|| মাওলানা ইমদাদুল হক ||
ঐতিহাসিকদের অনুমান, রাসুলুল্লাহ সা.-এর আমলেই ভারত উপমহাদেশে ইসলাম চলে এসেছে। এ উপমহাদেশের কেউ কেউ সাহাবিত্বের মর্যাদাও লাভ করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। অনেক আরব সাহাবিও এখানে ইসলাম প্রচারে এসেছেন। ভারতবর্ষের অংশ হিসাবে বাংলাদেশেও সামসময়িককালে ইসলাম আগমন করে।
পৃথিবীতে ইসলাম আগমনের অনেক আগে থেকেই আরবদের সাথে এদেশের যোগাযোগ ছিল। আরব বণিকরা নৌপথে বঙ্গোপসাগর হয়ে চিন দেশে যেতেন। এবং বিভিন্ন উপকূলে নোঙর করতেন। বাংলা ভূখণ্ডের উপকূলেও ব্যাবসায়িক ও অন্যান্য প্রয়োজনে তারা থামতেন।
ইসলাম আরবে আগমন করলে এই বণিকশ্রেণি সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলাম প্রচারে নিজেকে নিবেদন করেন। তারা বৈষয়িক প্রয়োজনে ব্যবসা-বাণিজ্য আগের মতোই করেছেন। তবে তখন তারা বণিক হওয়ার পাশাপাশি যুগপৎভাবে দ্বীনের দাঈর দায়িত্বও পালন করেন। তখন তারা আগের মতোই আমাদের ভূখণ্ডে এসেছেন। এবং একই সাথে ব্যবসা ও দ্বীনের দাওয়াত করেছেন। এভাবে এই বণিকশ্রেণি দ্বারাই সম্ভবত বাংলা এলাকায় প্রথম দ্বীনের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটে। এভাবেই বাংলাদেশ হয়ে সাহাবি আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবন ওয়াহাব রা. চিন দেশে যান নবীজির জীবদ্দশায় ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পূর্বে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটেছে প্রধানত পালতোলা জাহাজে আগত আরব বণিকদল ও সুফি সাধক পির আওলিয়াদের মাধ্যমে। ধারণা করা হয়, হজরত খাইরুল বাশার ওমর শাহ চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের প্রথম দ্বীন প্রচারক। তার আগে আর কেউ এসেছেন কি না জানা যায় না।
তিনি এসে ভাটুই নদীর তীরে আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ি গ্রামে আস্তানা গাড়েন। এবং সেখান থেকে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তার নির্মিত এ মসজিদটিই বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম মসজিদ। ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে সে মসজিদ। এখনও এ মসজিদে নিয়মিত জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়। বর্তমানে মসজিদটি ঘোলদাড়ি শাহী মসজিদ নামে পরিচিত।
মসজিদটির একাধিকবার সংস্কার হয়েছে। দিল্লির ঘোরি বংশীয় সুলতানদের শাসনামলে হজরত শাহ সুফি আলাউদ্দিন ঘোরি মসজিদটি প্রথম সংস্কার করেন। মোঘল আমলেও এর সংস্কার হয়। মসজিদটির বর্তমান অবকাঠামো মোঘল আমলের স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি স্থাপত্য শিল্পের এক মূল্যবান নিদর্শন। ৪০×১০ আয়তনের এই মসজিদের চার কোণে থামের ওপর ৪টি ছোট মিনার আছে। এর দেয়ালের বেধ মাত্র ৩'-৬'। দুপাশে দুটি দরজা ও দক্ষিণ পাশে একটি জানালা আছে। ক্ষুদ্র ঢালি ইট, চুন-সুরকির গাঁথুনি ও মেহরাবে ছয়টি ক্ষুদ্র কুঠুরি আছে। ভেতরের দেয়ালে আঁকা নানা ফুল, লতা-পাতা সংস্কারের অভাবে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। মসজিদটি গাঁথার সময়ে অজ্ঞাত কারণে চুন-সুরকির সঙ্গে মুসুরি ডালের দানা মেশানো হয়েছিল।
আনুমানিক বাংলা ৪১৩ সালে (১০০৬ খ্রি.) হজরত ওমর শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের নামে ৫শ' একর লাখেরাজ ভূমি ছিল। বর্তমানে তার হদিস নেই।
সে সময় আলমডাঙ্গা অঞ্চল ছিল জলাশয় ও জঙ্গলপূর্ণ এলাকা। এটি জনাকীর্ণ এলাকা ছিল না। হজরত খায়রুল বাশার ওমর শাহ রহ. যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, সে সময় গৌড়ের রাজা লক্ষ্মণসেন মুসলমানদের আক্রমণের আশঙ্কায় খুব ভীত হয়েছিলেন এবং মুসলমানদের দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে, রাজা লক্ষ্মণসেন হজরত খায়রুল বাশার ওমর শাহর বিরুদ্ধে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদলের সাথে ওমর শাহর সংঘর্ষ হয় এবং তিনি জয়লাভ করেন। তবে তাঁর অনেক মুরিদ ও অনুচর শহিদ হন। এই সংঘর্ষে নিহত শহিদদের মাজার শাহী মসজিদের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এ সময় তার মসজিদটিও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বলে ধারণা করা হয়।
ওমর শাহ রহ. নির্মিত ঘোলদাড়ি গ্রামের এ মসজিদটি ছিল চুয়াডাঙ্গাসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম ইসলাম প্রচারকেন্দ্র। এখান থেকে তিনি ইসলাম প্রচারের যে কাজ প্রথম আরম্ভ করেছিলেন তাই পরবর্তীকালে বিস্তার লাভ করেছে। তার সহজ, সরল, অনাড়ম্বর জীবন ও মানুষের প্রতি ভালবাসা তার প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি এ জেলায় যে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন তার আলো ব্যাপক ও বিস্মৃত আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল অতি অল্পকালের মধ্যে।
তার নাম ওমর। তবে শব্দটি 'ওমর' নাকি 'ওমজ' এ নিয়ে মৃদু বিতর্ক আছে। যদিও অধিকাংশ আলোচক 'ওমজ'ই লিখে থাকেন। তবে 'ওমর' হওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা প্রাচীন ও সামসময়িক মুসলিমদের মধ্যে ওমর নাম ব্যাপক হলেও ওমজ নামে উল্লেখযোগ্য কাউকে পাওয়া যায় না। ধারণা করা যায়, মসজিদের গায়ে শিলালিপিতে তার নাম আরবি হরফে খোদিত ছিল। দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ায় সেখানে 'রা' হরফের ওপর নুকতার মতো আবরণ পড়ে হরফটি 'জা'য়ের মতো হয়ে যেতে পারে। এ কারণে পরবর্তীতে কেউ শিলালিপি থেকে পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে ওমরকে ওমজ পড়ে থাকতে পারেন। এবং পরবর্তীতে এটিই প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।
খাইরুল বাশার তার উপাধি। খাইরুল বাশার অর্থ শ্রেষ্ঠ মানব। নিঃসন্দেহে তিনি উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানব। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রায় ৯৮% মুসলমান। শত শত মসজিদ-মাদরাসা আর হাজার হাজার আলেম-উলামা অধ্যুষিত এ জেলা। এর সূচনা করেছিলেন তিনি। সে হিসাবে এসব কিছুর প্রতিদান তিনি পাবেন। সুতরাং এ অঞ্চলে তার মতো এত অধিক মর্যাদার অধিকারী আর কে হবেন! কে আর তার চেয়ে অধিক সাওয়াব নিয়ে হাশরে উঠবেন!
আরব, ইয়ামান, ইরান, তুরান থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ দূর প্রাচ্যে আগত অন্যান্য দাঈ-মুবাল্লিগের মতোই তিনিও ছিলেন সাহসী, উদ্যমী, ব্যক্তিত্ববান ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মানুষ। নিজের জন্মভূমিকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানিয়ে তখনকার দিনের বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে অনিশ্চিত শত্রু পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডে দ্বীন প্রচারের জন্য স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়া সোজা কথা নয়। এতটা প্রাণশক্তি ও কর্মোদ্যম নিয়ে সভ্য দেশের পাদপ্রদীপের আলোয় বসে ইসলামের খেদমত করলে আজ হয়তো তিনি ইতিহাস বিখ্যাত মহাপুরুষ হতেন। হতেন ইমাম আবু হামিদ গাজালি, আব্দুল কাদের জিলানি, আবু নাঈম ইস্পাহানি, ইবনে হাজার আসকালানি প্রমুখের মতো ইতিহাসখ্যাত বিশ্ববরেণ্য মনীষী।
প্রথম পর্যায়ে যেসব সুফি সাধক ও পির আওলিয়া বাংলায় ইসলাম প্রচারে এসে ইতিহাসখ্যাত হয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ১. সুলতান বায়েজিদ বোস্তামি (মৃত্যু ৮৭৫ খ্রি.), ২. সৈয়দ সুলতান মাহি সওয়ার (মৃত্যু ১০৪৭ খ্রি.), ৩. শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমি (মৃত্যু ১০৫৩ খ্রি.), ৪. বাবা আদম শহিদ (মৃত্যু ১১১৯ খ্রি.) প্রমুখ। এ সকল মনীষীর নামের পাশে তাদের মৃত্যু সন খেয়াল করুন। হজরত খাইরুল বাশার ওমর শাহ (রহ.) এদের সামসময়িক। কেননা তার নির্মিত মসজিদটি ১০০৬ খ্রিস্টাব্দের বলে অনুমতি। সুতরাং তারও ঐতিহাসিক গুরুত্ব এমনই। এমনই ইতিহাসখ্যাতিও পাওয়ার কথা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা হয়নি।
তিনি সুন্নাহপন্থি ইসলাম প্রচারক ছিলেন। এখন সুফি সাধক পির আওলিয়া বলতে যে চিত্র ভেসে ওঠে সে সময়ের ইসলাম প্রচারকগণ কেউই তেমন ছিলেন না। সুন্নাহ-বিচ্যুত এ ধারা পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অনুসারীর দাবিদার জাহেলদের দ্বারা তাদের কবর কেন্দ্রিক বেশরা রেওয়াজ চালু হওয়ার দায় তাদের নয়। এসব দেখে তাদেরকেও এমন ভাবা যথার্থ হবে না।
তার নির্মিত ঘোলদাড়ি শাহী মসজিদের চত্বরে তার কবর আছে। তিনি তার কবর পাকা করতে নিষেধ করে গিয়েছিলেন। সেজন্য কবর পাকা করা হয়নি। ঘাসের আচ্ছাদনে উন্মুক্ত আকাশের সামিয়ানার নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মহান সাধক হজরত খাইরুল বাশার ওমর (রাহ.)। চুয়াডাঙ্গাসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার প্রথম ইসলাম প্রচারক। এ জেলাসহ আশপাশের জেলাসমূহের অসংখ্য মুসলিমের নেক আমলের সাওয়াব প্রতি নিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে তার আমলনামায়। অথচ সভ্য দুনিয়ার তেমন কেউই তার নাম জানে না। দর্শনার্থীরা এখন শাহী মসজিদের চত্বরে গেলে তার কবরও চিনতে পারবে না। দুনিয়াবাসীর কাছে অপরিচিত এই বিস্মৃত সাধকই, ইনশাআল্লাহ, কিয়ামতের মাঠে লক্ষ-কোটি মানুষের সমান সাওয়াব ও মর্যাদা নিয়ে উঠবেন।
তথ্যসূত্র:
১. কুষ্টিয়া জেলায় ইসলাম, শ ম শওকত আলী, ইফাবা
২. চুয়াডাঙ্গা জেলার ইতিহাস, রাজিব আহমেদ, গতিধারা, ঢাকা
৩. বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা চুয়াডাঙ্গা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা
লেখক: মাদরাসা শিক্ষক ও লেখক, চুয়াডাঙ্গা
আইও/