শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ ।। ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ৩ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :

সাত দলকে নিয়ে বৈঠকে কী বার্তা দিলো হেফাজত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

বিশেষ প্রতিনিধি

কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভক্তি, পারস্পরিক বিরোধ এবং ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক জোটে অবস্থানের বাস্তবতায় নতুন ঐক্যের বার্তা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সাতটি কওমি ঘরানার ইসলামি দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় হেফাজতের মূল বার্তা ছিল—নিজেদের মধ্যে বিভেদ নয়, আকিদা, মাদরাসা ও ইসলামি স্বার্থ রক্ষায় একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে চার ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পাশাপাশি হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান জানান, সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঐক্যের রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কওমি ধারার ইসলামি দলগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে, কেউ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে, আবার কেউ এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। এর ফলে কওমি অঙ্গনে মতভেদ, দূরত্ব ও পারস্পরিক সমালোচনা বেড়ে যায়।

হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, এই বিভক্তি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, কওমি মাদরাসা ও আলেম সমাজের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আকিদা ও কওমি স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

প্রথমত, কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রকাশ্য বিরোধ বন্ধ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আকিদাগত অবস্থান ও কওমি মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়ায় না থেকে কওমি ধারার দলগুলো নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, বর্তমান ঐক্য উদ্যোগের লক্ষ্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক জোট গঠন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি অভিন্ন কর্মপদ্ধতি ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি তৈরি করা।

বৈঠকে অংশ নেওয়া দলগুলোর কাছে লিখিতভাবে ঐক্যের প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। প্রতিটি দল নিজস্ব ফোরামে আলোচনা করে তাদের মতামত হেফাজতের আমিরের কাছে জমা দেবে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকেই সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, সাতটি দল আপাতত ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে পথচলা হবে, সে বিষয়ে প্রতিটি দলের মতামত চাওয়া হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাতটি দলের আকিদা-বিশ্বাস প্রায় অভিন্ন। তাই ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। তবে কী ধরনের কাঠামো হবে, তা পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমানো। এখনো নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করছে হেফাজতে ইসলাম। ঐক্য কার্যকর করতে কিছুটা সময় লাগবে।

যদিও বৈঠকে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা মনে করছেন, হেফাজতের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোর নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। আপাতত লক্ষ্য বিভক্তি দূর করে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই লক্ষ্যেই সাত দলের সামনে ঐক্যের নতুন বার্তা তুলে ধরেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ