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কোনো প্রাণীরই অস্তিত্ব থাকবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, পানির গভীরের মাছও আলেমদের জন্য দোয়া করে। এমনকি গর্তের পিপীলিকাও।
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর ইলম প্রীতি—
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন এক অনন্য মেধাবী আলেম। তাঁর যোগ্যতা এতই ছিল যে, তিনি চাইলে নিজেই একটি স্বতন্ত্র মাযহাব প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। কিন্তু উস্তাদ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের কারণে তিনি হানাফি মাযহাবের প্রচার ও প্রসারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
ইলমের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল বিস্ময়কর। তিনি নিজেই বর্ণনা করেন—‘আমার এক ছেলে মারা গেল। আমি মৃত ছেলেকে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের কাছে দাফনের জন্য রেখে উস্তাদ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দরসে চলে গেলাম। আমার মনে এই ভয় ছিল যে, আজ উস্তাদ যে ইলম শিক্ষা দেবেন, আমি উপস্থিত না থাকলে তা সারা জীবনেও আর ফিরে পাব না। ছেলের দাফন-কাফন তো নিয়ম অনুযায়ী হয়েই যাবে, কিন্তু ইলমের এই মজলিস হারানো হবে অপূরণীয় ক্ষতি।’
ইলম অর্জনের সঠিক পদ্ধতি ও গুরুত্ব
আমাদের দেশে ইলম অর্জনের একটি বড় মাধ্যম হলো জুমার নামাজের পূর্বে মসজিদের আলোচনা। আমরা যদি মনোযোগ দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা শুনি, তবে দ্বীনের অনেক জরুরি বিষয়ে ইলম অর্জন সম্ভব।
বিশেষ করে যারা দ্বীনি ইলমের ছাত্র (তালিবুল ইলম), তাদের উচিত পড়াশোনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সামান্য অজুহাতে বা দূরের আত্মীয়ের বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ছুটি নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। ইলম অর্জনে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতো ত্যাগী মানসিকতা প্রয়োজন।
হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর ইলম অর্জনের প্রেরণা—
বাংলাদেশের বরেণ্য বুজুর্গ আলেম হযরত মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর জীবন ছিল ইলমের প্রতি গভীর সম্মানে ভরপুর। ছোটবেলায় তিনি রাস্তায় একটি কাগজের টুকরো পড়ে থাকতে দেখেন। তাতে আরবি লেখা দেখে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে সেটি তুলে একটি উঁচু স্থানে রাখেন। পরবর্তীতে জানা যায়, তাতে লেখা ছিল "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম"। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই সম্মান প্রদর্শনকে কবুল করেন এবং তাঁর অন্তরে ইলমের নুর দান করেন।
কানপুরে শিক্ষা সফরের কঠিন সংগ্রাম—
হাফেজ ও আলেম হওয়ার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে তিনি ভারতের কানপুরের একটি মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে তাঁর টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি রেললাইন ধরে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেন। পথিমধ্যে কুকুরের কামড়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরার সময় ডাক্তার তাঁর অসহায়ত্ব দেখে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও যাতায়াতের জন্য 'আপ-ডাউন' রেল টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন।
কানপুর পৌঁছানোর পর তিনি মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রিন্সিপাল)-এর কাছে ভর্তির আবেদন করেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তাঁর 'আপ-ডাউন' টিকিট নিয়ে। কর্তৃপক্ষ ভাবলেন, যেহেতু তাঁর কাছে ফেরার টিকিট আছে এবং অতিরিক্ত টাকা নেই, তাই তিনি কয়েকদিন পর চলে যেতে পারেন। এই আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ তাঁর ভর্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।
তখন হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এক অভাবনীয় কাজ করলেন। তিনি নিজের ফেরার টিকিটটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। তিনি বললেন—
"যে ইলম অর্জনের পথে এই টিকিট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমি তাকেই রাখব না। প্রয়োজনে আমি ফিরব না, কিন্তু ইলম অর্জন না করে যাব না।"
তাঁর এই ব্যাকুলতা ও ইলমের প্রতি ত্যাগের মানসিকতা দেখে ওস্তাদদের মন নরম হয়ে যায়। তাঁরা তাঁকে পরম মমতায় মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে নেন।
জেডএম/