রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ ।। ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১৩ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :

আলিয়ার পাঠ্যবইয়ে মাজার ও আহলে হাদিসপন্থা কোনোটিই ফিরে না আসুক


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| যুবায়ের আহমদ ||

আলিয়া মাদরাসা এ উপমহাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষাধারা। এ শিক্ষাধারা থেকে যেমন আলেম তৈরি হেয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে জাতীয় নেতৃত্ব। প্রতিষ্ঠা বৃটিশদের হাত ধরে হলেও ২ শত বছরের পথচলায় আলিয়া ও কওমির মূল কিতাবগুলোর সিলেবাস একই ছিল। কওমি মাদরাসায় মিযান, নাহবেমীর, হিদায়াতুন নাহু, কুদুরি, শরহে বেকায়া, হিদায়া, নুরুল আনওয়ার ও হাদিসের কিতাবগুলো যা পড়ানো হয়, আলিয়া মাদরাসায়ও এগুলোই পড়ানো হয়।

২০১১ সাল পর‌্যন্ত আলিয়া মাদসারার জেনারেল বিষয়গুলোতেও ইসলামী ভাবধারা ছিল। ইংরেজি সাহিত্য বইয়ের মূল কন্টেন্ট ছিল ইসলামী ভাবধারায় রচিত। আওয়ামী আমলে এসবে পরিবর্তন আসে। মাদরাসার বাংলা-ইংরেজি বইয়ে স্বতন্ত্র ইসলামী ভাবধারা বাদ দেওয়া হয়। ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মেয়েদের হাফপ্যান্ট পরা ছবি, অভিভাদনে সালামের পরিবর্তে গুড মর্নিং ইত্যাদি। বাংলাদেশের মাদরাসাগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থী পড়ে না, কিন্তু বইয়ের নাম বেশিরভাগই হিন্দু।

একদিকে বাংলা ইংরেজি বইগুলো থেকে ইসলামী ভাবধারা বাদ দেওয়া হয়, অন্যদিকে ‘মাজারপন্থি ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে কুরআন-হাদিসের বইগুলোতে সে সরকারের ঘনিষ্ঠ বিদআতপন্থি আলেমরা তীক্ষ্ণ কৌশলে মাজারপন্থা প্রাধান্য দেয়। তার অংশ হিসেবে মাজারে গিয়ে দোয়া করা, অলীর ওসিলা দিয়ে দোয়া করা, কদমবুসি করা এবং ওলীদের নামে ‘গাউসুল আজম’ যুক্ত করা হয়।

অষ্টম শ্রেণীর ‘আকাইদ ও ফিকহ’বইয়ের ৮৯ পৃষ্ঠায় একটি শিরোনাম ‘ওলিগণের মাজার শরিফ জেয়ারত’। সেখানে লেখা হয়ে, ‘মাজারে গিয়ে দোআ করলে দোআ কবুল হয়। মাজারে বসবাসকারী ফকির-মিসকিনদের সহায়তার জন্য মান্নত করায় কোনো ক্ষতি নেই। এখানে লেখা হয়েছে ‘ওলিগণ যেহেতু দুনিয়া ও আখেরাতে সুসংবাদপ্রাপ্ত, তাই তাদের মাজার শরিফে গিয়ে তাদেরকে ওসিলা করে দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয়বন্ধুর সম্মানে দোয়া কবুল করেন’।

এখানে যদিও মাজারে পীরের নামে মান্নত করার কথা বলা হয়নি, কিন্তু মাজারে মান্নত করা হারাম, -এসব না লিখে কেবল মাজারের ফকির-মিসকিনদের দান করা যাবে লিখে গভীর কৌশলে মাজারে মান্নত করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেখানে মাজারকেন্দ্রিক অনেক শিরক হয় সেখানে ‘মাজারের পীরের কাছে চাওয়া শিরক’ না লিখে ‘মাজারে গিয়ে দোআ করলে দোআ কবুল হয়’ বলে মাজারে চাওয়াকে প্রমোট করা হয়।

শাহ জালাল আল-ইয়ামানী প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘মুসলমানেরা তার কবরকে পবিত্র মাযার হিসাবে গ্রহণ করেছে। তারা বরকত হাছিল ও অছীলা ধরার জন্য সকাল-সন্ধ্যা তার কবর যিয়ারত করে’। আব্দুল কাদির জিলানী রহ. প্রসঙ্গে বলা হয় ‘পীরানে পীর গাউসুল আজম হযরত আব্দুল কাদির জিলানি (র.)’

লেখা হয়, আল্লাহ তায়ালার নিয়মই হলো তিনি সরাসরি সবকিছু করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো মাধ্যম ছাড়া কিছু দেন না। তাই নিজেই ওসিলা অন্বেষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাঠ্যবইয়ে ওসিলার স্বপক্ষে সূরা মায়েদার ৩৫ নম্বর আয়াতকে ব্যবহার করা হয়েছে। ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং তার কাছে ওসিলা তালাশ কর’।

ষষ্ঠ শ্রেণীর ‘আকাইদ ও ফিকহ’ ১১৩ পৃষ্ঠায় লেখা হয়, ‘হাত ও পায়ে মুহববতে, সম্মান প্রদর্শনের জন্য চুমু খাওয়া সুন্নত। এর মাধ্যমে পায়ে চুমু খেতে উৎসাহিত করা হয়।

দাখিল অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লেখা হয় ‘সৃষ্টির সূচনা ও কেন্দ্রবিন্দু যিনি। যার শান ও মানকে বুলন্দ করার জন্য এ সৃষ্টিজগৎ’। হজরত মুহাম্মদ সা: -কে না বানালে কিছুই সৃষ্টি করা হতো না। তার নূরকেই সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পরে তার নূর থেকে অন্যসব সৃষ্টি। হজরত আদমের সৃষ্টির আগে হজরত মুহাম্মদ সা: আকাশে তারকা রূপে বিদ্যমান ছিলেন’। এর মাধ্যমে নূরনবী ও নুরের নবী প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। 

কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা: দাখিল অষ্টম শ্রেণীর আকাইদ ও ফিকহ বইয়ের ২১১ পৃষ্ঠায় শবেবরাত বিষয়ে লেখা হয়েছে, ‘শবেবরাতকে কুরআন মজিদে লাইলাতুল মুবারাকান বা বরকতময় রাত হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।নিশ্চয়ই আমি এ কুরআনকে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে’ (সূরা দোখান : ২)। এ আয়াতে বলা হয়েছে, যে রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে সে রাত ‘লাইলাতুম মুবারকা’। আর কুরআনের সুরা কদরে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কুরআন নাজিল হয়েছে লাইলাতুল কদরে। 

আমলের বর্ণনায়ও অনেককিছু বাড়িয়ে লেখা হয়েছিল। ইবতেদায়ি ৩য় শ্রেণির আ্কাইদ ও ফিকহ বইয়ের পৃ. ১৯  পাঠ-০২ এ লেখা হয়, ‘নামাজের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা উত্তম’। এভাবে ১৯ ও ২০ পৃষ্ঠা জুড়ে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের অর্থসহ আরবী নিয়ত হয়। অথচর্ ফকিহগণ বলেছেন, মুখে উচ্চারণ করে বলা জরুরি নয়। মুখে যা উচ্চারণ করা হয় সেটা শুধু বলাই হয় করা হয় না। তবে কেউ ভুলে গেলে বা নিয়তই না করে দাড়িয়ে যাবার আশংকা করলে মুখেও উচ্চারণ করে নেয় তবে তা দোষণীয় হবে না ‘ ওই বইয়ে বাংলায় নিয়ত বলা বা পাঠ করাকে উত্তম বলা হয়।

এ বিষয়গুলো ইন্টেরিম আমলে সংশোধন করা হয়। কিন্তু যাদের দিয়ে সংশোধন করানো হয় তাদের কেউ কেউ আহলে হাদিস ঘরানার হওয়ায় প্রয়োজনী কিছু বাদ পড়ে বলে অভিয়োগ আসে। অভিয়োগগুলোর সব আমলে নেবার মতো না হলেও  বেশ কিছু আছে বাস্তব।  বিশেষত ৮ম শ্রেণির বইয়ে পর্দার সংজ্ঞায় চেহারাকে বাদ দেওয়া এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা জিয়ারতসহ কিছূ অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়।

এবার আবার সে বই সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আবার সেই 'মাজারপন্থা' ফিরে আসে কি-না। সরকারের কাছে দাবি, এবার যেন কোনো প্রান্তিকতাই না থেকে ভারসাম্যপূর্ণ সংশোধন হয়। ‍আমরা মাজারপন্থি সংশোধনও দেখতে চাই না, আহলে হাদিসপন্থি সংশোধনও দেখতে চাই না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা আলিয়া ও কওমি ধারার মৌলিক কিতাবগুলোর অভিন্নতা অটুট থাকুক!

দেশের একজন নাগরিক ও ইসলামী শিক্ষার ক্ষুদ্র একজন অংশীজন হিসেবে আমার দাবি, আলিয়া মাদরাসার কিতাবগুলো সংশোধনে আলিয়া মাদরাসার উস্তাযগণের পাশাপাশি বেফাক বা হাইয়াতুল উলইয়া থেকেও ২ জন প্রতিনিধি রাখা হোক! কারণ, বাংলাদেশে মাজারপন্থা ও আহলে হাদিসপন্থার মাঝখানে ভারসাম্যপূর্ণ ধারা হলো কওমি। এ ক্ষেত্রে দলাদলি না করে সরকার ও আলিয়া সংশ্লিষ্টরাও আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন বলে আশা করি।

বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষায় মরহুম মাওলানা আব্দুল মান্নান ও জমিয়তুল মুদাররেসিনের অনেক অবদান আছে। ভবিষ্যৎ বিতর্ক এড়াতে তারা এবং আলিয়া মাদরাসা শিক্ষকদের অন্যান্য সংগঠনগুলোও বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে নেবেন বলে আশা করি।

লেখক: মুহাদ্দিস, সালনা ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, গাজীপুর

জেডএম


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ