শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ ।। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৫ জিলহজ ১৪৪৭


মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে মুফতি তাকী উসমানীর খোলা চিঠি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

বিশ্ববিখ্যাত আলেম স্কলার, অর্থনীতিবিদ এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের সভাপতি মুফতি তাকী উসমানী সম্প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। উর্দু ভাষায় রচিত তাঁর সেই খোলা চিঠিটি পাঠকের সামনে বাংলায় তুলে ধরা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন: যাকারিয়া মাহমুদ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর। তিনিই যথেষ্ট সবার জন্য। দরুদ সালাম বর্ষিত হোক তাঁর পক্ষ থেকে নির্বাচিত রাসুলের ওপর।

পরসমাচার এই যে—

সম্মানিত মুহতামিম ও সকল দীনি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষকগণ, আসসালামু আলাইকুম।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের একজন খাদেম হিসেবে আমি অধম আপনাদের এই পত্র লিখছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দীন ও ইলমের খেদমতের জন্য আপনাদের মনোনয়ন করেছেন। পরিস্থিতির প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আপনারা যে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার সাথে এ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছেন—তা অবশ্যই প্রশংসা ও সাধুবাদের উপযোগী। তবু পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিতে কিছু বিষয় আলোচনা করতে চাচ্ছি। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পূর্ণ সন্তুষ্টি হাসিলের লক্ষ্যে দীনের এই মহান খেদমত আঞ্জাম দানে আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

এক.

দীনি মাদরাসায় খেদমত করতে পারা যেমন—আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় নেয়ামত এবং সৌভাগ্যের বিষয়, তেমনই বিরাট দায়িত্বও বটে। এ পথে পদে পদে ওঁৎ পেতে থাকে নানারকম সমস্যা ও বিপদ। প্রসন্নচিত্তে এসব সমাধান করতে যতটা না বাহ্যিক উপয়ান্তর জরুরি, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন—আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা। এটাই মাদরাসাসমূহের মূল প্রতিপাদ্য।

দুই.

মাদরাসার রোজকার নিয়মাবলি ছাড়াও তালেবে ইলমদের এ কথা বারংবার বোঝানো উচিত—দীনি ইলম কখনো প্রতিদ্বন্দী পছন্দ করে না। তাই ইলম অর্জনের জন্য নিজের সর্বস্ব এর অধীন করে দেওয়ার বিকল্প নেই। মনে রাখা জরুরি—‘তুমি তোমার সর্বস্ব ইলমকে না-দেওয়া অবধি, ইলম তোমাকে তার সামান্যও দেবে না।’ কাজেই, তালেবে ইলম মাত্রই নিজের পরিপূর্ণ মনোযোগ ও আকর্ষণ মুতালাআ, তাকরার, সবক শোনা ও বোঝার দিকে নিবদ্ধ রাখবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সবক বোঝে না-আসে, ততক্ষণ একজন তালেবে ইলমের চিত্ত প্রশমিত না-হওয়া চাই।

অপ্রয়োজনীয় সাক্ষাৎ-সমাবেশ, আলাপ-আলোচনা এবং মোবাইল ফোনের অকপটে ব্যবহার—তালেবে ইলমের জন্য বিষ সদৃশ। তাই এটা পুরোপুরি বর্জন জরুরি। আসাতিজায়ে কেরামও বাহ্যত তালেবে ইলম। যেহেতু বলা হয়ে থাকে—‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করো’। সেহেতু, এসব বিষয় দায়িত্বশীলদের জন্যেও জরুরি।

তিন.

আসাতিজায়ে কেরাম তালেবে ইলমদের নিজের রুহানি আওলাদ বা আত্মিক সন্তান মনে করবেন। ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সাথে শিক্ষা-দীক্ষা দেবেন। যখন যে কিতাব বা শাস্ত্রের পাঠ দেবেন—সে কিতাব বা শাস্ত্র ভালোভাবে মুতালাআ করে নেবেন। যদি কোনোকিছু অস্পষ্ট মনে হয় বা সন্দেহ দেখা দেয়, তাহলে সেটা অন্য কোনো উস্তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে কোনো দ্বিধাবোধ করবেন না। যাতে করে সে সবকের প্রতিটা অংশ ভালোভাবে আত্মস্ত হয়। সবকটা শিক্ষার্থীদের কীভাবে বোঝানো হবে— মুতালাআর সময় আসাতিজায়ে কেরাম এ ব্যাপারেও খুব ভালো করে চিন্তা করতে পারেন—এতে সবক বোঝানোটা শিক্ষার্থীদের মন ও মানসিকতার অনুকূলে হয়। যেকোনো কঠিন মাসয়ালাও সহজ ও সাবলীলভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন। শিক্ষার্থীরা সবক ঠিকঠাক বুঝতে পারছে কি না—বিভিন্ন স্তরের একাধিক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিন। ব্যক্তিগত জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে—একই বিষয়ের একাধিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও অন্যান্য কিতাব মুতালাআয় রাখুন। চাই নির্দিষ্ট সবকে সে কিতাবগুলোর আলোচনা আসুক বা না-আসুক।

চার.

সরফ-নাহু শাস্ত্রের কিতাবাদি তামরিন ও ইজরার আকারে পাঠদানে গুরুত্ব দিন। শিক্ষার্থীরা ইবারত পড়ার সময় তাদের প্রতিটা ভুল, কায়দার আলোকে বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। 

পাঁচ.

মুতালাআর সময় শিক্ষার্থীদের আরবি হাশিয়া বা শরাহের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার গড়ে তুলতে হবে। উর্দু শরাহ-হাশিয়া (বাংলা নোট) তালেবে ইলমের মনোবল সংকীর্ণ করে দেয়, যা অনুচিত এবং নিন্দনীয়। তাছাড়া উর্দু (বা বাংলা) শরাহ-শরুহাত ও তাকরিরের ব্যাপকতা—তালেবে ইলমদের সবকের মূল মাকসাদ পর্যন্ত পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা হ্রাস করছে দিনদিন। এজন্য তালেবে ইলমদের মনোযোগ আরবি কিতাবের দিকে ফেরানো জরুরি।

ছয়.

শিক্ষকগণ পাঠদানের পাশাপাশি দীনি এবং চারিত্রিক দীক্ষা দানও নিজের দায়িত্বের মধ্যে গণ্য করুন। জামাত ও তাকবিরে উলার সাথে নামাজ  আদায়ে তাদের তাগিদ দিন। এ ব্যাপারে যার ভেতর উদাসীনতা দেখবেন, তাকে খুব করে বোঝান এবং বিশেষ নজরে রাখুন।  

সাত.

চলাফেরার সময় কোনো না কোনো জিকির তালেবে ইলমদের মুখে যেন জারি থাকে—সে অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষ করে তৃতীয় কালিমা (আল্লাহু আকবার) এবং দুরুদ শরিফ। এজন্য স্বয়ং আসাতিজায়ে কেরাম ও মুহতামিমগণ আমল করে ছাত্রদের সামনে দৃষ্টান্ত স্বরূপ উপস্থাপিত হোন।

আট.

আজকের সময়ে আমাদের শিক্ষাদীক্ষার উৎসস্থল—দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষা ও আদর্শ। তাদের থেকে তালেবে ইলমদের আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অনুধাবিত হয়। তাই মাদরাসাগুলোতে প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন, ফজর বা আসরের পর) আকাবিরে দেওবন্দের জীবনী, ঘটনাপ্রবাহ বা বাণীসমূহ তালিমের প্রতি গুরুত্ব দিন। হোক তা ১০ মিনিট।

নিচে কিছু বিশেষ কিতাবের তালিকা দেওয়া হলো—

১. আপবিতি—লেখক, শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভি রহ.

২. সাওয়াহিহে কাসিমি—লেখক, মাওলানা মুনাজির আহসান গিলানি

৩. হজরত গাঙ্গুহি রহ.এর জীবনী—তাজকিরাতুর রশিদ—লেখক, মাওলানা মিরাঠি রহ.

৪. হায়াতে শাইখুল হিন্দ—মাওলানা সাইদ আসগর হুসাইন সাহেব রহ

৫. হজরত থানভি রহ.-এর জীবনী—আশরাফুস সাওয়ানিহ, লেখক, হজরত খাজা মাজযুব রহ.

৬. তাজকিরাতুল খলিল—লেখক, মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরি

৭. নকশে হায়াত— লেখক, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি  রহ.

৮. হজরত হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ.-এর জ্ঞান-প্রজ্ঞার ঘটনাপ্রবাহ—মাআরিফে মাদানি। লেখক, মাওলানা আবদুর রশিদ তিরমিজি রহ.

৯. শাইখুল ইসলাম হজরত শিব্বির আহমদ উসমানি রহ.-এর জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মবিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ—তাজাল্লিয়াতে উসমানি। লেখক, মাওলানা আনওয়ারুল হাসান শেরকুটি রহ.

১০. মাজালিসে হাকিমুল উম্মাহ— লেখক, মাওলানা মুহাম্মদ শফি রহ.

১১. আকাবিরে দেওবন্দের খুতবাসমূহ যেমন, খুতুবাতে হাকিমুল ইসলাম। লেখক, কারি মুহাম্মদ তৈয়ব রহ.

এই কিতাবগুলোর কলেবর দীর্ঘ হওয়ায় যদি আত্মীকরণ কষ্টসাধ্য হয়, তাহলে কোনো উস্তাদ এ থেকে নির্বাচিত বিষয়াবলির সারগর্ভ ছাত্রদের সামনে আলোচনা করবেন এবং কিতাবগুলো পড়ার প্রতি ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করবেন। তজ্জন্যে মাদরাসার কুতুবখানায় কিতাবগুলো থাকা জরুরি।

নয়.

সুন্নতের অনুসরণে বিশেষ গুরুত্বারূপ করতে হবে। ইবাদত-বন্দেগির সুন্নত ছাড়াও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, উত্তম আচরণ, ঝগড়া-বিবাদ পরিহার, বিনয় ও নম্রতা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ, অমুখাপেক্ষি ও আত্মনির্ভরতা, সহানুভূতি ও পরোপকারিসহ বহু সুন্নত আছে এমন—যা অত্যন্ত উচু স্তরের। এসবের গুরুত্ব তালেবে ইলমদের মন-মগজে গেঁথে দিতে হবে। এতদ্ব বিষয়ে তাদের কোনো কপটতা বা ভ্রান্তি থাকলে, তা নিরসনে মনোযোগী হতে হবে।

দশ.

নিয়মমাফিক জীবন ধারণ—দীন ও সুন্নতের অন্যতম অনুষঙ্গ। তালেবে ইলমদের অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা থেকে বাধা দিতে হবে। নামাজের সময় তো বটেই—রাতদিনের অন্যান্য সময়ও কাতারবন্দি তথা, নিয়মমাফিক চলা বাঞ্ছনীয়। 

এগারো.

প্রকৃত মুসলমান হলো সেই—‘যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে—ইসলামি জীবনব্যবস্থার এই মৌলিক নীতিকে তাদের স্বভাবজাত নীতিতে পরিণত করার চেষ্টা করতে হবে। এর বিপরীত মনোভাব কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না।

বারো.

তালেবে ইলমদের মন ও মগজে আল্লাহঅলাদের সাহচর্যের গুরুত্ববোধ গেঁথে দিতে হবে। তাদের হৃদয়ঙ্গম করতে হবে—আল্লাহওয়ালাদের সাহচর্য ছাড়া সত্যিকারের মুসলিম হওয়া যায় না।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ