বেলায়েত হুসাইন।।
দেশের বরেণ্য আলেমদীন আল্লামা নর হোসাইন কাসেমী রাহ.-এর নামে প্রতিষ্ঠিত রাজধানীর উত্তরার দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়াতুন নুর আল কাসেমিয়ার স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভিত্তিস্থাপন উপলক্ষে দু’আ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
আজ শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) তুরাগস্থ উত্তরা নয়ানগর চেয়ারম্যান বাড়ি মোড়ে দুপুর ১২টায় ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনের পূর্বে জুমার নামাজের ইমামতি ও খুতবা প্রদান করেন আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আশহাদ রশিদী।
জুমার খুতবায় প্রধান মেহমান আল্লামা সাইয়্যেদ আশহাদ রশিদী বলেন, ‘আজকের দিনটা খুব বরকতময়। এই স্থান এবং এই মজলিসটাও খুব বরকতময়। আমি নালায়েক নিজের থেকে কিছু বলে আজকের দিনের বরকত নষ্ট করতে চাইনা। তাছাড়া আমার এমন কোন যোগ্যতাও নেই যে, আমি আপনাদেরকে নসিহা পেশ করব। আমি কেবল অন্যের নসিহা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব যা ইতিহাসে নিতান্তই বিরল। আর হ্যাঁ, এমন নসীহা পৃথিবীতে এর আগে কেউ কখনোই করেননি।
তিনি আর কেউ নন, ‘লোকমান হেকিম রহ.। ইতিহাসে এই নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। মহাসত্যের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই মহা মনীষীর নাম উল্লেখ আছে। এমনকি উল্লেখ আছে তাঁর নসিহাও। যা তিনি নিজের ছেলের উদ্দেশ্যে করেছিলেন।
তখনকার মানুষ লোকমান হেকিম রহ. এর উপদেশ শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে আসতো এবং ভীড় জমাতো। সেকালের লোকেরা আত্মশুদ্ধির পথ পেত তাঁর কথায়।
নিজ সন্তানকে উদ্দেশ্য করে যে নসীহত করেছিলেন তা আল্লাহর কাছে এতটাই প্রিয় হয় যে, মহান আল্লাহ তায়ালা তা কুরআনুল কারীমে নাযিল করেন। মনে রাখবেন এই নসীহত কেবল সেকালের লোকদের জন্য না, তা সর্বযুগে সর্বশ্রেণীর লোকদের জন্য। আর আমি সেখান থেকে চারটি নসিহা আপনাদেরকে শোনাব ইন শা আল্লাহ।
‘হে আমার সন্তান! কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি পাথরের ভেতর অথবা আকাশে কিংবা ভূ-গর্ভেও (লুকায়িত) থাকে, তবে আল্লাহ তা (কিয়ামতের দিন হিসাব নিকাশের জন্য) উপস্থিত করবেন। কারণ, আল্লাহ গুপ্ত বিষয় জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সূরা লোকমান, আয়াত: ১৬)
সুতরাং মনে রাখবেন! আপনি যত ছোট গোনাহ যত গোপনেই করেন না কেন, আল্লাহ তায়ালা তার হিসেব নিবেন। তিনি সর্বদ্রষ্টা। তাই আমাদের কর্তব্য হল, গোনাহের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা। যদি না করি আমরা, তাহলে বুঝে নিবেন আমরা কোনদিন মানুষই হতে পারিনি। আমরা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
এটা স্পষ্ট কথা, যে হৃদয়ে আল্লাহর ভয় নেই সে হৃদয়ের অধিকারী ব্যাক্তি কোনোদিন মানুষ হতে পারেনি। সে বরং নিকৃষ্ট জানোয়ার। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন, ‘এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত! তারাই হল উদাসীন। (সূরা আ’রাফ, আয়াত: ১৭৯)
কেননা আল্লাহর ভয় না থাকলে মানুষ কোনো ধরনের গোনাহ থেকেও বাঁচতে পারেনা।
‘বৎস হে, নামাজ কায়েম করো।’ (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৭)
লোকমান হেকিমের এই নসিহা মুসলিম উম্মাহর জন্য অপরিসীম গুরুত্ব রাখে। অথচ আমাদের বাস্তবতা হল, আমরা নামাজ ছেড়ে মোবাইলে সময় ব্যায় করি। মোবাইল দিয়ে কত যে গোনাহ করি তাঁর হিসাব মিলানো ভার। ভাইয়েরা আমার! পূর্বের নসিহতটুকুন একটু স্মরণ করুন! আমার রব সব দেখেন। হিসেবও নিবেন।
নামাজের ব্যাপারে আমরা এতটাই উদাসীন যে, অনেকেই আমরা এমন আছি যারা কেবল জুমুআর নামাজটা পড়ি। আবার অনেকেই এমন আছি, যারা দুই বা তিন ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আহা! কতটা কষ্টের কথা। আমরা যারা এমন করি তারা কেবল নিজের মনের বা কুপ্রবৃত্তির পূজা করি, আল্লাহর ইবাদত কখনোই করিনা। সুতরাং আল্লাহ আমাদের সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার তাওফীক দান করুন, আমীন।
‘সৎ কাজের আদেশ করো এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৭)
দেখুন, এখানে একটা লক্ষণীয় ব্যাপার আছে, লুকমান হেকিম তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়েছেন 'নিজের সাথে নিজের সমাজটাও ঠিক করো।'
সাইয়িদ আশহাদ রশিদী হাফিজাহুল্লাহ তখন এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান, মেম্বার ও উপস্থিত কাউন্সিলরদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা সমাজ শোধরানোর কথা চিন্তা করুন! সৎ কাজের আদেশ দেন এবং পাশাপাশি অসৎ কাজ হতে মানুষদেরকে নিষেধ করেন।
যদি পুরো সমাজ কোন অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে তাহলে পুরো সমাজকে অন্যায় থেকে ফেরানো আপনাদের কাজ, এবং মনে রাখবেন অন্তত চেষ্টা করা আপনাদের কাজ। আর এটাই ইবাদত। আপনি যদি ভাবেন যে, আপনি একা গোনাহ মুক্ত জীবন গড়তে পারলেই বেঁচে যাবেন তাহলে ভুল। কারণ সমাজকে গোনাহ থেকে ফেরানোর চেষ্টা না করে আপনি প্রমাণ করলেন, সমাজের উপর আপনার কোন দায়বদ্ধতা নেই। এতে করে আপনিও অপরাধী ব্যাক্তির বরাবর হবেন। এবং এহেন কর্মকাণ্ডের কারণেই যখন আল্লাহর গজব আসবে তখন পুরো সমাজের উপর আসবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের এবং আমাদের সমাজকে কবুল করুন। গোনাহ মুক্ত জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন, আমীন।
দুপুর ১২ টায় প্রধান মেহমান, প্রধান অতিথি, ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের শীর্ষস্থানীয় প্রখ্যাত উলামায়ে কেরাম, মাদ্রাসার মুহতামিমবৃন্দ এবং স্থানীয় অন্যান্য গণমান্য ব্যক্তিবর্গ জামিয়া ক্যাম্পাস মসজিদে আগমন করলে জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নমুনায়ে কাসেমী আল্লামা হাফেজ নাজমুল হাসান কাসেমী ও জামিয়ার শিক্ষা পরিচালক মুফতি হাবিবুর রহমান কাসেমী'সহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান। এসময় জামিয়ার ছাত্ররা রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানান।
জুমার নামাজ শেষে আওলাদে রাসূল সাইয়্যেদ আশহাদ রশিদী'সহ শীর্ষ স্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ জামিয়া ক্যাম্পাস উদ্ভোদন করেন এবং সর্বশেষ আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রাহ.)এর মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার শায়খুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক, আল্লামা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলামা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মুফতী মহিউদ্দিন মাসুম, মুফতী শফিকুল ইসলাম, মাওলানা আমজাদ মাহমুদী, মাওলানা মাসউদুল করীম, মুফতী জাকির হোসাইন কাসেমী, মুফতী হাবিবুর রহমান কাসেমী, মাওলানা মাহবুবুল্লাহ, মাওলানা খন্দকার মনসুর, মাওলানা আব্দুস সাত্তার, মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাওলানা শাহেদ জহেরী, মুফতী গোলাম মাওলা, মাওলানা ইসহাক কামাল, মাওলানা এখলাসুর রহমান রিয়াদ, মাওলানা হুযাইফা ইবনে ওমর, নাজমুল হাসান বিন নূরী প্রমুখ।
এছাড়াও ঢাকা-১৮ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাবিব হাসান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব নাসিরুদ্দিন, আলহাজ্ব আলী আকবর, আলহাজ্ব স্বপন সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
এনটি