নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবি উপেক্ষা করা হলে সংবিধান পুনর্লিখনের আন্দোলনে অগ্রসর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের নামে সনদের মূল উদ্দেশ্য পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই সনদ স্বাক্ষরের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দল-মত, শ্রেণি ও পেশার বিভেদ অতিক্রম করে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। জুলাই সনদ সেই আকাঙ্ক্ষার রাজনৈতিক প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল, তা বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সেই আকাঙ্ক্ষাকে আরও ব্যাপক ভিত্তি দিয়েছে। জনগণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে উঠে আসা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের প্রত্যাশা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোতে বিএনপির ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সনদে স্বাক্ষরের সময় সংযুক্ত ব্যাখ্যা ও পাদটীকার মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়ায় মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের শর্ত রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে জনগণের অভিপ্রায়কে দুর্বল করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবের পক্ষে গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করা হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।
মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকায় কর্তৃত্ববাদী শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঝুঁকি রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো সরকারপ্রধান যাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে না পারেন, সে জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই সনদের অন্যতম উদ্দেশ্যও এ কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করা।
জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান
বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্ত করা উচিত নয়। বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের লক্ষ্য করে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা জুলাইয়ের ঐক্য ও আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রাম ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আলেম সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদের কার্যকর বাস্তবায়ন, সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত, বৈষম্যহীন ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উপেক্ষা করা হলে সংবিধান পুনর্লিখনের আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হওয়া হবে।
এসএইচ/