নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) বলেছেন, শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো ভুল বারবার করার কারণেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন হয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক শাসনই প্রকৃত আদর্শ শাসন।
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীতে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস: চেতনায় জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ঝুঁকি নিয়েও রাজপথে ছিল। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই বাইতুল মোকাররমে ইসলামী যুব আন্দোলনের সমাবেশ ও মিছিলে আমি নিজে এবং আমার দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলাম। সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের বাহিনী আমাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। আমি এবং দলের শীর্ষ নেতারা গুলির মুখেও রাজপথ ছাড়িনি। তখনই বলেছিলাম, যত শক্তিশালীই হোক, ফ্যাসিবাদের পতন হবেই। আল্লাহর রহমতে পতন হয়েছে, কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে তরুণরা আন্দোলন করেছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি গণআন্দোলন ও অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতা এমন শক্তির হাতে গেছে, যাদের কাছে ইসলাম, দেশ ও মানবতা নিরাপদ ছিল না। এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তির কারণেই জাতিকে বারবার হতাশার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান মুজাহিদ। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুফতি রহমাতুল্লাহ বিন হাবিব এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা ইলিয়াস হাসান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ১৯ জুলাই ২০২৪ সালে ঢাকায় পীর সাহেব চরমোনাইয়ের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত যুব আন্দোলনের সমাবেশ ও মিছিলে পুলিশের গুলিতে শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে দলীয় প্রধান হিসেবে যেভাবে পীর সাহেব চরমোনাই সরাসরি রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্য কোনো দলের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে অনেক রাজনৈতিক দল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা দুঃখজনক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রস্তাব তৈরির সময় এনসিপি অনেক বিষয়ে বিএনপির অবস্থানকে সমর্থন করলেও পরে নির্বাচনের সময় আবার বিএনপি-বিরোধী অবস্থান নেয়, যা জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে গাজী আতাউর রহমান বলেন, নির্বাচনের জন্য জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে পরে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। অন্যথায় দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে আবারও রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
সভায় প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্তরে এখনো ভারতপন্থী প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। দেশ ও ইসলামের স্বার্থ রক্ষায় এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ নেছার উদ্দীন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও তাদের মধ্যে পতিত স্বৈরাচারের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত প্রত্যাশা বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে তার পরিণতি শুভ হবে না। তিনি জুলাই মাসের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সহকারী মহাসচিব কে এম আতিকুর রহমান বলেন, স্বৈরাচারের প্রভাব এখনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য আল্লাহভীরু, সৎ ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী যুব আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, জুলাই আন্দোলন প্রমাণ করেছে দেশের তরুণদের মতামত উপেক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি দ্রুত জুলাই সনদ কার্যকর এবং জুলাই জাদুঘর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ আল মামুন, যুব আন্দোলনের দফতর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক মুহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দীক, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক অ্যাডভোকেট বায়েজীদ হোসাইন, নগর উত্তর সভাপতি হাম্মাদ বিন মোশাররফ, নগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নেছার উদ্দিন হুজাইফ এবং বৈষম্যবিরোধী কওমী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যসচিব মাকসুদুর রহমান জুনায়েদ প্রমুখ।
আইও/