|| শরিফ হাসানাত ||
খাবার মানুষের জীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে। ইসলাম খাদ্য গ্রহণকে কেবল একটি দৈহিক প্রয়োজন হিসেবে দেখেনি; বরং সঠিক নিয়ত ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে এটিকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। কারণ খাদ্য আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত।
তাই একজন মুমিন কী খাবেন, কীভাবে খাবেন এবং কতটুকু খাবেন—এসব বিষয়ে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর খাদ্যাভ্যাস ছিল পরিমিত, পরিচ্ছন্ন, সাদামাটা ও বরকতময়। সুস্থ ও নির্মল জীবনযাপন এবং বরকতপূর্ণ জীবনের জন্য নবীজির সুন্নাত এক অনন্য আদর্শ।
হাত ধুয়ে শুরু ও শেষ করা
খাবার শুরু করার আগে ভালোভাবে হাত ধৌত করা। এতে হাতে লেগে থাকা জীবাণু মুক্ত হয়। অন্যথায় নানারকম রোগাক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। এই জন্যই নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাবার গ্রহণের আগে ও পরে হাত ধুয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানাহারের আগে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাওয়ার পর কুলি করতেন এবং হাত ধৌত করতেন। (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)
খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা
নবীজি (সা.) সবসময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাবার খেতেন এবং সাহাবিদেরও খাবার গ্রহণের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে উৎসাহিত করতেন। তিনি থালার এদিক-সেদিক থেকে এলোমেলোভাবে খাওয়াকে পছন্দ করতেন না; বরং নিজের সামনে থেকে খাবার খেতে বলতেন। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শে আমরা খাবার গ্রহণের সুন্দর শিষ্টাচারের শিক্ষা পাই।
উমর ইবনে আবি সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছোটবেলায় একবার আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ছিলাম। খাবার পরিবেশন করা হলে আমি থালার চারপাশে হাত ঘুরিয়ে খেতে শুরু করলাম। তখন নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, ‘বৎস! বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।’ এরপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি এভাবেই খেয়ে আসছি। (সহিহ বুখারি, ৫৩৭৬; সহিহ মুসলিম, ২০২২)
খাবার শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ বলা সুন্নাত।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খেতে বসে, সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। আর যদি খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তাহলে সে যেন বলে—“বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।” (সুনানে আবু দাউদ, ৩৭৬৭; জামে তিরমিজি, ১৮৫৮)
দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া
আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, "রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো উঁচু খাবার টেবিল (খিওয়ান)-এ বসে আহার করেননি।"
বর্ণনাকারীকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে তিনি কীসের ওপর খাবার খেতেন? তিনি বললেন, "চামড়ার দস্তরখানের (সুফরা) ওপর।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৮৬)
পড়ে যাওয়া লোকমা উঠিয়ে খাওয়া
শয়তান মানুষের প্রতিটি কাজে অংশ নেয়। যাতে করে সেটা থেকে বরকত ছিনিয়ে নিতে পারে। সবসময় তৎপর থাকে নষ্ট করবার জন্যে। কোনো লোকমা পড়ে গেলে সেটি উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেতে বলেছেন। যেন আল্লাহর বরকত থেকে বঞ্চিত না হই।
হজরত জাবের (রা.) বলেন, আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: ‘শয়তান তোমাদের প্রত্যেকটি কাজের সময় উপস্থিত থাকে। এমনকি খাওয়ার সময়ও। সুতরাং খাওয়ার সময় যদি তোমাদের কারও লোকমা পড়ে যায়, তবে যেন সেটা উঠিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে খেয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য ফেলে না-রাখে। খাওয়া শেষ হলে যেন অঙুলগুলো চেটে খায়। কেননা খাওয়ার কোন্ অংশে বরকত রয়েছে সেটা কারও জানা নেই। (সহিহ মুসলিম ২০৩৩)
আঙুল চেটে খাওয়া
টিস্যু বা এ জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে হাত মোছার আগে সেটা চেটে খাওয়া সুন্নত। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমার কেউ যখন খাবার গ্রহণ করে তখন নিজে কিংবা অন্য কেউ হাত চাটার আগে যেন সেটা মুছে না-ফেলে। (বুখারী ৫৪৫৬, মুসলি ম ২০৩৩)
থালা পরিস্কার করে খাওয়া
খাবার শেষে থালার চারপাশ থেকে পরিষ্কার করে খাওয়া। কোনো খাদ্য দানা যেন অবশিষ্ট না-থাকে। কেননা হতে পারে বাকি থাকা কোনো দানার ভেতরেই বরকত রয়ে গেছে।
আনাস (রা.) বলেন, “নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে থালা পরিষ্কার করে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।” (মুসলিম ২০৩৪)
অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকে যেন থালা পরিষ্কার করে খায়।” (মুসলিম ২০৩৫)
তিন আঙুল দ্বারা খাওয়া
যেসব খাবারে তিন আঙুল ব্যবহার করা যায় সেসব খাবারে ক্ষেত্রে তিন আঙুল দ্বারা খাওয়া সুন্নত। কা’ব ইবনে মালেক (রা.)-এর হাদিস। তিনি বলেন, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন আঙুলে খেতেন। মুছে ফেলার আগে তিনি আঙুল চেটে খেতেন। (মুসলিম ২০৩২)
খাওয়ার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কোনো বান্দা খাবার গ্রহণ করার পরে আল্লাহর প্রশংসা করলে, কিংবা পান করার পরে আল্লাহর প্রশংসা করলে, আল্লাহ সেই বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহর প্রশংসামূলক বিভিন্ন দুআ হাদিসে এসেছে। তন্মধ্যে:
উচ্চারণ: “আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আত'আমানা ওয়া সাক্বানা ওয়া জা'আলানা মিনাল মুসলিমীন।”
অর্থ: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের আহার করিয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং আমাদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।"
একসঙ্গে খাওয়া
আলাদা আলাদা না-খেয়ে এক সাথে খাওয়া সুন্নত। এতে পরষ্পরের মাধ্যে মহব্বত সৃষ্টি হয়। এতে রয়েছে আল্লাহর বরকতও। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ‘এক জনের খাবার দুই জনের জন্য যথেষ্ট, দুই জনের খাবার চার জনের জন্য যথেষ্ট। চার জনের খাবার আট জনের জন্য যথেষ্ট। (মসলিম ২০৫৯)
খাবার ভালো লাগলে প্রশংসা করা
খাবার ভালো লাগলে প্রশংসা করা সুন্নত। তবে তা বাস্তবতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। জাবেন ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) তার পরিবারের কাছে তরকারি চাইলেন। তারা বললেন, সামান্য সিরকা ছাড়া কিছু নেই। তিনি তখন সেটাই নিলেন এবং খেতে খেতে বললেন, সিরকা কত উত্তম তরকারি, সিরকা কত উত্তম তরকারি। (মুসলিম ২০৫২)
তখনকার সময় সিরকা ছিল তরকারি জাতীয় খাবার। এখনকার সিরকার মতো টক ছিল না, মিষ্টি ছিল।
শাইখ বিন উসাইমীন (রহ.) বলেন, খাবার ভালো হলে প্রশংসা করতে হবে - এ ব্যাপারেও নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দিকনির্দেশনা রয়েছে। সুতরাং কারও কাছে যদি রুটি ভালো লাগে এবং সেটার প্রশংসা করে তবে এটাও নবীজি (সা.)-এর সুন্নাত’। (শরহে রিয়াজসু সালেহীন- ২/১০৫৭)
অথচ আজকাল আমরা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই সুন্নতকে ভুলেই গিয়েছি। শুধু তা-ই নয় এর বিপরীতে কাজ করছি। খাবারের প্রশংসার বদলে দোষ ধরা হয়। সমালোচনা করা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এটা নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শের পুরো উলটো।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো খাবারের দোষ ধরেননি। ভালো লাগলে খেতেন, না-লাগলে খেতেন না। (বুখারী ৩৫৬৩, মুসলিম ২০৬৪)
খাবার আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। এই নিয়ামতের যথাযথ কদর করা আমাদের কর্তব্য। তাই আহার করার সময়ও ইসলামের শেখানো আদব ও শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ থেকেই আমরা খাবার গ্রহণের এসব সুন্দর শিক্ষা পেয়েছি। কারণ, একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই হওয়া উচিত সুন্নতের আলোকে। সুন্নতের অনুসরণেই জীবন হয়ে ওঠে সুন্দর, আলোকিত ও মহিমান্বিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণভাবে সুন্নতের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন। আমিন।
এসএইচ/