বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ।। ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১০ মহর্‌রম ১৪৪৮


মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর চলে যাওয়ার ১০ বছর আজ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

বিশেষ প্রতিনিধি-

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৬ সালের ২৫ জুন তিনি পরপারের উদ্দেশে পাড়ি জমান। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ইসলামি চিন্তাবিদ, তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনসহ অসংখ্য ধর্মীয় গ্রন্থের লেখক ও অনুবাদক এবং কালজয়ী পত্রিকা মাসিক মদীনার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। বাংলায় সিরাত সাহিত্যের জনক বলা হয় তাঁকে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতিও ছিলেন। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের কথা নিচে তুলে ধরা হলো-

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ১৯৩৫ ঈসায়ীর ১৯ এপ্রিল মুতাবিক ১৩৪২ বঙ্গাব্দের ৭ বৈশাখ শুক্রবার জুমআর আজানের সময় কিশোরগঞ্জ জেলাধীন পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের ছয়চির গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রীক নিবাস ময়মনসিংহের গফরগাওঁ উপজেলার আনসার নগরে।

তাঁর মাতা একজন জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষিকা ছিলেন। সন্তানদেরকে খুব ছোটবেলা থেকে ইসলামী আদব-আখলাক শিক্ষা দেয়ার প্রতি তাঁর খেয়াল ছিল অনেক বেশি। শুধু মৌখিক উপদেশ নয়, এসব বিষয়ের সযত্ন অনুশীলনও তিনি করাতেন। যেকোন একটা বিষয় সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। কোন কাজ করার জন্য হুকুম দেয়ার অভ্যাস তাঁর ছিল না। চমৎকারভাবে আগ্রহ সৃষ্টি করে দেয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। মাতার কাছেই মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের শিক্ষার হাতে খড়ি হয়। 

হাফিয নঈমুদ্দীনের নিকট তিনি কায়দা, সিপারা ও কুরআন পড়া শিখেন। পিতা তাঁকে ‘পাঁচবাগ ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসা’র প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। কিন্তু মাতার ইন্তিকালের পর তিনি নানীর তত্ত্বাবধানে থাকায় নানাবাড়ির নিকটবর্তী তারাকান্দি মাদরাসায় ১৯৪৭ ঈসায়ীতে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে মন বসাতে না পারায় তিনি দু’বছর পর আবার পাঁচবাগ মাদরাসায় ফিরে আসেন।

তিনি পাঁচবাগ মাদরাসা থেকে ১৯৫১ ঈসায়ীতে আলিম ও ১৯৫৩ ঈসায়ীতে স্কলারশিপসহ ফাযিল পাশ করেন। পাঁচবাগের শিক্ষকগণের মধ্যে কলিকাতা ও দেওবন্দের ডিগ্রীধারী অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ আলিম মুফতী মুহাম্মাদ আলী খুরশীদ মহলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক। ক্লাসের পড়ার বাইরে অনেক কিছুই তিনি তাঁর কাছে শিখেছিলেন। বহু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের খোঁজ-খবর তিনি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন।

তাছাড়া তিনি পিতার নিকট বাংলা ও আরবী সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। ১৯৫৩ ঈসায়ীতে উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ ঈসায়ীতে হাদীস বিষয়ে কামিল ও ১৯৫৬ ঈসায়ীতে ফিক্হ্ বিষয়ে কামিল ডিগ্রী লাভ করেন।

ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় যেসব শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন করেন তাঁদের মধ্যে আল্লামা যাফর আহমাদ উসমানী, মুফতী সায়্যিদ আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদী, আল্লামা আবদুর রাহমান কাশগড়ী রাহিমাহুমুল্লাহ উল্লেখযোগ্য। আল্লামা যাফর আহমাদ উসমানী মাদরাসায় বুখারী শরীফ পড়াতেন। তাঁর কাছে তিনি বুখারীর প্রথমার্ধ দুবার পড়েন। একবার হাদীস পড়ার বছর, আরেকবার ফিক্হ্ পড়ার বছর। তাছাড়া মাঝে মাঝে ইমামগঞ্জ মাসজিদের দারসেও গিয়ে বসতেন।

উল্লেখ্য, আল্লামা উসমানী উক্ত মাসজিদে বাদ ফজর আশরাফুল উলূম ও জামিয়া কুরআনিয়া লালবাগের ছাত্রদেরকে বুখারী পড়াতেন।

বুখারী শরীফের শেষাংশ পড়েছেন মুফতী সায়্যিদ আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদীর নিকট। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন গ্রন্থপ্রিয় মানুষ। কিতাবাদি ছাড়া তিনি কিছুই বুঝতেন না। খুব উঁচুস্তরের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিও ছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ‘ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার’ একটা কালজয়ী কিতাব। ‘কাওয়ায়িদুল ফিক্হ্’ ও ‘আদাবুল মুফতিয়্যীন’ তাঁর কাছেই অধ্যয়ন করেন। এই তিন খানা কিতাব আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল উলূম দেওবন্দ ও পাকিস্তানের বড় বড় মাদরাসাগুলোতে পাঠ্য তালিকাভুক্ত।

তাঁর জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে এ যুগের একজন শীর্ষস্থানীয় হাদীসতত্ত্ববিদ আল্লামা আবুল ফাত্তাহ্ শামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “একবার আমি এই বুযুর্গ আলিমের সাক্ষাত পেয়েছিলাম মাসজিদুন নাবাবীতে। তাঁর কাছে আমি একখানা হাদীস পাঠ করেছিলাম যেন বলতে পারি যে, মুফতী আমীমুল ইহসানের ন্যায় একজন যুগশ্রেষ্ঠ হাদীসতত্ত্ববিদের নিকট থেকে আমি হাদীস শ্রবণ করেছি।” তিনি ঢাকা আলিয়া মাদরাসার হেড মাওলানার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর জাতীয় মাসজিদ বায়তুল মুকাররামের খতীবের পদ অলঙ্কৃত করেন। 

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ফিক্হ্ পড়েন আল্লামা শাফী হুজ্জাতুল্লাহ্ আনসারী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট। তিনি ছিলেন  প্রখ্যাত আলিম ও উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর সেনানী মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গিমহল্লী রহমাতুল্লাহি আলাইহির জ্ঞাতি ভাই। তাঁর সম্পর্কে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বলেন, “আল্লামা শাফী রাহ্. যখন আমাদেরকে পড়াতেন তখন তাঁর চোখ থেকে যেন প্রতিভার জ্যোতি ঠিকরে পড়তো। এমন শুদ্ধভাষী এবং অল্পকথায় জটিল বিষয় বুঝিয়ে দেয়ার মত কুশলী পন্ডিত ব্যক্তি জীবনে আমি খুব কমই পেয়েছি।” 

তিনি মুসলিম শরীফ ও তিরমিযী শরীফের একাংশ অধ্যয়ন করেন মাওলানা মুমতাজ উদ্দীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে। তিনি মুসলিম শরীফের ভূমিকা অংশের একখানা বিস্তারিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন উর্দূ ভাষায়, যা উপমহাদেশের সর্বত্র সমাদৃত হয়। তাঁর এক পুত্র ব্যারিস্টার মওদুদ আহমাদ বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধনমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেন।

বাল্যকালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। পিতা ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’, ‘আল-এছলাম’, ‘শরীয়তে এছলাম’, ‘মাসিক নেয়ামত’, ‘সাপ্তাহিক হানাফী’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। পাঁচবাগ মাদরাসার প্রথম শ্রেণিতে পড়াকালে তাঁকে পিতা বেঙ্গল গভর্নমেন্টের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার কথা’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার গ্রাহক করে দেন। বিজনৌর থেকে প্রকাশিত উর্দূ অর্ধসাপ্তহিক ‘মদীনা’ এবং দিল্লী থেকে প্রকাশিত উর্দূ মাসিক ‘মওলবী’ তাদের ঘরে নিয়মিত আসত।

তাছাড়া তাঁর পিতার নিজস্ব একটা গ্রন্থাগার ছিল। তাতে সে যুগের অনেক মূল্যবান বই ছিল। পিতা তাঁকে বই-পুস্তক সংগ্রহ করার ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। তাই ছোটবেলা থেকেই বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকার প্রতি তাঁর মনে তীব্র আকর্ষণ গড়ে ওঠে।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর স্নেহময়ী মাকে হারান। মুমূর্ষু অবস্থায় মা তাঁকে ডেকে বলেন, “বাজান, আমি তো চললাম। আমি না থাকাকালে তুমি কি কর তা আমি দেখব। এমন কিছু কর না, যা দেখে আমার আত্মা কষ্ট পায়।” তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে জিজ্ঞেস করেন, “মাগো, বড় হয়ে কি করলে তোমার আত্মা খুশি হবে?” মা তখন ধরা গলায় বলেন, “তোমাকে নিয়ে কত স্বপ্নই তো ছিল। সব কথার বড় কথা, তুমি হবে ইসলামের একজন সাহসী সৈনিক। 

যদি আল্লাহ্ পাক তাওফীক দেন তবে বড় হয়ে ‘মাসিক নেয়ামত’-এর মতো একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে চেষ্টা করবে। আল্লাহর কথা, তার রাসূলের কথা লিখে প্রচার করবে। আমি দোয়া করে যাই, আল্লাহ তোমাকে সে শক্তি দিবেন।” ১৯৪৬ ঈসায়ীর ৮ই অক্টোবর মুতাবিক ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ২২শে আশ্বিন মঙ্গরবার মাগরিবের সময় স্নেহময়ী মাতা ইন্তিকাল করেন।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাত্রজীবন থেকেই সহিত্যচর্চা শুরু করেন। ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদরাসায় অধ্যয়নকালে ‘সাপ্তাহিক তালীম’, ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ ‘সাপ্তাহিক কাফেলা’, ‘সাপ্তাহিক নেজামে ইসলাম’, ‘দৈনিক ইনসাফ’, ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক মিল্লাত’ প্রভৃতি তখনকার বহুল প্রচারিত পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক নেজামে ইসলাম’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৫৫ ঈসায়ীর শেষের দিকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘পাসবান’ নামক বিখ্যাত উর্দূ দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং ১৯৬০ ঈসায়ীতে তা বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। 

তিনি ১৯৫৭ ঈসায়ীতে ‘আজ’ নামে ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯৫৭ ঈসায়ীর ১৫ই আগস্ট ‘আজ’-এর প্রথম সংখ্যা তখনকার সময়ের সেরা লেখকদের রচনা নিয়ে প্রকাশিত হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ‘আজ’ বাজারের সকল সাময়িকীর সাথে প্রতিযোগিতায় প্রচার সংখ্যার শীর্ষে পৌঁছে। ১৯৬০ ঈসায়ীতে কর্তৃপক্ষ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া পর্যন্ত তিনি তা সম্পাদনা করেন। 

তিনি ১৯৬০ ঈসায়ীতে ‘মাসিক দিশারী’, ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ ঈসায়ী পর্যন্ত ‘সাপ্তাহিক নয়া জামানা’ সম্পাদনা করেন এবং ১৯৬১ ঈসায়ী থেকে অদ্যবধি ‘মাসিক মদীনা’ সম্পাদনা করেছেন।

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের গফরগাঁও নির্বাচনী এলাকায় জমিয়তের প্রার্থী হিসেবে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালের সম্মেলনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে তিনি নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. ২৫ শে জুন ২০১৬ ইসায়ী মোতাবেক ১৯ শে রমজান শনিবার সন্ধ্যা ৬: ১০ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন।) পরের দিন  রবিবার বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

মৃত্যকালে স্ত্রী, ৩ ছেলে, ২ মেয়েসহ অসংখ আত্মীয় স্বজন, ভক্ত, অনুরক্ত রেখে যান। ইন্তেকালের সময় মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ. এর  বয়স হয়েছিলো প্রায় ৮১ বছর। মহান আল্লাহ্ তার এই প্রিয় বান্দাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ