|| শরিফ হাসানাত ||
মানব শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মুখ—যা মহান আল্লাহর জিকির এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রধান মাধ্যম। এই মুখ ও দাঁতকে রোগ এবং দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য ইসলামে যে সুন্নাহ আমলটি নির্দেশিত হয়েছে তা হলো ‘মিসওয়াক’। এটি যেমন একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, তেমনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং নবীগণের সুন্নাহর অনুসরণও বটে।
সিওয়াক শব্দটি আরবি ‘সাক’ শব্দমূল থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ—ঘষা, মাজা বা মর্দন করা। এর কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দ হলো দাঁতন। পরিভাষায় দাঁত থেকে হলুদ বর্ণ বা ময়লা দূর করার জন্য কোনো গাছের ডাল ব্যবহার করাকে মিসওয়াক বলা হয়। তবে মিসওয়াকের মূল উদ্দেশ্য মুখ পরিষ্কার করা।
মানবপ্রকৃতির সহজাত বৈশিষ্ট্য
মিসওয়াক করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের শাখা। ইসলাম নিজেকে পাক-সাফ রাখার বিশেষ তাগিদ দেয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দশটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ: (১) গোঁফ ছাঁটা, (২) দাড়ি ছেড়ে দেওয়া, (৩) মিসওয়াক করা, (৪) নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, (৫) নখ কাটা, (৬) আঙুলের জোড়াসমূহ ধোয়া, (৭) বগলের লোম তুলে ফেলা, (৮) গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা, (৯) পানি দ্বারা এস্তেঞ্জা করা।
যাকারিয়া (রহ.) বলেন, মুস‘আব (রহ.) বলেছেন, আমি ১০ নং আচরণটি ভুলে গেছি, তবে মনে হয় তা কুলি করা হবে।’ (মুসলিম হা/২৬১; তিরমিযী হা/২৭৫৭; সহিহুল জামে‘ হা/ ৪০০৯)
নবীজি (সা.)-এর জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব
নবীজি (সা.)-এর গোটা জীবনে মিসওয়াকের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ, যত্ন ও ভালোবাসা। ব্যক্তিগত জীবনে মিসওয়াককে এক অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ করেছিলেন তিনি।
আমির ইবনে রাবী‘আহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে সিয়াম অবস্থায় অসংখ্যবার মিসওয়াক করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি: ১৯৩৪)
কেবল দাঁত নয়, পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতার জন্য তিনি জিহ্বাও পরিষ্কার করতেন।
আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমি রাসুল (সা.)-এর নিকট প্রবেশ করলাম, তখন মিসওয়াকের একটি দিক তাঁর জিভের ওপর রাখা ছিল।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৪; সহিহ মুসলিম: ৬১৫)
সাহাবাগণের জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব
সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের জীবনেও নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহকে পরিপূর্ণ অনুসরণ করছিলেন। আর মিসওয়াককে বানিয়েছিলেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আবূ সালামাহ বলেন, ‘আমি যায়িদ (রা.)-কে দেখেছি, তিনি মসজিদে বসে থাকতেন, আর মিসওয়াক তাঁর কানের ওই স্থানে লেগে থাকত, যেখানে লেখকের কলম থাকে। অতঃপর যখনই তিনি সালাতের জন্য দাঁড়াতেন, মিসওয়াক করে নিতেন।’ (আবু দাউদ: ৪৭; তিরমিযী: ২৩)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (সা.) মিসওয়াক করে তা ধোয়ার জন্য আমাকে দিতেন। আমি নিজে প্রথমে তা দিয়ে মিসওয়াক করতাম। অতঃপর সেটা ধুয়ে তাঁকে দিতাম।’ (আবু দাউদ: ৫২; বায়হাক্বী: ১৭২)
মিসওয়াকের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের এই গুরুত্ব প্রমাণ করে যে, মিসওয়াক মুমিনের ব্যক্তিত্ব এবং ইবাদতের এক মর্যাদাবান অলঙ্কার।
মিসওয়াক ফরজ হওয়ার আশঙ্কা
ইসলাম যেসব বিষয়ের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেছে, মিসওয়াক এর মধ্যে অন্যতম। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা এতই বেশি যে, স্বয়ং রাসুল (সা.) এটি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জিবরীল (আ.) আমাকে (এত বেশি) দাঁতন করতে আদেশ করেছেন যে, তাতে আমি আমার দাঁত ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা করতাম।’ (বাযযার: ৬৯৫২; সিলসিলা ছহিহা: ১৫৫৬)
অন্য এক বর্ণনায় ওয়াসেলাহ বিন আসকবা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে (এত বেশি) দাঁতন করতে আদেশ করা হয়েছে যে, এতে আমার ভয় হতো যে, না জানি দাঁতন করা আমার ওপর ফরজ করে দেওয়া হয়।’ (আহমাদ: ১৬০০৭; সহিহুল জামে: ১৩৭৬)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমাকে মিসওয়াকের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমার ধারণা হতে লাগল যে, এ সম্পর্কে হয়তো আমার ওপর কুরআন নাজিল হবে, ওহি নাজিল হবে।’ (আহমাদ: ৩১২২; আবু ই‘য়ালা: ২৩৩০)
এসব বর্ণনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, মিসওয়াক ইসলামী শরীয়তে একটি বিশেষ আমল। একে সাধারণ অভ্যাস মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
মিসওয়াকের আবশ্যকতা ও উম্মতের প্রতি করুণা
প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করাকে আবশ্যক করতে চেয়েছিলেন নবীজি (সা.)। উম্মতের কষ্টের কথা ভেবে তিনি তা করেননি।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমি আমার উম্মতের ওপর বা লোকেদের ওপর কঠিন মনে না করতাম, তাহলে প্রতিটি নামাজের সাথে মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম।’ (বুখারি: ৮৮৭; মুসলিম: ৬১২)
অন্য হাদিসে বলেছেন, ‘আমি আমার উম্মতের পক্ষে কষ্টকর মনে না করলে (প্রত্যেক) অজুর সাথে মিসওয়াক করা ফরজ করে দিতাম এবং এশার নামাজ অর্ধেক রাত পর্যন্ত দেরি করে পড়তাম।’ (হাকেম হা/৫১৬; বায়হাক্বী হা/১৪৬; ছহিহুল জামে‘ হা/৫৩১৯)
মিসওয়াকের প্রতি নবীজি (সা.)-এর গুরুত্ব
মিসওয়াক করার ব্যাপারে রাসুল (সা.) তাঁর উম্মতকে বারবার তাকিদ দিয়েছেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদেরকে মিসওয়াক করার জন্য বেশি তাকিদ করেছি।’ (বুখারি হা/৮৮৮; নাসাঈ হা/৬; ছহিহুল জামে‘ হা/১২০০)
মিসওয়াক অন্যান্য দিনের মতো জুমুআর পবিত্রতা অর্জনেও মিসওয়াককে বিশেষ তাকিদ দিয়েছেন।
রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন, ‘জুমু‘আর দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য গোসল করা কর্তব্য। আর তারা মিসওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।’
ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ
মিসওয়াককারীর জন্য পরকালের পুরস্কারের পাশাপাশি ইবাদতের মুহূর্তে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি দিনে বা রাতে নামাজে দাঁড়াতে চায়, ফলে সে সুন্দর করে অজু করে ও মিসওয়াক করে অতঃপর নামাজ আদায় করে, তাহলে একজন ফেরেশতা তার কাছে আসে এবং তার নিকটবর্তী হয়; এমনকি তার মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে দেয়। সুতরাং সে যা তিলাওয়াত করে তা ফেরেশতার মুখের মধ্যে যায়। আর যদি মিসওয়াক না করে, তাহলে ফেরেশতা তার কাছে আসে কিন্তু তার মুখের সাথে মুখ লাগায় না।’ (ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ হা/১২০৫; ছহিহুল জামে‘ হা/৭২৩)
তাই কুরআনের ধারক হিসেবে আমাদের মুখকে মিসওয়াকের মাধ্যমে পবিত্র রাখা কর্তব্য।
উল্লেখ্য যে, ‘যে নামাজ মিসওয়াক করে আদায় করা হয়, সেই নামাজে মিসওয়াক করা ছাড়া নামাজের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হয়।’ (মিশকাত হা/৩৮৯)
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ
মিসওয়াকের মাধ্যমে মুখ ও দাঁত যেমন পরিষ্কার হয়, তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টিও লাভ হয়।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কারকারী ও প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের উপায়।’ (আহমাদ হা/২৪২০৩; নাসাঈ হা/৫)
মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উছায়মীন (রহ.) বলেন, ‘এ হাদিসে মিসওয়াকের দুটি উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে। একটি দুনিয়াতে মুখ পরিষ্কার হওয়া, অন্যটি আখেরাতে মহান রবের সন্তুষ্টি।’ (শরহুল মুমতে‘ ‘আলা যাতিল মুসকাক্বনি ১/১৪৭)
নবীজি (সা.) যখন মিসওয়াক করতেন
ঘুম থেকে জেগে : রাসুল (সা.) ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াক করতেন। হুযায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ঘুম থেকে উঠতেন, তখন তিনি মিসওয়াক দ্বারা তাঁর মুখ পরিষ্কার করে নিতেন।’ (বুখারী হা/২৪৫, ১১৩৬; মুসলিম হা/৬১৬-৬১৮)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন রাতে জাগ্রত হতেন, মিসওয়াক করতেন এবং অজু করে সালাত পড়তেন।’ (মুসলিম হা/১৭৭৩)
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর সময় মিসওয়াক পাশে রাখতেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রথমেই তিনি মিসওয়াক করতেন।’ (আহমাদ হা/৫৯৭৯)
ঘরে প্রবেশের পর : ঘরে প্রবেশ করে তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, প্রথমে মিসওয়াক করতেন।’ (মুসলিম হা/২৫৩; আহমাদ হা/২৫৫৫৩; আবু দাউদ হা/৫১)
শুরায়হ ইবনে হানী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, বলুন তো রাসুল (সা.)-এর ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে কোন কাজটি করতেন? তিনি বললেন, মিসওয়াক।’ (মুসলিম হা/২৫৩; মিশকাত হা/৩৭৭)
নামাজের আগে : সালাতের আগে তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘(রাতের বিতর নামাজের জন্য) আমি পূর্ব থেকেই রাসুল (সা.)-এর মিসওয়াক ও অজুর পানির ব্যবস্থা করে রাখতাম। আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁকে ঘুম থেকে সজাগ করতে চাইতেন, উঠাতেন। তিনি প্রথমে মিসওয়াক করতেন, তারপর অজু করতেন।’ (মুসলিম হা/৭৪৬; মিশকাত হা/১২৫৭)
তিনি নামাজের ফাঁকে মিসওয়াক করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) রাতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন, অতঃপর অবসর হয়ে মিসওয়াক করতেন।’ (আহমাদ হা/১৮৮১; নাসাঈ হা/৭০৫)
মৃত্যুর আগে: ‘আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) আমার ঘরে আমার পালার দিনে এবং আমার গণ্ড ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নবী করীম (সা.) অসুস্থ হলে আমাদের মধ্যকার কেউ দো‘আ পড়ে তাঁকে ঝাড়-ফুঁক করতেন। আমি নবী (সা.)-কে ঝাড়-ফুঁক করার জন্য তাঁর কাছে গেলাম। তখন তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই), উচ্চে সমাসীন মহান বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই)। এ সময় আব্দুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রা.) আগমন করলেন। তাঁর হাতে মিসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। নবী করীম (সা.) তখন সেদিকে তাকালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবী করীম (সা.)-এর মিসওয়াকের প্রয়োজন। তখন আমি সেটি নিয়ে চিবালাম, ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করলাম এবং নবী (সা.)-কে তা দিলাম। তখন তিনি এর দ্বারা এত সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার করলেন যে, এর আগে কখনও এরূপ করেননি। তারপর তা আমাকে দিলেন। এরপর তাঁর হাত ঢলে পড়ল অথবা রাবী বলেন, তাঁর হাত থেকে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তা‘আলা আমার থুথুকে নবী (সা.)-এর থুথুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন—তার এ দুনিয়ার শেষ দিনে এবং আখিরাতের প্রথম দিনে। (বুখারি হা/৪৪পাঁচি/৪৪৫১)
নিয়মিত মিসওয়াক করার অভ্যাস একদিকে যেমন আমাদের আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে গড়ে তোলে, অন্যদিকে সমাজ ও পরিবারে আমাদের ব্যক্তিত্বকে সতেজ ও আকর্ষণীয় করে তোলে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জীবনকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করার এবং এর মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন।
আইও/