মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
.
দীর্ঘ বিরতি শেষে শাওয়ালের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হলো কওমি মাদরাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ। মাদরাসাগুলোতে ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে। কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন পছন্দের নতুন মাদরাসা। আবার অনেকেই রয়ে গেছেন পূর্বের বিদ্যাপীঠে। নতুন বছর, নতুন শিক্ষাবর্ষ, সবকিছুতেই নতুনত্বের ছোঁয়া। শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ছাত্রদের কী করণীয়, বছরের পুরোটা সময় কীভাবে পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায়, ইত্যাদি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জামিয়া কাসেম নানুতবীর স্বপ্নদ্রষ্টা ও শায়খুল হাদিস, বরেণ্য লেখক ও সিরাত গবেষক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের সহসম্পাদক ইমরান ওবাইদ।
আওয়ার ইসলাম: বছরের শুরুতেই ছাত্রদের কোন বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন?
মাওলানা যাইনুল আবিদীন: বছরের শুরুতে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো মনে হয় তা হলো—
প্রথমত, বছরের শুরুতেই প্রতিটি ছাত্রকে তার টার্গেট নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সে এখন কী পড়ছে এবং কতদূর পর্যন্ত যেতে চায়, প্রথমেই তার সামনে এই টার্গেটটা পরিচ্ছন্ন হওয়া চাই।
দ্বিতীয়ত, যা খুবই জরুরি—একজন ছাত্র এ বছর যে ক্লাসে পড়বে এবং যে যে ফনের (শাস্ত্রের) কিতাব পড়বে, সেই একই ফনের কিতাব সে আগে পড়েছে কি না, সেটা আগে দেখবে! যদি পড়া হয়ে থাকে তাহলে, আগের পড়া কিতাবটা আদ্যোপান্ত দু-এক দিনে আরেকবার মুতালাআ করে তারপর নতুন কিতাব শুরু করবে। যেমন, এ বছর যে ছাত্র কাফিয়া শুরু করবে, সে হেদায়াতুন্নাহু কিতাবটা আরেকবার মুতালাআ করে নেবে। ফলে সে আগে যতটুকু শিখেছে তা আর নতুন করে পড়া বা শেখার প্রয়োজন হবে না, এখন সে নতুন কিছু শিখবে।
কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে যে সংকটের মধ্যে থাকে তা হলো—গত বছর সে যা পড়েছে সেটা একেবারে ভুলে, একই পড়া সে এ-বছরও নতুন করে পড়ছে। যার ফলে তার পড়ার উন্নতি হয় না। তাই আমি বলব, একই ফনের গত বছরের পড়া কিতাবটা দ্বিতীয়বার মুতালাআ করে তারপর নতুন কিতাব শুরু করবে।
আর যে সমস্ত সাবজেক্ট একেবারে নতুন, সংশ্লিষ্ট উস্তাদের সঙ্গে কথা বলে সেগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নেবে। যদি প্রাথমিক ধারণা নিয়ে ক্লাসে বসতে পারে, তাহলে সে সাবজেক্টটাও আত্মস্থ করা তার জন্য সহজ হবে।
আওয়ার ইসলাম: অনেকেই নতুন মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারে না, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
মাওলানা যাইনুল আবিদীন: যদি একজন ব্যক্তির টার্গেট স্থির থাকে তাহলে সবকিছু মানিয়ে নেওয়া তার জন্য সহজ হয়। যেমন, কারো যদি ব্যবসার কাজে চিটাগাং যাওয়ার প্রয়োজন হয় এবং সে প্লেনের টিকিট নাও পায়, তবুও সে বাসে কিংবা ট্রেনে চড়ে ঠিকই চিটাগাং চলে যাবে। প্লেনের টিকিট না-পাওয়ার কারণে তার ব্যবসায়িক মিটিং সে বাতিল করবে না। কারণ, এটা তার মূল টার্গেট নয়। তার মূল টার্গেট হলো তার ব্যবসায়িক মিটিং।
ঠিক অনুরূপভাবে একজন ছাত্রের টার্গেট যদি স্থির থাকে, তাহলে প্রথমেই সে চিন্তা করবে—আমি যে মাদরাসায় যাচ্ছি সেখানে আমার টার্গেট পূর্ণ হবে কি না! ফলে নতুন মাদরাসায় যাওয়ার পর সে তার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করবে। আনুষঙ্গিক বিষয় যেমন, বোর্ডিংয়ের খাবার, টয়লেট, আশেপাশের মানুষ কোন ভাষায় কথা বলে—এই বিষয়গুলো তখন আর তার কাছে মুখ্য থাকে না, তার টার্গেটই তার কাছে মুখ্য থাকে। তখন সমস্যা বলে যে বিষয়গুলোকে মনে করা হয়, সেগুলো গৌণ হয়ে যায়। সেগুলোকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আলাদাভাবে সংগ্রাম করার প্রয়োজন হয় না।
আওয়ার ইসলাম: মোটাদাগে কোন বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখলে প্রতিটি ছাত্র নিজ-নিজ জামাত থেকে পরিপূর্ণ ইস্তিফাদা অর্জন করতে পারবে?
মাওলানা যাইনুল আবিদীন: ইবতিদায়ি থেকে দাওরা পর্যন্ত ছাত্র হিসেবে সবার কাজ একই। প্রথম কাজ হলো—সে প্রতিদিনের পড়া, তাকরার, মুতাআলা, মুযাকারার মাধ্যমে প্রতিদিন আত্মস্থ করবে। এই কাজ যে করবে পরীক্ষার ফলাফল যাই হোক না কেন, একদিন সে যোগ্য হবেই।
দ্বিতীয় কাজ হলো—প্রত্যেক ছাত্রের উচিত নিজেকে দেখা। আমার ক্লাস হিসেবে, বয়স হিসেবে, আমার কী কী ঘাটতি আছে সেগুলো আবিষ্কার করা এবং পূরণ করার চেষ্টা করা। যদি সেই মাদরাসায় সেই ঘাটতি পূরণের কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট উস্তাদকে জানানো। তাহলে মাদরাসা থেকে আশা করি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যদি কোনো ছাত্র এভাবে চলতে পারে, তাহলে পরীক্ষা এলে দেখা যাবে তার বাড়তি কোনো চাপ হবে না। পরীক্ষায় পাস করা নিয়ে তার কোনো চিন্তা থাকবে না। তখন সে প্রতিযোগিতা করবে সিরিয়ালে আসার জন্য।
আওয়ার ইসলাম: বছরের শুরুতে ছাত্রদের উদ্দেশে আপনার বিশেষ নসিহত কী?
মাওলানা যাইনুল আবিদীন: একজন ছাত্র যদি ভবিষ্যতে বড় হতে চায় তাহলে তাকে ছাত্র জীবনে ছাত্র থাকতে হবে। ছাত্র থাকার অর্থ হলো—একজন ছাত্রের কাজ পড়া, পড়া এবং শুধু পড়া। এর বাইরে পৃথিবীর কোনো ব্যস্ততায় সে জড়িত হবে না। কেউ যদি এসে বলে, 'আমি ইমাম মাহদী'—তাহলে তার সাথে সালাম-মুসাফাহা করবে ঠিকই, কিন্তু তার বিপ্লবে সে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। যদি কোনো ছাত্র, ছাত্র থাকে তাহলে সে সফল হবেই। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি কোনো ছাত্র দুর্ভাগ্যক্রমে ছাত্রজীবনে অছাত্রসুলভ কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়, তাহলে তার কপাল পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য আলাদা কারো কোনো চেষ্টা করা লাগবে না। তার পদক্ষেপই তাকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে।
জেডএম/