শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ ।। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৫ জিলহজ ১৪৪৭


জিলহজের প্রথম দশকের গুরুত্ব ও ফজিলত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মাওলানা মুহাম্মদ আরশাদ ||

আল্লাহ তায়ালা স্থান, কাল, পাত্রভেদে বিভিন্ন ইবাদতের গুরুত্ব দিয়ে থাকেন; তার মধ্যে ইসলামি শরিয়তে জিলহজ মাসের অপরিসীম গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে, যার বিশদ বিবরণ কুরআন-হাদিসে বর্ণিত।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে জিলহজ মাসের প্রথম দশদিনের শপথ করে বলেছেন, "শপথ প্রভাতের, শপথ দশ রজনীর, শপথ জোড় ও বিজোড়ের।" (সুরা ফজর: ১-৩)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), কাতাদা ও মুজাহিদ প্রমুখ তাফসিরবিদের মতে, এর দ্বারা জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে; যা সর্বোত্তম দিন বলে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে কাসীর)

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল সারা বছরের আমলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ‏

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আল্লাহ তাআলার নিকট জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।" সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আরজ করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি (এই দিনগুলোর আমলের চেয়ে প্রিয়) নয়?"

তিনি (সা.) বললেন, "জিহাদও নয়। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে (জিহাদের জন্য) বের হয়েছে এবং তার কোনো কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়ে গেছে)।" (তিরমিজি শরিফ: ৭৫৭)

তাই বরকতময় এই মাসকে সামনে রেখে আমরা বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারি—

১. নেক আমলের প্রতিযোগিতা:

যেহেতু এই দিনগুলো সকল দিনের তুলনায় অধিক ফজিলত ও মর্যাদাসম্পন্ন এবং এই দিনগুলোতে নেক আমলের সওয়াবও বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়, তাই এ দিনগুলোতে বেশি বেশি নেক আমল করার চেষ্টা করা উচিত। যেমন, বুজুর্গদের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তারা এ দিনগুলোতে অধিক ইবাদত করতেন। হাদিসের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘সুনানে দারেমি’-তে রয়েছে: সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহ.) জিলহজের প্রথম দশ দিন অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমসহ আমলে মশগুল হতেন, এমনকি তার শক্তি প্রায় শেষ হয়ে যেত। (সুনানে দারেমি: ১৭১৫)

২. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা:

জিলহজ সম্মানিত মাসগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আর সম্মানিত মাসগুলোতে যেমন নেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি পায়, তেমনিভাবে এ মাসগুলোতে গুনাহের ভয়াবহতাও বৃদ্ধি পায়। তাই এ মাসগুলোর মর্যাদা ও সম্মানের দাবি হলো, এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তায়ালা এ মাসগুলোর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি আল্লাহর কিতাবে, যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। অতএব তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের উপর জুলুম করো না।" (সুরা তাওবা: ৩৬)

৩. তওবা ও ইস্তিগফার:

এই দিনগুলোতে বিশেষভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করা প্রয়োজন। এই দিনগুলো ইবাদত ও কবুলিয়্যাতের দিন। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "এমন কোনো দিবস নেই যেখানে আল্লাহ তায়ালা আরাফা দিবস থেকে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এবং আল্লাহ নিশ্চয়ই নিকটবর্তী হন ও তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন, বলেন—ওরা কী চায়?" (মুসলিম: হাদিস নং ১৩৪৮)

আরাফার দিন আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। সুতরাং, তওবা ও ইস্তিগফারের বরকতে ইনশাআল্লাহ আমাদের নামও সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

৪. জিকির-আজকার ও তাকবির পাঠের গুরুত্ব:

এই দিনগুলোর একটি বিশেষ আমল হলো তাকবির পাঠ করা। ৯ই জিলহজ থেকে ১৩ই জিলহজ পর্যন্ত হানাফি মাযহাব অনুযায়ী প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর 'তাকবীরে তাশরিক' পাঠ করা ওয়াজিব। এছাড়া এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাকবির, তাসবিহ এবং জিকির-আজকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: "তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।" (সুরা হজ: ২৮)

মুসনাদে আহমদের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: "আল্লাহর কাছে (জিলহজ মাসের) এই দশ দিনের চেয়ে মহান এবং এই দিনগুলোতে করা নেক আমলের চেয়ে প্রিয় আর কোনো আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি 'তাহলিল' (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), 'তাকবির' (আল্লাহু আকবার) এবং 'তাহমিদ' (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করো।" (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬)

তাকবিরে তাশরিক হলো—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’

ফরজ নামাজের পর সঙ্গে সঙ্গে তাকবির পড়তে ভুলে গেলে, কিংবা তাকবির পড়ার পূর্বে কথাবার্তা বলে ফেললে, অথবা জেনে-শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে ওজু ভেঙে ফেললে এবং মসজিদের মুসল্লা হতে বের হয়ে গেলে তাকবির পড়া বর্জিত হয়ে যায়। (আলমগীরী: ২/৩)

৫. চুল ও নখ না কাটা:

একটি মুস্তাহাব আমল হলো—যে ব্যক্তি কোরবানি করার ইচ্ছা রাখে, সে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত নিজের শরীরের চুল, নখ ইত্যাদি কাটবে না।

এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:

"যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা করবে, তবে সে যেন (যতক্ষণ না কোরবানি করে) নিজের চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।" (সহীহ মুসলিম: ১৯৭৭)

তবে মনে রাখতে হবে যে, এটি করা মুস্তাহাব, জরুরি নয়। তাই কেউ যদি কোরবানির আগে ভুলবশত বা অন্য কোনো কারণে চুল বা নখ কেটে ফেলে, তবে তাতে কোনো গুনাহ হবে না এবং কোরবানিাতেও কোনো ত্রুটি আসবে না।

ওলামায়ে কেরাম এর একটি হেকমত বা রহস্য এই লিখেছেন যে—যেহেতু এগুলো হজের দিন এবং হাজিরা এই দিনগুলোতে এহরাম পরিধান করেন। আর এহরামের কারণে তাদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যার মধ্যে একটি হলো তারা এহরাম অবস্থায় চুল ও নখ কাটতে পারেন না। আমরা যারা হজে যেতে পারছি না, তারা যেন এই আমলের বরকতে হাজিদের সাথে কিছুটা সাদৃশ্য বজায় রাখতে পারি এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের ওপর যে রহমত বর্ষিত হয়, ইনশাআল্লাহ এই সাদৃশ্যের বরকতে আমরাও যেন তার কিছু অংশ লাভ করতে পারি।

উল্লেখ্য, এই বিধান তখনই প্রযোজ্য হবে যখন অবাঞ্ছিত পশম ও নখ না কাটার সময় ৪০ দিন থেকে বেশি না হয়। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে—আনাস (রা.) বলেন, "গোঁফ কর্তন করা, নখ কাটা, বগল পরিষ্কার করা ও নাভির নিচে পশম পরিষ্কার করার বিষয়ে আমাদের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল যে আমরা যেন ৪০ দিনের বেশি বিলম্ব না করি।" (সহীহ মুসলিম: ১/১২৯, আহসানুল ফাতাওয়া: ৪/৪৯৬)

৬. রোজা রাখা:

জিলহজ মাসে ঈদুল আজহার আগের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এ সম্পর্কে একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, "এই দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম দশ দিন) একদিনের রোজা এক বছরের রোজার সমান এবং এর প্রতি রাতের ইবাদত শবে কদরের ইবাদতের সমান।" (জামে তিরমিজি: ৭৫৮)

বিশেষ করে আরাফার দিন অর্থাৎ ৯ই জিলহজের রোজার ফজিলত আরও বেশি বর্ণনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে এসেছে—হযরত আবু ক্বাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন: “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবে।” (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)

৭. কুরবানি করা:

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের শেষ দিন অর্থাৎ ১০ই জিলহজকে ‘ইয়াওমুন নহর’ বলা হয়। এই দিনটি সকল দিনের চেয়ে উত্তম, আর এই দিনের সর্বোত্তম আমল হলো কুরবানি করা। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে: আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা (জবাই করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় মানুষের কোনো আমল নাই। কিয়ামতের দিন এর শিং, লোম ও পায়ের খুরসহ সব উপস্থিত হবে। এর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়; সুতরাং স্বচ্ছন্দ হৃদয়ে তোমরা তা করবে।" (তিরমিজি শরিফ: ১৪৯৩)

সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। এর রয়েছে অনেক ফজিলত ও বরকত। কখনও কখনও ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের মনে এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে যে, এত বিপুল সংখ্যক পশু কুরবানি করা পশু নিধন এবং এত টাকা কুরবানিতে নষ্ট না করে কোনো গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দিলে তার উপকার হতো।

মনে রাখবেন, কুরবানির টাকা অন্য কোনো বড় জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করলেও কুরবানির হুকুম আদায় হবে না। এতে একটি ওয়াজিব আমল ছেড়ে দেওয়া হবে এবং সুন্নাতে মুতাওয়াতিরা (ধারাবাহিক সুন্নত) অমান্য করে নিজের বিবেককে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার গুনাহ হবে।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করে না, তার প্রতি আল্লাহর নবী (সা.) কঠোর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু হুরাইরা (ra.) হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করে না, সে যেন অবশ্যই আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৮২৭৩)। তাই অত্যন্ত আগ্রহ ও ইখলাসের (নিষ্ঠার) সাথে আল্লাহর পথে কুরবানি করা উচিত।

৮. সদকা ও খয়রাত:

খুশির এই মুহূর্তগুলোতে আমরা যেমন আমাদের বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদিকে মনে রাখি, তেমনিভাবে এতিম, মিসকিন ও অভাবীদেরও মনে রাখা উচিত; যেন তারাও এই খুশির মুহূর্তগুলোতে শরিক হতে পারে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক পথে পরিচালিত করুন এবং নেক আমলের প্রতি প্রতিযোগিতা করার মন-মানসিকতা দান করুন, আমীন।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া ছমদিয়া আশরাফুল উলুম, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ