|| মুফতী ড. মাসুম বিল্লাহ ফিরোজী ||
পান আমাদের উপমহাদেশের একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় খাদ্যাভ্যাস। সামাজিক আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে পান পরিবেশন একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। অনেকের কাছে এটি নিছক একটি মুখরোচক খাদ্যদ্রব্য বা সামাজিক সৌজন্যের অংশ। তবে বাস্তবে, বিশেষ করে সুপারি, জর্দা, তামাক বা অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিষয়ে বহুবার সতর্ক করেছে। শুধু স্বাস্থ্যগত ক্ষতিই নয়, পান পরিবেশ, সামাজিক শালীনতা এবং জনসচেতনতার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১. মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি: পানের সবচেয়ে গুরুতর ক্ষতির মধ্যে অন্যতম হলো মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বিশেষত সুপারি ও তামাকযুক্ত পান দীর্ঘদিন সেবনের ফলে মুখের অভ্যন্তরীণ কোষে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে জিহ্বা, গাল, মাড়ি, ঠোঁট ও গলায় ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
২. দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি: নিয়মিত পান খাওয়ার ফলে দাঁতে কালচে বা বাদামি দাগ পড়ে এবং দাঁতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়। তামাক ও সুপারির প্রভাবে মাড়ি দুর্বল হয়ে যেতে পারে, দাঁত নড়বড়ে হতে পারে এবং মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মুখের সার্বিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৩. মুখের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস: দীর্ঘদিন সুপারি খাওয়ার ফলে মুখের ভেতরের টিস্যু শক্ত হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে Oral Submucous Fibrosis বলা হয়। এর ফলে মুখ পুরোপুরি খুলতে কষ্ট হয়, খাবার চিবানো ও কথা বলায় সমস্যা দেখা দেয় এবং ভবিষ্যতে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
৪. আসক্তির সৃষ্টি: জর্দা বা তামাকযুক্ত পানে বিদ্যমান নিকোটিন আসক্তি সৃষ্টি করে। একবার এ অভ্যাস গড়ে উঠলে তা পরিত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এ আসক্তি আরও ক্ষতিকর তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দিকে মানুষকে ধাবিত করে।
৫. পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: অতিরিক্ত পান খাওয়ার ফলে অনেকের গ্যাস্ট্রিক, অম্লতা, বদহজম বা অন্যান্য পরিপাকজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে খালি পেটে জর্দাযুক্ত পান খাওয়া শরীরের জন্য আরও ক্ষতিকর।
৬. হৃদরোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি: তামাকযুক্ত পান রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিকোটিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৭. অর্থনৈতিক অপচয়: অনেক মানুষ প্রতিদিন একাধিক পান সেবন করেন। দৈনিক খরচ অল্প মনে হলেও মাস বা বছরের হিসাবে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দান-সদকা বা পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করা যেতে পারে।
৮. পরিবেশ দূষণ ও নোংরামির কারণ: পান খাওয়ার পর অনেকেই যত্রতত্র পিক ফেলে দেন, যা রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন এবং বিভিন্ন জনসমাগমস্থলকে নোংরা করে। পান-জর্দার লালচে দাগ দেয়াল, সিঁড়ি, ভবন ও জনসাধারণের স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট করে। ফলে এটি কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, নাগরিক শৃঙ্খলা ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতার জন্যও একটি সমস্যা।
৯. শালীনতা, রুচিশীলতা ও সামাজিক সৌন্দর্যের পরিপন্থী: অন্যের সামনে অবিরাম পান চিবানো, মুখভর্তি করে কথা বলা কিংবা জাবর কাটার মতো আচরণ ভদ্রতা, সৌজন্য ও রুচিশীলতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের আচরণ ব্যক্তিত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং অন্যদের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একজন মার্জিত ও সচেতন মানুষের জন্য পরিচ্ছন্নতা, শালীনতা ও পরিশীলিত আচরণ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০. যুগোপযোগিতা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও আলেমসমাজের দৃষ্টিভঙ্গি: ভারতীয় উপমহাদেশে পান খাওয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। অতীতে বহু সম্মানিত আলেম, মাশায়েখ ও দ্বীনি ব্যক্তিত্বের মধ্যেও এ অভ্যাস বিদ্যমান ছিল। তবে যুগ, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞান পানের—বিশেষত সুপারি ও তামাকযুক্ত পানের—নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। পাশাপাশি জনপরিসরে পানের পিক ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ ও নোংরামির সমস্যাও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
এ প্রেক্ষাপটে আরব বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের বহু সমকালীন আলেম স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং সামাজিক শালীনতার স্বার্থে এ অভ্যাস থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো পরিচ্ছন্নতা, পরিমিতি, ক্ষতি থেকে বিরত থাকা এবং উত্তম চরিত্র ও রুচির চর্চা। সুতরাং কেবল একটি আঞ্চলিক ঐতিহ্যের কারণে কোনো অভ্যাসকে অব্যাহত রাখার পরিবর্তে শরিয়তের কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য, স্বাস্থ্যগত বাস্তবতা এবং সামাজিক পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিষয়টি বিবেচনা করা অধিক সমীচীন।
অতএব, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক সৌন্দর্য ও উত্তম রুচিবোধের স্বার্থে পান খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করা বা অন্তত যথাসম্ভব সীমিত করা একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষের জন্য প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হতে পারে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ: ইসলাম মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। যে কোনো খাদ্য বা অভ্যাস যদি শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়, তবে তা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা আল-বাকারা- ১৯৫)
এছাড়া ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—“ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদানও ক্ষতি দ্বারা দেওয়া যাবে না” (لا ضرر ولا ضرار)।
অতএব, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক কল্যাণের পরিপন্থী তামাক, জর্দা বা অন্যান্য নেশাজাতীয় উপাদানযুক্ত পান থেকে দূরে থাকা একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব।
উপসংহার: সাধারণ পানপাতার কিছু সীমিত উপকারিতা থাকলেও সুপারি, জর্দা ও তামাকযুক্ত পান দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। মুখের ক্যান্সার, দাঁতের ক্ষয়, মুখের কার্যক্ষমতা হ্রাস, আসক্তি, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন জটিল রোগের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
পানের ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশ, সামাজিক সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, রুচিবোধ এবং জনসচেতনতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এ অভ্যাস থেকে বিরত থাকা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই অধিক কল্যাণকর।
সুস্থ জীবনযাপন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত রুচিবোধ এবং ইসলামের কল্যাণমুখী জীবনদর্শনের আলোকে পানের ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার করা এবং এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
লেখক: শায়খুল হাদীছ ও বিভাগীয় প্রধান, জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম রহ. কক্সবাজার। সদস্য, শরীয়াহ সুপারভাইজারী কমিটি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি।
আইও/