বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ।। ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ৮ সফর ১৪৪৮


বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না জামায়াতের!


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি:

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক সময়ে অবস্থান করছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো এবারের সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে দলটি। তবে এত বড় সাফল্যের পরও দলটিকে বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। একের পর এক নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিদ্রোহী প্রার্থী, সাংবাদিকের ওপর হামলা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বারবার সমালোচিত হয়েছে জামায়াত। সবশেষ যুক্ত হয় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ভাইরাল ভিডিওকাণ্ড। এক নারীর সঙ্গে একাধিক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জামায়াত। বিষয়টি জামায়াত সংশ্লিষ্ট সবাইকে চরম অস্বস্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

সোমবার (২০ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিকভাবে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের নেতারা ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই জানান, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি দাবি করেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধ, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের অংশ হিসেবে তার ব্যক্তিগত ভিডিও গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। প্রকৃত ঘটনা যাচাই শেষে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শুধু এটাই নয়, গত কয়েক মাসে দলটির একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়ার একটি মসজিদে বক্তব্য দিতে গিয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে দুটি মানহানির মামলা হয়। পরে আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তিনি স্থায়ী জামিন পান।

এরপর বাজেট অধিবেশনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জাতীয় বাজেটের আকার নিয়ে ভুল তথ্য দেন। প্রথমে বলেন বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত, পরে বলেন ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত। পরে অবশ্য তিনি দাবি করেন, মুখ ফসকে ভুল বলেছেন; তিনি ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেটের কথা বলতে চেয়েছিলেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান বাজেট আলোচনায় সংসদ সদস্যদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা দেওয়ার দাবি জানান। সংসদে দেওয়া এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এমনকি জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থও বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন।

নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আব্দুল মুনতাকিম সংসদে দাবি করেন, তার পরিবারের ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং তার বাবা ও দাদা শহীদ হয়েছেন। পরে জানা যায়, তার জন্ম ১৯৮১ সালে এবং তার বাবা জীবিত। এ বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও ট্রলের মুখে পড়েন তিনি। পরে নিজের বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারের কাছে আবেদন করেন।

নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান তালিকায় তার মেয়ের নাম দুইবার থাকার অভিযোগ প্রকাশ হলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। পরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত আরমান উদ্দিনকে ঘিরেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে তাকে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে এমপিকে লক্ষ্য করে হুমকিমূলক কথোপকথনে জড়িত বলে দাবি করা হয়। যদিও অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এর আগে গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে জামায়াতের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির পর কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে দলটি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার অনেক বেড়ে যাওয়ায় নতুন কর্মীদের মধ্যে আদর্শগত প্রশিক্ষণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলা রক্ষা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেউ যদি মনে করেন যে তাকেই জনপ্রতিনিধি হতে হবে, তাহলে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। তার মতে, ব্যক্তিগত পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষার চেয়ে আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলাই দলের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দলের একাধিক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর অনেক নতুন ব্যক্তি সম্ভাব্য ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার প্রত্যাশায় দলে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকায় চেয়ারম্যান ও অন্যান্য পদে দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। এতে নতুন ও পুরোনো কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সরাসরি সদস্য হতে পারেন না। সহযোগী সদস্য, কর্মী এবং নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের পর রুকন হওয়ার ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তবে দল সম্প্রসারণের প্রয়োজনে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রক্রিয়া কিছু ক্ষেত্রে দ্রুততর হয়েছে। এতেই বিপত্তি ঘটছে বলে দাবি জামায়াতের একটি অংশের।

আওয়ার ইসলাম/জেডএম


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ