|| মুহাম্মদ শাহেদ ফসীহুল বারী ||
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একত্রে বসবাস করে আসছে। এমন বৈচিত্র্যময় দেশে কোনো জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে মুসলমানদের রাজনৈতিক সাফল্য কেবল আবেগপূর্ণ স্লোগানের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা দূরদর্শিতা, ঐক্য, সাংবিধানিক সচেতনতা এবং সুদৃঢ় রাজনৈতিক কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।
আজ ভারতীয় মুসলমানরা যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, তা কেবল ধর্মীয় নয়, বরং শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকও। তাই এই সমস্যাগুলোর সমাধানও হতে হবে সামগ্রিক। যদি কোনো জাতি কেবল প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি করে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থেকে গাফিল হয়ে যায়, তবে তারা ধীরে ধীরে জাতীয় মূলধারায় নিজেদের কার্যকর ভূমিকা হারিয়ে ফেলে।
এই বাস্তবতাটিও মাথায় রাখা জরুরি যে, ভারত কেবল একটি শহর বা একটি রাজ্যের নাম নয়; এটি বিভিন্ন অঞ্চল, ভাষা এবং ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মেজাজের রাজ্যগুলোর একটি ফেডারেশন। যে রাজনৈতিক কৌশল কোনো একটি এলাকায় সফল হতে পারে, তা যে সারা দেশে একই ফলাফল দেবে—এমনটি নয়। একারণেই জাতীয় রাজনীতিকে স্থানীয় রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
আমি জনাব আসাদউদ্দিন ওয়াইসি সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি একজন প্রতিভাবান, সচেতন এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সংসদে সাংবিধানিক ও আইনি বিষয়গুলো অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা তার রয়েছে। তবে আমার ব্যক্তিগত মতে, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে এমন রাজনীতি—যার ছাপ কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে—তা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল আনতে পারে না।
আমার বিশ্বাস, ভারতীয় মুসলমানদের উচিত নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ে অটল থেকে এমন সব গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সাথে মিলে কাজ করা, যারা সংবিধান, আইনের শাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। বৃহত্তর ঐক্য, সম্মিলিত সংগ্রাম এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক অংশীদারিত্বই সেই পথ, যা মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে এনে জাতীয় রাজনীতিতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিতে পারে।
জনাব ওয়াইসি সাহেব যদি জাতীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে চান, তবে তার জন্যও বৃহত্তর বিরোধী জোট বা এমন কোনো রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের কথা বিবেচনা করা উপকারী হতে পারে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং সম্মিলিত সমস্যা সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী যৌথ কণ্ঠস্বর তৈরি হয়। এটি একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত মাত্র, যার সাথে ভিন্নমত পোষণ করা যেতে পারে।
আজ মুসলমানদের মূল প্রয়োজন কেবল ভোট দেওয়া নয়, বরং শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা, যুবসমাজকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা, সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের ইতিবাচক উপস্থিতি জোরালো করা। যখন কোনো জাতি জ্ঞান, চরিত্র, ঐক্য এবং প্রজ্ঞাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানায়, তখন তাদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হয় এবং তাদের রাজনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়।
পরিশেষে এটাই বলা যায় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞা, বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে ঐক্য এবং তাৎক্ষণিক লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ভারতীয় মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর পথ হতে পারে।
[ইউএনএ নিউজের সৌজন্যে পাওয়া লেখাটি উর্দু থেকে অনূদিত]
আওয়ার ইসলাম/জেডএম
