আন্তর্জাতিক ডেস্ক-
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মাদরাসা শিক্ষা, মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, সংখ্যালঘু উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন হাড়োয়া বিধানসভার বিধায়ক আব্দুল মাতিন। বাজেট অধিবেশনে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদরাসা সম্পর্কে পূর্বধারণা ও অপপ্রচারের ভিত্তিতে নয়, বরং ইতিহাস, বাস্তবতা এবং দেশের প্রতি এর অবদানের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্যের শুরুতেই তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিধায়ক হাড়োয়া বিধানসভার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হাড়োয়া শুধু একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়; এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি পীর গোরাচাঁদ, হযরত আব্বাস আলী (রহ.)-এর মাজারকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সেখানে নির্মিতব্য মিনি অডিটোরিয়ামের নাম ‘পীর আব্বাস আলী (রহ.) অডিটোরিয়াম’ রাখার প্রস্তাব দেন।
মাদরাসা শিক্ষা প্রসঙ্গে আব্দুল মাতিন বলেন, পশ্চিমবঙ্গে সিনিয়র মাদরাসা, হাই মাদরাসা ও খারেজি মাদরাসা—এই তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে খারেজি মাদরাসাগুলো দরিদ্র, এতিম ও অসহায় পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং মুসলিম সমাজের দান, যাকাত ও ফিতরার অর্থে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ মুসলিম শিক্ষার্থী সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, আর মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন মাদরাসায় অধ্যয়ন করে। তাই বিপুল সংখ্যক মুসলিম শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী—তা জানতে চান তিনি।
বিধায়ক বলেন, মাদরাসা সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগে ইতিহাস জানা জরুরি। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে আলেম-উলামা ও মাদরাসা-শিক্ষিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি, তিতুমীর এবং শহীদ আশফাক উল্লাহ খানের আত্মত্যাগ স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
তিনি বলেন, মাদরাসাকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। মাদরাসা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দেয়নি, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিকও গড়ে তুলেছে।
আব্দুল মাতিন আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জনজীবন ও রাজনীতিতে এমন বহু ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের শিক্ষাজীবন মাদরাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এটি প্রমাণ করে, মাদরাসা শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা নয়; বরং সমাজের মূলধারারই অংশ।
তিনি শিক্ষা নিয়ে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বরং মেধা, যোগ্যতা ও অবদানের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বক্তব্যে তিনি জানান, তাঁদের পরিচালিত শিশু, নারী ও ছাত্রদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য তিনি বিধানসভার সদস্য, মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ ও শুভানুধ্যায়ীদের আমন্ত্রণ জানান এবং ত্রুটি থাকলে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া (Deleted) ভোটারদের নাম যথাযথ তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে দ্রুত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি, শিক্ষার উন্নয়ন ও সকল সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অগ্রগতির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানান।
আইও/