রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬ ।। ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২০ মহর্‌রম ১৪৪৮


গরমে শিশুদের স্বাস্থ্য পরামর্শ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| শরিফ হাসানাত ||

সময় এখন গ্রীষ্মকাল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে ঝলমলে রোদ ও তাপমাত্রা। গ্রীষ্মের এই দাবদাহে আমাদের বড়দের মতো শিশুরাও নাজেহাল। শিশুদের শরীর অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কোমল। প্রচণ্ড গরম, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা, দূষিত খাবার ও জীবাণুর সংক্রমণ এসব কারণে শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। কারণ, তাদের কোমল শরীর এখনও পরিপূর্ণভাবে পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। তাই এই সময়ে অভিভাবদের একটু বাড়তি যত্ন ও সঠিক পরিচর্যাই হতে পারে শিশুদের সুস্থতার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। এ ধরনের সমস্যা যেন না-হয় তা নিশ্চিত করতে গরমকালে শিশুর ব্যাপারে কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা পালন করা উচিত। আসুন গরমে কীভাবে শিশুর যত্ন নেয়া যায় সে সম্পর্কে কিছু জেনে নিই।   

১. শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করানো

প্রচণ্ড গরমে শিশুরা ঘেমে পানিশূন্যতা যেন না-হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। নির্দিষ্ট সময় পর পর শিশুদের পানি বা ফলের রস খেতে দিন। এছাড়া তাদের পছন্দ মতে সিজনাল ফলও খেতে দিতে পারেন। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে যে পানি বের হয়ে যায়, তা পূরণ করা খুবই জরুরি। চাইলে ডাক্তারের পরামর্শে স্যালাইন কিংবা গ্লুকোজ খাওয়াতে পারেন।

যেসব শিশুদের বয়স ৬ মাসের কম, তাদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধই একমাত্র আদর্শ খাবার। সেক্ষেত্রে বার বার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বাচ্চা খেতে না চাইলে বারে বারে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে।

২. পুষ্টিকর ও নরম খাবার খেতে দিন

৬ মাসের বেশি বয়স এমন বাচ্চার পরিপূরক খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি একজন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর সহজপাচ্য খাবার খাওয়ানো যায়।

সহজে পরিপাক ও শোষণ হবে এমন শাক সবজি, মাছ, খিচুড়ি বাচ্চাকে দিতে হবে। যতটা সম্ভব তরল বা নরম খাবার দেয়া উচিত। গরমে তেল মসলা, ভাজা ভুজি, ঝাল ঝোল ধরনের খাবার এড়িয়ে যাওয়া ছোট বড় সবার জন্যই উপকারী।

৩. সুতি কাপড় পরিধান করান

এই কাঠফাটা গরমে যেকোনো ফ্যাশনেবল পোশাকের চেয়ে সুতি ঢিলাঢালা আরামদায়ক জামা শিশুর জন্য উপযুক্ত। যদি নিতান্তই প্রয়োজন হয় তবে সুতি কাপড় দিয়ে বাচ্চার জন্য পছন্দসই জামা বানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই সিনথেটিক কাপড় ব্যবহার করা যাবে না।

সুতি কাপড়ের পানি শোষণ ক্ষমতা বেশি। তাই গরমে বাচ্চাকে সুতির জামা পরিধান করা। জামা ভিজে গেলে সাথে সাথে জামা খুলে শরীরের ঘাম মুছে দিন। ঘাম শুকিয়ে এলে অন্য জামা পরিয়ে দিতে হবে। গায়ের ঘাম যেন গায়েই না শুকায় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

৪. বাইরে নয়, ঘরেই খেলার পরিবেশ তৈরি করুন

৫ বছরের উপরের বাচ্চাদের অনেকেরই বিকেলে বাইরে খেলতে যাবার অভ্যাস থাকে। খেলাধুলা শারীরিক মানসিক বিকাশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যেহেতু ইদানীং প্রচণ্ড গরম, আর গরমে দৌড়াদৌড়ি ও ছোটাছুটি করলে শিশু ঘেমে গিয়ে ঠান্ডা  লেগে যেতে পারে। তাই ঘরেই ফ্যানের নিচে শিশুর খেলার ব্যবস্থা করুন। তার জন্য বিভিন্ন ইনডোর গেমস যা ঘরে বসেই খেলা যায় অথচ শারীরিক পরিশ্রমও হয় না এমন খেলার সরঞ্জাম কিনে দিতে পারেন।

৫. বাচ্চাদের নিয়ে দূরপাল্লার ভ্রমণ পরিহার করুন

যেহেতু শিশুদের শরীরের আমাদের চেয়ে বেশি নাজুক ও স্পর্শকাতর, তাই গরমে বাচ্চাকে নিয়ে দূর পাল্লার ভ্রমণে না যাওয়াটাই উত্তম। বিশেষ করে বদ্ধ গাড়ি কিংবা বাসে ভ্রমণ করা একেবারেই উচিত নয়। সম্ভব হলে নদীপথে লঞ্চ জার্নি করা যেতে পারে। একান্ত প্রয়োজন হলে, সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেই ভ্রমণ করুন।

৬. প্রচণ্ড রোদ থেকে দূরে রাখুন

বাইরে বের হলে গায়ে রোদ লাগা স্বাভাবিক। আর গায়ে রোদ লেগে ঘেমে গিয়ে তা থেকে অসুস্থ হওয়াও স্বাভাবিক। তাই সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না যাওয়াই ভালো। শিশুকে নিয়ে বাইরে যেতে হলে হাতে ছাতা রাখুন। সম্ভব হলে হালকা টুপি বা পাতলা স্কার্ফ দিয়ে শিশুর মাথা ঢেকে দিন। সঙ্গে রাখুন বিশুদ্ধ পানি। কিছুক্ষণ পর পর শিশুকে পানি খাওয়াতে থাকুন। হোমমেড খাবার সাথে রাখুন। যেন ক্ষুধা লাগলে বাইরের খোলা খাবার খাওয়াতে না-হয়।  

৭. নিয়মিত গোসল করান

ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে অনেকেই বাচ্চাকে নিয়মিত গোসল করাতে চান না। এই গরমে শিশুকে অবশ্যই প্রতিদিন ভালোকরে গোসল করাবেন। গোসলে হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। গোসল শেষে শিশুর মাথা ভালোভাবে মুছে দিন। কারণ ভেজা চুল থেকে ঠাণ্ডা লেগে শিশুর জ¦র, সর্দি-কাশি হতে পারে। তাই শিশুকে ফ্যানের নিচে রেখে গা ও মাখা মুছে দিতে হবে।    

৮. ঘরে আলো-বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন

ঘরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচল করছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন। যতটা সম্ভব দরজা জানালা খোলা রাখতে হবে। সম্ভব হলে শিশুকে বারান্দায় বসিয়ে খেলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এসি বা ফ্যানের বাতাস আরামদায়ক হলেও, তা প্রাকৃতিক আলো বাতাসের বিকল্প নয়।

কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন?

এত যত্ন ও সতর্কতার পরও আপনার শিশু অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। তবে উপরোক্ত সতর্কতা অবলম্বন করলে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। তাই নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন-

শিশুর চেহারা দেখে যদি অসুস্থ বলে মনে হয়

হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই গায়ের তাপমাত্রা বেড়ে যায়

অতিরিক্ত পানি পিপাসা

বার বার বমি কিংবা পাতলা পায়খানা

একেবারেই খেতে না-চাওয়া

প্রস্রাবের পরিমাণ যদি কমে যায়

চোখ বসে যায় অথবা জিহ্বা শুকনো হয়ে যায়

শিশুর মধ্যে নিস্তেজ ভাব দেখা দিলে অথবা কোনো কারণ ছাড়াই খেলাধুলা না-করলে

এ সমস্ত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞ অথবা নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। এবং ডাক্তারের পরামর্শ মত ব্যবস্থা নিতে হবে।  

শিশুদের প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে যত্নের প্রয়োজন। নিজের অস্বস্তির কথা, অসুবিধার কথা শিশুরা হয়ত সব সময় ঠিক ভাবে বলতে পারে না, আমাদের বড়দের তা শিশুর হাব ভাবে বুঝে নিতে হয়। এই প্রচণ্ড গরমে আমাদেরই যেখানে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে, সেখানে বাচ্চাদের কথা বলাই বাহুল্য!

তাই গরমে শিশু শারীরিকভাবে যেন দূর্বল না হয়ে যায় সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। যেকোনো সমস্যায় নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ